বাংলাস্ফিয়ার: সিএমআরএল–এক্সালজিক অর্থ লেনদেন মামলায় কেরলমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বর্তমান বিরোধী দলনেতা পিনারাই বিজয়ন, তাঁর মেয়ে টি. বীণা এবং জামাই তথা প্রাক্তন মন্ত্রী পি. এ. মহম্মদ রিয়াসের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআরের ভিত্তিতে কেরল পুলিশের তদন্তে সাত দিনের স্থগিতাদেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, এই নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
কেরল হাই কোর্টের একক বিচারপতির বেঞ্চ ওই তিন জনের বিরুদ্ধে ১৯৮৮ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে এফআইআর দায়ের করতে রাজ্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিল। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি ২০০২ সালের অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনের (পিএমএলএ) ৬৬(২) ধারায় কেরল পুলিশকে যে তথ্য দিয়েছিল, তার ভিত্তিতেই হাই কোর্ট ওই নির্দেশ দেয়।
একক বেঞ্চের ৯ অক্টোবরের নির্দেশের বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতি চেয়েছিলেন বিজয়ন, তাঁর মেয়ে এবং জামাই। কিন্তু ১৫ অক্টোবর হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সেই অনুমতি দেয়নি। ফলে তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন।
বুধবার দশেরার ছুটির মধ্যেই বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনার বিশেষ বেঞ্চ ৮২ বছর বয়সি বিজয়নের আবেদন শুনতে বসে। বিজয়ন আশঙ্কা প্রকাশ করেন, তাঁকে এবং তাঁর পরিবারের ওই দুই সদস্যকে যে কোনও মুহূর্তে গ্রেফতার করা হতে পারে।
বিজয়ন ও অন্য দুই আবেদনকারীর হয়ে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী সিদ্ধার্থ লুথরা, এন. হরিহরন এবং কৃষ্ণ দেব জাগরলামুদি। আবেদনকারীদের বক্তব্য, ৯ অক্টোবর এফআইআর দায়েরের নির্দেশ দেওয়ার আগে একক বেঞ্চ তাঁদের মামলায় পক্ষভুক্ত করেনি, তাঁদের বক্তব্যও শোনেনি।
কেরল হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের ১৫ অক্টোবরের নির্দেশ খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, দুর্নীতির এফআইআর দায়েরের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে বিজয়ন ও অন্য দুই আবেদনকারী যে আপিল করেছেন, ডিভিশন বেঞ্চকে তা শুনতে হবে। বিচারপতি বাগচী রাজ্যকে স্মরণ করিয়ে দেন, কোনও ব্যক্তি যত উঁচু বা নিচু অবস্থানেই থাকুন না কেন, তাঁর ক্ষেত্রেও আইনের শাসন এবং প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি প্রযোজ্য।
বিচারপতি বাগচী বলেন, “আমরা এফআইআরে হস্তক্ষেপ করব না, তবে তদন্ত স্থগিত রাখব… পাশাপাশি, বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মামলাটি হাই কোর্টে ফেরত পাঠাচ্ছি।”
আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে নথিভুক্ত এনফোর্সমেন্ট কেস ইনফরমেশন রিপোর্ট বা ইসিআইআরের বৈধতা নিয়ে বেঞ্চ কোনও মতামত নথিবদ্ধ করেনি। তবে আইন অনুযায়ী উপযুক্ত বিচারিক মঞ্চে ওই ইসিআইআর চ্যালেঞ্জ করার স্বাধীনতা তাঁদের দিয়েছে আদালত।
শুনানিতে রাজ্যের তরফে যুক্তি দেওয়া হয়, বিজয় মদনলাল চৌধুরী বনাম ভারত সরকার মামলায় সুপ্রিম কোর্টেরই ২০২২ সালের রায়ে বলা হয়েছিল, পিএমএলএ-র ৬৬(২) ধারায় ইডি কোনও কথিত অপরাধের তথ্য বা উপকরণ রাজ্যকে পাঠালে, সেটি এফআইআর দায়েরের “নির্দেশ” হিসেবে গণ্য হবে।
বিচারপতি বাগচী বলেন, রাজ্যগুলি আদালতের রায়কে বিধিবদ্ধ আইন হিসেবে গণ্য করতে পারে না। বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, পিএমএলএ-র ৬৬(২) ধারা কোনও “বাধ্যতামূলক নির্দেশ” নয়; ওই ধারায় ইডি নিজের কাছে থাকা তথ্য বা উপকরণ সম্পর্কে অন্য কোনও সংস্থাকে শুধু অবহিত করে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে “অন্য কোনও আইন” প্রযোজ্য কি না এবং তার জন্য এফআইআর দায়ের করা প্রয়োজন কি না, তা নির্ধারণের এক্তিয়ার সম্পূর্ণ ভাবে সংশ্লিষ্ট সংস্থার। এ ক্ষেত্রে সেই সংস্থা কেরল পুলিশ। আদালত স্পষ্ট করে দেয়, ইডি এবং পিএমএলএ সর্বজ্ঞ নয়।
বিচারপতি বাগচী বলেন, “পিএমএলএ এমন কোনও ‘সর্বময় প্রশাসক’ হয়ে উঠতে পারে না, যে সর্বত্র সব বিষয়ে নির্দেশ দেবে। এফআইআর দায়েরের মতো প্রতিটি প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগের এক্তিয়ার পিএমএলএ নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।”
পিএমএলএ-র অধীনে আইন যে ক্ষমতা দিয়েছে, ইডিকে তার সীমা প্রসারিত না করার পরামর্শ দেন বিচারপতি। তিনি বলেন, পিএমএলএ-র আওতায় হাওয়ালা কারবারি থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত সকলের বিরুদ্ধে তদন্ত করার “পূর্ণ ক্ষমতা” ইডির রয়েছে। কিন্তু অন্য সংস্থাগুলির আইননির্দিষ্ট এক্তিয়ারে ইডি হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য পুলিশ ১৯৮৮ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ১৭এ ধারায় সরকারের পূর্বানুমোদন আদৌ চেয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন বিচারপতি।
বিচারপতি বাগচী আরও জানতে চান, রাজ্য কি নতুন ফৌজদারি কার্যবিধি ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) বিধানগুলি খতিয়ে দেখেছে? তিনি বলেন, বাতিল হয়ে যাওয়া ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৬(৩) ধারার সঙ্গে বিএনএসএসের ১৭৫(৪) ধারার পার্থক্য রয়েছে। নতুন বিধানে ম্যাজিস্ট্রেটকে অভিযুক্ত সরকারি কর্মচারীর বক্তব্য আনুষ্ঠানিক ভাবে শুনতে হয়।
এফআইআরের ভিত্তিতে চলা তদন্তকে রাজ্য যে “আদালতের নির্দেশে শুরু হওয়া তদন্ত” হিসেবে বর্ণনা করেছিল, বেঞ্চ সেই বক্তব্যও সংশোধন করে দেয়। বিচারপতি বাগচী বলেন, “এটি ইডির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুরু হওয়া তদন্ত।”
শীর্ষ আদালত জানায়, ২১ অক্টোবর আদালতকক্ষে আলোচিত এই সমস্ত বিষয় আবেদনকারীদের আপিলের শুনানির সময় হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চকে খতিয়ে দেখতে হবে।
প্রায় এক ঘণ্টার শুনানির শেষে বিচারপতি বাগচী বলেন, “এফআইআর বহাল থাকবে। কিন্তু হাই কোর্ট এই বিষয়গুলির নিষ্পত্তি না করা পর্যন্ত কোনও তদন্ত হবে না।”