বাংলাস্ফিয়ার: টেলিভিশনের সংবাদ চ্যানেলগুলিকে কোনও অনুষ্ঠানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে এমন বক্তব্য বা দেশবিরোধী মনোভাব প্রচার না করার পরামর্শ দিল কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক। বুধবার জারি করা নির্দেশিকায় মন্ত্রক বলেছে, আপত্তিকর বা উসকানিমূলক মন্তব্যের ক্ষেত্রে অবিলম্বে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল হতে হবে।

কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্কস (রেগুলেশন) আইন এবং কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্কস বিধির অধীনে নির্ধারিত অনুষ্ঠানবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার কথা বলা হয়েছে নির্দেশিকায়।

মন্ত্রক জানিয়েছে, আন্তঃবিভাগীয় কমিটি বা আইডিসি লক্ষ করেছে যে কিছু সম্প্রচার সংশ্লিষ্ট বিধির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। নির্দেশিকায় জোর দিয়ে বলা হয়েছে, “সম্প্রচারে অনুপযুক্ত আচরণ বা ভাষাকে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করা চলবে না।”

নিরাপত্তা বাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের সরাসরি সম্প্রচার নিষিদ্ধ—এই বিধানও মনে করিয়ে দিয়েছে মন্ত্রক। অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংবাদ পরিবেশন সীমাবদ্ধ রাখতে হবে অনুমোদিত আধিকারিকের দেওয়া পর্যায়ক্রমিক ব্রিফিংয়ের মধ্যেই। প্রয়োজনমতো দৃশ্যের সঙ্গে তার সময় উল্লেখ করতে হবে, যাতে দর্শকেরা সেটিকে সরাসরি সম্প্রচার বলে ভুল না করেন।

বীভৎস বা মানসিকভাবে পীড়াদায়ক দৃশ্য সম্প্রচারের সময় চ্যানেলগুলিকে সতর্কতা, দায়িত্বশীলতা ও সম্পাদকীয় বিবেচনাবোধের পরিচয় দিতে বলা হয়েছে। সুরুচি বা শালীনতায় আঘাত করে কিংবা দর্শকদের অকারণে মানসিক কষ্ট দেয়, এমন বিষয়বস্তু এড়িয়ে চলতে হবে। সংবাদ পরিবেশন হতে হবে তথ্য যাচাইয়ের ভিত্তিতে, সত্যনিষ্ঠ, ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল। অপরাধ বা হিংসার খবর পরিবেশনের সময় ইচ্ছাকৃত মিথ্যা, ইঙ্গিতপূর্ণ অপবাদ কিংবা অর্ধসত্য সম্প্রচার করা যাবে না বলে জানিয়েছে মন্ত্রক।

চাঞ্চল্য সৃষ্টি, বেআইনি বা সামাজিকভাবে অনভিপ্রেত আচরণকে মহিমান্বিত করা কিংবা স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে সংবাদ চ্যানেলগুলিকে। পীড়াদায়ক দৃশ্য বারবার দেখানোও এড়িয়ে চলতে হবে। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে দৃশ্য ঝাপসা করা বা সংশ্লিষ্ট অংশ ঢেকে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের দৃশ্য সম্প্রচারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বড় দুর্ঘটনা বা অন্য ঘটনার দৃশ্য দেখানোর সময় প্রয়োজনমতো তার সময় উল্লেখ করার পরামর্শও রয়েছে নির্দেশিকায়, যাতে জনসাধারণের মধ্যে অযথা আতঙ্ক না ছড়ায়। এ ধরনের খবরও যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতেই পরিবেশন করতে হবে।

মন্ত্রক জানিয়েছে, সম্প্রচার, গ্রাফিক্স এবং ডিজিটাল উপস্থাপনায় ভারতের মানচিত্র ব্যবহার করতে হলে কেবল সার্ভে অব ইন্ডিয়া প্রকাশিত প্রামাণ্য মানচিত্রই ব্যবহার করতে হবে। সরাসরি বিতর্ক ও প্যানেল আলোচনা-সহ কোনও অনুষ্ঠানেই সাম্প্রদায়িক বা দেশবিরোধী মনোভাব প্রচার করা যাবে না।

সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের সতর্কভাবে বেছে নিতে এবং সম্প্রচারের আগেই তাঁদের সংশ্লিষ্ট বিধি ও সংবেদনশীলতা সম্পর্কে সচেতন করতে বলা হয়েছে। অবমাননাকর, গালিগালাজপূর্ণ বা উসকানিমূলক বক্তব্য বন্ধ করতে অবিলম্বে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এর মধ্যে থাকতে পারে শব্দ বন্ধ করে দেওয়া, দায়-অস্বীকারমূলক ঘোষণা দেওয়া কিংবা সংশ্লিষ্ট সম্প্রচার সাময়িকভাবে থামানো বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া।

যৌন অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ করতে পারে, এমন কোনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। ছবি, পারিবারিক বিবরণ, বসবাসের এলাকা, দূরবর্তী যোগসূত্রযুক্ত তথ্য কিংবা অন্য যে কোনও শনাক্তকরণযোগ্য তথ্যও এই নিষেধের আওতায় পড়বে বলে জানিয়েছে মন্ত্রক।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার সম্পর্কে মন্ত্রক বলেছে, সংবাদ তৈরিতে এর ভূমিকা সহায়ক হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। এর ব্যবহারে সংবাদের নির্ভুলতা, প্রামাণ্যতা কিংবা সংবেদনশীলতা ক্ষুণ্ণ হওয়া চলবে না।

সম্প্রচার সংস্থাগুলিকে সম্পাদকীয় ব্যবস্থা এবং বিষয়বস্তু পর্যালোচনার প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা, প্রযোজনা, সিগন্যাল প্রেরণ ও সম্প্রচারের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত কর্মীকে সংশ্লিষ্ট বিধি সম্পর্কে সচেতন করতে বলা হয়েছে। অনুষ্ঠানবিধি মেনে চলার বিষয়ে নিয়মিত কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করার পরামর্শও দিয়েছে মন্ত্রক।

নির্দেশিকায় সতর্ক করা হয়েছে, বিধি লঙ্ঘিত হলে কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্কস (রেগুলেশন) আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।