বাংলাস্ফিয়ার: প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে বড়, বৈচিত্র্যময় এবং নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রশ্নভান্ডার তৈরিতে বিনিয়োগ করুক ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ। চূড়ান্ত প্রশ্নপত্র তৈরি হোক পরীক্ষার যতটা সম্ভব কাছাকাছি সময়ে। পরীক্ষাব্যবস্থার নিরাপত্তা বাড়ানো এবং সংস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে এই সুপারিশ করেছে শিক্ষা, নারী, শিশু, যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

রাজ্যসভার সাংসদ মুকুল ওয়াসনিকের নেতৃত্বাধীন কমিটির ৩৮২তম প্রতিবেদনটি ৯ অক্টোবর রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের কাছে পেশ করা হয়। এনটিএর সংস্কার ও শক্তিবৃদ্ধি সংক্রান্ত ওই প্রতিবেদনে সংস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। প্রশ্ন তৈরির পদ্ধতি থেকে পরীক্ষাকেন্দ্র পরিচালনা এবং স্থায়ী কর্মী নিয়োগ—একাধিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন চেয়েছে কমিটি।

কমিটির বক্তব্য, একই প্রশ্নসমষ্টির পুনর্ব্যবহার অথবা প্রতি বছর পরীক্ষকদের দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন প্রশ্নপত্র তৈরি করানোর প্রচলিত ব্যবস্থায় নিরাপত্তার ঝুঁকি থেকে যায়। বিকল্প হিসেবে এমন বিশাল প্রশ্নভান্ডার গড়ে তুলতে হবে, যেখান থেকে কোন প্রশ্ন পরীক্ষায় আসবে, তা প্রশ্নপ্রণেতারাও আগাম জানতে পারবেন না। ডিজিটাল ব্যবস্থায় প্রশ্ন বাছাই হবে; বিশেষজ্ঞেরা চূড়ান্ত প্রশ্নপত্র যাচাই করবেন।

কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ছাপিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রে পাঠানোর প্রয়োজন পড়ে না। ফলে অনেক আগে প্রশ্নপত্র চূড়ান্ত করার বাধ্যবাধকতাও নেই। এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে পরীক্ষার অল্প আগে প্রশ্নপত্র তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যাঁরা চূড়ান্ত প্রশ্নপত্র যাচাই করবেন, পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের বাইরের যোগাযোগ থেকে কঠোরভাবে বিচ্ছিন্ন রাখার সুপারিশও করেছে কমিটি।

প্রশ্নভান্ডার তৈরি ও অনুবাদের জন্য আইআইটি, এইমস এবং আইআইএমের মতো প্রতিষ্ঠানের যোগ্য বিশেষজ্ঞদের নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে নিয়োগের আগে তাঁদের পূর্ববর্তী কাজ ও সততা যাচাই করতে হবে। বেসরকারি কোচিং সেন্টারের মালিকানা বা শিক্ষকতার সঙ্গে সম্পর্ক কিংবা পরিবারের কেউ সংশ্লিষ্ট পরীক্ষায় বসছেন কি না, তা খতিয়ে দেখে স্বার্থের সংঘাত এড়াতে হবে।

নিট-ইউজিকেও ধাপে ধাপে কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষায় নিয়ে যাওয়ার পক্ষে কমিটি। তবে তার আগে ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলে সরকারি পরিকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে এক হাজার সুরক্ষিত সরকারি পরীক্ষাকেন্দ্র গড়া এবং প্রত্যেক জেলায় অন্তত একটি কেন্দ্র রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। স্কুল-কলেজে ১০০ থেকে ২০০ কম্পিউটারসমৃদ্ধ পরীক্ষাগার তৈরিতে এনটিএ অর্থ দিতে পারে। এতে পরীক্ষার্থীদের যাতায়াত ও থাকার খরচ কমবে।

যেখানে কম্পিউটার বা ইন্টারনেট সংযোগের অভাবে এই ব্যবস্থা এখনই চালু করা সম্ভব নয়, সেখানে অন্তর্বর্তী মিশ্র পদ্ধতি বিবেচনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাতে সুরক্ষিত সাংকেতিক ব্যবস্থায় প্রশ্ন সরাসরি কেন্দ্রে পাঠিয়ে সেখানেই ছাপানো যেতে পারে। পূর্ণাঙ্গ পরিকাঠামো তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থা চলতে পারে।

পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কথাও বলা হয়েছে। যুক্তিসঙ্গত কারণে কয়েক মিনিট দেরিতে পৌঁছলে লিখিত অঙ্গীকার নিয়ে তাঁদের পরীক্ষায় বসতে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে তাঁরা কেবল অবশিষ্ট সময় পাবেন, বাড়তি সময় নয়। স্বাক্ষর ও নথি পরীক্ষার আনুষ্ঠানিকতা সেরে নেওয়ার জন্য পরীক্ষার আগে অথবা পরে আলাদা ১৫ মিনিট রাখার প্রস্তাব রয়েছে, যাতে পরীক্ষার মাঝখানে মনোযোগ নষ্ট না হয়।

সংস্থার জনবল নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে কমিটি। অনুমোদিত ৩৯টি পদের মধ্যে মাত্র ২৩টিতে আধিকারিক কর্মরত, অর্থাৎ প্রায় ৪১ শতাংশ পদ খালি। শূন্যপদ দ্রুত পূরণের পাশাপাশি পরীক্ষার নিরাপত্তা, ডিজিটাল পরিকাঠামো, তথ্য বিশ্লেষণ ও ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ স্থায়ী কর্মীবাহিনী তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় নিষিদ্ধ পরীক্ষাসংক্রান্ত পরিষেবাদাতা সংস্থাগুলির একটি প্রকাশ্য জাতীয় তালিকাও চেয়েছে কমিটি।

এনটিএর কাজকর্মে সংসদের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার উপযুক্ত ব্যবস্থার কথাও প্রতিবেদনে রয়েছে। কমিটির মতে, পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়ম বদলের সঙ্গে দায়িত্ববোধ, স্বচ্ছতা এবং পরীক্ষার্থীদের উদ্বেগ শোনার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও প্রয়োজন। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতামত গ্রহণকে সংস্থার নিয়মিত কাজের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ করার সুপারিশও করা হয়েছে।