বাংলাস্ফিয়ার: প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ডাকা বিক্ষোভ ঘিরে শনিবার ব্যাপক পুলিশি ধরপাকড়ের সাক্ষী হল দিল্লি। শুধু রাজধানী নয়, দিল্লি বিমানবন্দর, গুরুগ্রাম, চণ্ডীগড় ও মুম্বইয়েও বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়া মানুষকে আটক করা হয়। রাজনৈতিক নেতাদের বাসভবনের বাইরে এবং প্রতিবাদস্থলে যাওয়ার বিভিন্ন পথেও চলে ধরপাকড়।

আম আদমি পার্টির আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়াল এই অভিযানের তীব্র সমালোচনা করে পরিস্থিতিকে জরুরি অবস্থার চেয়েও খারাপ বলে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে, পুলিশের ব্যারিকেড, যান চলাচলে বিধিনিষেধ এবং মানুষের যাতায়াতে বাধার জেরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে।

ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে, সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা নির্ধারিত বিক্ষোভে যোগ দিতে দিল্লিতে পৌঁছনোর পর বিমানের ভিতর থেকেই তাঁদের আটক করে দিল্লি পুলিশ। এর ফলে আন্দোলনের প্রধান সংগঠকেরা যন্তর মন্তরে পৌঁছতে পারেননি।

শনিবারই দিপকের ঠাকুমা, ৮৫ বছরের সাবিত্রীবাই শঙ্কর দিপকের মৃত্যু হয়। এর পর পুলিশ তাঁকে দু’টি বিকল্প দেয়—দিল্লিতে আটক অবস্থায় থাকা অথবা মহারাষ্ট্রে চলে যাওয়া।

পুলিশ সূত্রের খবর, ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীকে গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬-তে তাঁর বাসভবন থেকে আটক করা হয়। বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়ার সময় সিজেপির আইনবিষয়ক বিভাগের প্রধান রত্না সিংহকেও আটক করা হয়েছে বলে জানা যায়।

এই ধরপাকড়ের নিন্দা করে সিজেপি অভিযোগ করেছে, দলের নেতৃত্ব যাতে বিক্ষোভে অংশ নিতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ। আটক হওয়ার আগে একটি ভিডিয়ো রেকর্ড করেছিলেন দিপকে। সেখানে তিনি জানান, তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের জাতীয় সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা অজিঙ্ক্য শিন্ডে বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেবেন।

পুলিশি বিধিনিষেধের কারণে যন্তর মন্তরে পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়ায় আন্দোলনকারীরা দিল্লি হাটের দিকে মিছিল করার চেষ্টা করেন। সেই মিছিল থেকে আইসা নেত্রী নেহা বোরা, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণকে আটক করা হয়।

প্রতিবাদস্থলে পৌঁছনোর চেষ্টা করছিলেন, এমন ছাত্রকর্মী ও আইনজীবীদেরও আটক জানান, সকাল ১০টা নাগাদ মিছিল শুরু করার পর তাঁদের সংগঠনের চারশোর বেশি সদস্যকে আটক করা হয়েছে।

তরুণ আইনজীবীদের, বিশেষত মহিলা আইনজীবীদের আটক করার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের হস্তক্ষেপ চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি আটক আইনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এবং যাঁদের আটকে রাখার কোনও আইনসংগত ভিত্তি নেই, তাঁদের মুক্তি দেওয়ার আবেদন জানিয়েছে।

গুরুদ্বারা বাংলা সাহিবের কাছ থেকে আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ঐশী ঘোষও ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। দিল্লির অন্য বিভিন্ন জায়গা থেকেও আন্দোলনকারীদের তুলে নিয়ে যায় পুলিশ।

পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিল্লিতে তাঁর বাসভবনের বাইরে দলীয় সহকর্মীদের সঙ্গে আটক করা হয়। তাঁর সঙ্গে আটক হন ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন, সাকেত গোখলে এবং প্রতিমা মণ্ডল।

এর আগে সাউথ অ্যাভিনিউ বাসস্ট্যান্ডের কাছে ধর্নায় বসেছিলেন মমতা। তাঁর অভিযোগ ছিল, তাঁকে ওই এলাকা থেকে বেরোতে দেওয়া হচ্ছে না। বিক্ষোভ ঘিরে আরোপিত বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে অন্যান্য বিরোধী নেতার সঙ্গে তৃণমূল নেতৃত্বও সরব হওয়ায় রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয়।

প্রতিবাদে যোগ দিতে যাওয়ার পথে যন্তর মন্তর রোডে কেরল হাউসের কাছে আটক হন কেরলের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। রাজ্যসভার সাংসদ জন ব্রিটাস এবং কেরলের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী কে এন বালগোপালকেও আটক করা হয়েছে বলে জানা যায়।

আটক বাম নেতাদের তালিকায় সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, বৃন্দা কারাট, এম ভি গোবিন্দন, কে কে শৈলজা, পি কে শ্রীমতী এবং ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের নামও উঠে এসেছে।

এদিকে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলাকালীন চণ্ডীগড়ে আপ নেতা তথা দিল্লির প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী মণীশ সিসোদিয়াকে আটক করে পঞ্জাব পুলিশ।

মুম্বইয়ে সিজেপির আন্দোলনের সমর্থনে আয়োজিত বিক্ষোভে যোগ দিতে অগস্ট ক্রান্তি ময়দানে যাওয়ার পথে সহযোগীদের সঙ্গে আটক হন ‘হম ভারত কে লোগ’-এর সভাপতি তুষার গান্ধী। এক পুলিশ আধিকারিক জানান, গান্ধীকে ডি এন নগর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁর এক সহযোগীকে নিয়ে যাওয়া হয় অন্ধেরির এমআইডিসি থানায়।

ধরপাকড় এবং বিক্ষোভ ঘিরে বিধিনিষেধের তীব্র সমালোচনা করেছেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। এক্সে একটি পোস্টে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধ মত দমনের অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা প্রশ্নে সরকারের ভয় থেকেই এই অভিযান।

কেজরিওয়াল লেখেন, “এ বার স্পষ্ট হয়ে গেল, আমরা মোদীর শাসনাধীন এক নিরঙ্কুশ একনায়কতন্ত্রে বাস করছি। বিমান থেকে সরাসরি ককরোচদের গ্রেফতার করা অভূতপূর্ব আতঙ্কের পরিচয়। প্রধানমন্ত্রী মোদী ভাল করেই জানেন, তিনি কেবল ভোট চুরি করে নির্বাচনে জিতেছেন। এখন গণতন্ত্রকে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজের জালিয়াতি আড়াল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। জ্ঞানেশকে যেতেই হবে, কিন্তু মোদীকেও যেতে হবে।”

এগুলি সরকারের বিরুদ্ধে কেজরিওয়ালের অভিযোগ; স্বাধীন যাচাইয়ে প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়। আপের আরও দাবি, কেজরিওয়ালের বাসভবনের বাইরে পুলিশ মোতায়েন বাড়ানো হয়েছে এবং দলের জাতীয় কার্যালয় সিল করে দেওয়া হয়েছে।

মধ্য দিল্লিজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিক্ষোভস্থলের দিকে যাওয়ার রাস্তাগুলিতে ব্যারিকেড ও তল্লাশিচৌকি বসায় পুলিশ। হাজার হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। বিধিনিষেধের প্রভাব পড়ে চল্লিশটিরও বেশি মেট্রো স্টেশনে।

বেলা ২টো পর্যন্ত আড়াইশোর বেশি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে বলে খবর, যার ফলে যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন অংশে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারায় নিষেধাজ্ঞাও জারি করে পুলিশ।

পুলিশ সূত্রের খবর, রাতভর প্রায় ১,২০০ জনকে আটক করা হয়েছিল। দিল্লি পুলিশ আরও জানায়, সকালে দল বেঁধে আসা প্রায় ৫০০ জনকে আটক করা হয়। পরে, বিকেল ৩টে নাগাদ আটকের সংখ্যা দু’হাজার ছাড়িয়ে যায়।

এই বিধিনিষেধের বিষয়টি আদালতেও পৌঁছেছে। ১০ অক্টোবর মানুষের যাতায়াত সংক্রান্ত আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘনের অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টে আদালত অবমাননার কার্যক্রম শুরুর আর্জি জানিয়ে আবেদন করা হয়েছে।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরে অনিয়ম এবং নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করার জন্য ব্যবহৃত ফর্ম ৬ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ তুলে এই বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল সিজেপি। তাদের প্রধান দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে।

সিজেপি এবং তার সমর্থকদের অভিযোগ, ভোটার তালিকায় কারচুপি করা হয়েছে। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের সঙ্গে শাসকপক্ষের বিরোধ তীব্র হয়েছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য নিজেদের ভোটার যাচাই প্রক্রিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। শাসকদলকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য এই প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে—বিরোধীদের সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে বিজেপি।