বাংলাস্ফিয়ার: ভারতকে ‘ভেঙে দেওয়ার’ চেষ্টা সফল হবে না। মঙ্গলবার এমনই মন্তব্য করলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবত। তাঁর বক্তব্য, শাসক পরিবর্তন হলেই পরিস্থিতি বদলে যাবে, এমন ধারণা ভুল। তিনি বলেন, “অতীতেও এমন হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না।”

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এ অনিয়মের অভিযোগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে চলতে থাকা প্রতিবাদের মধ্যেই ভাগবত বলেন, আন্দোলন পরিবর্তন আনে না। সমস্যার সমাধান সমাজের ভিতর থেকেই উঠে আসে।

নাগপুরে বিজয়াদশমী উৎসবে ভাষণ দিতে গিয়ে সঙ্ঘপ্রধান বলেন, “ভারতই তাদের প্রধান নিশানা, কারণ ভারত এগিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক দশকে দৃঢ় নীতির ভিত্তিতে ভারত যেভাবে এগিয়েছে, তাতে এই অশুভ শক্তিগুলি জানে যে তারা ভারতকে বিপর্যস্ত করতে পারবে না… তারা ভারত ও সঙ্ঘকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছে।”

ভাগবত সতর্ক করে বলেন, প্রতিবাদ যখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয় বা উসকানিতে পরিচালিত হয়, তখন তা উত্তেজনা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে এবং জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে।

তাঁর বক্তব্য, ভারত যাতে উন্নত দেশ হয়ে ওঠার পথ থেকে বিচ্যুত হয়, এমন কিছু শক্তি সক্রিয় রয়েছে। এ বিষয়ে ভারতবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, “এটা স্পষ্ট… বিশ্বে এমন অনেক শক্তি রয়েছে, যারা ভারতের পরাজয় চায়।”

তিনি আরও বলেন, “পশ্চিম দিক থেকে একটি ঝড় আসছে, যা সংস্কৃতি, ব্যবস্থা ও নিরাপত্তাকে ঘৃণা করে… যা ধ্বংস করতে চায়…” সমস্যার সমাধানের পথ হিসেবে শাসক পরিবর্তনকে তুলে ধরার পিছনে বিদেশি হস্তক্ষেপের যুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে তিনি ফ্রান্স, নেপাল ও বাংলাদেশের উদাহরণও দেন।

ভাগবতের দাবি, ভারতেও এমন এক শ্রেণির মানুষ রয়েছেন, যাঁদের বক্তব্যে ওই শক্তিগুলির ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটে। তিনি বলেন, “ভারতেও কিছু মানুষ রয়েছেন, যাঁরা তাদের মতোই মত পোষণ করেন… যাঁদের বুদ্ধি কম, অথচ ক্ষমতার তৃষ্ণা প্রবল।”

সমাজকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মানুষকে নিশ্চিত করতে হবে যে সমস্যার সমাধান সমাজের ভিতর থেকেই আসবে, আন্দোলনের মাধ্যমে নয়।

এসআইআর-এ অনিয়মের অভিযোগে দিল্লির প্রতিবাদ ‘আসলে শাসক পরিবর্তনের লড়াই’ হয়ে উঠেছে বলে সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ মন্তব্য করার কয়েক দিনের মধ্যেই ভাগবতের এই বক্তব্য সামনে এল। ভূষণের মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

গত সপ্তাহে ভূষণ বলেছিলেন, “সরকার অভিযোগ করছে, বিরোধীরা শাসক পরিবর্তন চায়… আমরা এখন লড়ছি যাতে নির্বাচন সঠিকভাবে হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু এই ধরনের বর্বরতা চলতে থাকলে অবশ্যই শাসক পরিবর্তন হবে।”

বিজেপি পাল্টা আক্রমণ করে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ কারও নাম না করে অভিযোগ করেন, কয়েকটি গোষ্ঠী তরুণদের ব্যবহার করে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে চাইছে। বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র সি আর কেশবনও শাসক পরিবর্তনের ডাকের সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, ভূষণের মন্তব্য প্রমাণ করেছে যে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আসলে সরকার ফেলে দেওয়ার বিরোধী পরিকল্পনাকে আড়াল করার উপায়।

নাগপুরের ভাষণে সঙ্ঘপ্রধান আরও বলেন, ভারতকে পথ দেখাতে হবে এবং উন্নয়নের এমন নতুন মাপকাঠি তৈরি করতে হবে, যার বিরূপ প্রভাব মানবজাতির উপর পড়বে না।

তিনি বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি হবে। কিন্তু তার সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য ও নৈতিকতা যাতে উপেক্ষিত না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ভারতের বৈচিত্র্য রক্ষা করা এবং তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, এ দেশে ধর্ম, ভাষা ও খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্য রয়েছে।

উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার মধ্যে অসংগতির উদাহরণ হিসেবে নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার প্রসঙ্গ তোলেন ভাগবত। তিনি বলেন, “কলকাতায় যা ঘটেছে, অর্থাৎ পদপিষ্ট হয়ে মানুষের মৃত্যু, তা আমাদের নিজেদের ভুলের জন্য… কিন্তু নেপালে যা ঘটেছে, তা প্রাকৃতিক বিপর্যয়…”

ভারত, নেপাল ও চিনের অন্তর্গত সমগ্র হিমালয় অঞ্চল নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন, উন্নয়ন সেখানে সমস্যা তৈরি করছে।

ভাগবতের কথায়, “অনেক প্রাণহানি হয়েছে। উন্নয়নের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে, উন্নয়নের মূল্য যেন মানুষের মৃত্যু না হয়।”