বাংলাস্ফিয়ার : হামলার পরে বিদেশে পাঠিয়ে ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, জেরায় দাবি অভিযুক্তদের; ব্যবহৃত বাইক ও মোবাইলের সূত্র ধরে সন্ধান পেল পুলিশ ।

মুম্বইয়ের জুহুতে একটি ফুটবল মাঠের বাইরে অভিনেতা টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো তিন অভিযুক্তকে রাজস্থানের কোটা জংশনে জয়পুরগামী একটি এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সোমবার দুপুরে রাজস্থান পুলিশের একটি দল তাদের ধরে।

মুম্বইয়ে পুলিশ হামলায় ব্যবহৃত বাজাজ পালসার মোটরবাইকটি বাজেয়াপ্ত করেছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হয়েছে পাঁচটি গুলির খোল এবং দু’টি তাজা কার্তুজ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক তদন্তকারী জানিয়েছেন, ৩৬ বছরের টাইগারকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে তুরস্কে তৈরি অত্যাধুনিক জিগানা হ্যান্ডগান এবং একটি দেশি পিস্তল ব্যবহার করা হয়েছিল।

ওই তদন্তকারী বলেন, “টাইগারের ভাগ্য ভাল, এই হামলা থেকে অক্ষত অবস্থায় রক্ষা পেয়েছেন। একটি গুলি গাড়ির বনেটে আটকে যায়। অন্যটি সামনের কাচ ভেদ করতে পারেনি।” হামলায় আহত হয়েছেন সপ্তাহান্তে ভ্লগ তৈরি করেন এমন এক ব্যক্তি, ৩৫ বছরের উমেশ চৌহান। বুকে গুলি আটকে থাকা অবস্থায় তিনি কেঈএম হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।

মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীস নাগপুরে সাংবাদিকদের বলেন, “এই হামলার পিছনে থাকা কাপুরুষদের রেয়াত করা হবে না।” উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে বলেন, প্রয়োজন হলে ‘গুলির জবাব গুলিতে’ দেওয়ার নীতি নিতে সরকার পিছপা হবে না।

সোমবার তোলাবাজি দমন শাখা এবং জুহু পুলিশের তৈরি পঞ্চনামা বা সাক্ষীদের উপস্থিতিতে প্রস্তুত পরীক্ষার বিবরণ থেকে জানা যায়, টাইগারের বিএমডব্লিউ গাড়ির সামনের কাচে গুলি সরাসরি আঘাত করেনি। গাড়িটি সান্তাক্রুজ থানার পিছনে রাখা ছিল। সামনের কাচের বাঁ দিকে গুলির খোল পাওয়া যায়। ঘটনার সময়ে টাইগার সামনের যাত্রী আসনে বসেছিলেন।

তাঁর গাড়িচালক তথা দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ৪৮ বছরের ফিরদৌস ইব্রাহিম বালোচের বাঁ হাতে একটি গুলি লাগে। দু’টি গুলি গাড়ির ভিতরে ঢোকে। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান টাইগার। সামনের কাচ ভেঙে তার টুকরো ছিটকে এসে তাঁর শরীরে সামান্য আঁচড় ও আঘাত লাগে।

পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতদের মধ্যে রয়েছে হরিয়ানার সোনিপতের বাসিন্দা, দু’জনেই ১৮ বছরের, ফুল সিংহ ও রেহান আনসারি। তৃতীয় অভিযুক্ত বিহারের বাসিন্দা ২২ বছরের হৃতিক কুমার ওরফে রোশন রামু মাহাতো। সে মুম্বইয়ে র‍্যাপিডোর সঙ্গে কাজ করত।

র‍্যাপিডোর এক মুখপাত্র বলেন, “টাইগার শ্রফ ও তাঁর দলের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি নিরাপদে আছেন জেনে স্বস্তি পেয়েছি। তাঁর দ্রুত সুস্থতা কামনা করি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আমাদের প্ল্যাটফর্মে ‘ক্যাপ্টেন’ হিসেবে নথিভুক্ত এক ব্যক্তির উল্লেখ রয়েছে বলে আমরা জানি। ১৪ অক্টোবর থেকে তিনি আমাদের প্ল্যাটফর্মে ক্যাপ্টেন হিসেবে সক্রিয় ছিলেন না। ভারতের বৃহত্তর গিগ অর্থনীতিতে একই ব্যক্তি একাধিক প্ল্যাটফর্মে নথিভুক্ত থাকতে পারেন, এমনটা সাধারণ ঘটনা। ঘটনার দিন ওই ব্যক্তি গ্রাহক হিসেবে র‍্যাপিডোর পরিষেবা ব্যবহার করেছিলেন।” তদন্তকারীদের সহযোগিতা করা হচ্ছে বলেও জানান ওই মুখপাত্র।

সোমবার কোটার একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ধৃতদের তিন দিনের ট্রানজিট রিমান্ডে মুম্বই অপরাধ দমন শাখার হাতে তুলে দেয়। এই শাখাই ঘটনার তদন্ত করছে। পুলিশের বক্তব্য, প্রতি রবিবার টাইগার যে মাঠে ফুটবল খেলতে যেতেন, হামলার আগের সপ্তাহেই সেখানে গিয়ে নজরদারি চালিয়েছিল ওই তিন জন।

রবিবার সন্ধ্যায় টাইগার মাঠ থেকে বেরোনোর সময়ে তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় ফুল সিংহ ও রেহান আনসারি। পালানোর ব্যবস্থা করে কাছেই একটি হলুদ পালসার বাইক নিয়ে অপেক্ষা করছিল মাহাতো। আন্ধেরির ডিএন নগরে পৌঁছে তারা বাইকটি ফেলে দেয়। সেখান থেকে হেঁটে স্থানীয় স্টেশনে গিয়ে কান্দিভলিগামী লোকাল ট্রেনে ওঠে।

কান্দিভলিতে নেমে সুরাত যাওয়ার জন্য একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে তারা। সুরাত থেকে রাত দেড়টা নাগাদ পুণে–জয়পুর এক্সপ্রেসের সাধারণ কামরায় উঠে পড়ে। কোটার পুলিশ সুপার তেজস্বিনী গৌতম জানিয়েছেন, জেরায় জানা গিয়েছে, দিল্লিতে নামার পরে বিদেশে, সম্ভবত নেপালে, পালানোর পরিকল্পনা ছিল ওই তিন জনের।

সাংবাদিক বৈঠকে কোটা পুলিশ দাবি করেছে, সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায় মুম্বই পুলিশের কাছ থেকে অভিযুক্তদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার পরে তারা রেলস্টেশনে পৌঁছে তিন জনকে গ্রেফতার করে। জেরায় অভিযুক্তেরা জানিয়েছে, হামলার জন্য তাদের ৩৭ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি বিদেশে পাঠিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করে দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়।

১৮ বছরের দুই অভিযুক্ত ফুল সিংহ ও রেহান আনসারির বিরুদ্ধে আগে থেকেই অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ফুল সিংহ সোনিপতে একটি বাইক চুরি করেছিল। আনসারির বিরুদ্ধে রাজস্থানে অস্ত্র আইনে মামলা রয়েছে।

অপরাধ দমন শাখার এক আধিকারিক জানিয়েছেন, তৃতীয় অভিযুক্ত হৃতিক কুমার গত ১১ সেপ্টেম্বর ২৫ হাজার টাকায় পুরনো বাজাজ পালসার বাইকটি কিনেছিল। বাইকটির আগের মালিক তখনও সেটির মালিকানা কুমারের নামে হস্তান্তর করেননি। তাঁর কাছ থেকেই কুমারের মোবাইল নম্বর পায় পুলিশ। নম্বরটি সক্রিয় থাকায় কুমার এবং তার সঙ্গীদের গতিবিধি অনুসরণ করা সহজ হয়।

অপরাধ দমন শাখার এক পদস্থ আধিকারিক বলেন, “আমরা ট্রেনের ফুটেজ খতিয়ে দেখে যে কামরায় ওই তিন জন যাচ্ছিল, সেটি চিহ্নিত করি। রাজস্থান পুলিশকে সেই তথ্য দেওয়া হয়। তার ভিত্তিতেই তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়।”

রেলের আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রেল সুরক্ষা বাহিনী বা আরপিএফ এবং রেল পুলিশ বা জিআরপির একটি দল গঠন করা হয়। পশ্চিম রেলের এক আধিকারিক বলেন, “বিভিন্ন স্টেশনের নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করা হয়। তার পরে সুরাত স্টেশন থেকে তাদের গতিবিধি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। পরের দিন সকাল প্রায় ১০টা ১৫ মিনিটে রেল পুলিশ ও স্থানীয় পুলিশের দল কোটায় তাদের ধরে।”

ওই আধিকারিক আরও জানান, আনসারি লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সদস্য অনিল পণ্ডিতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল। সহযোগী গ্যাংস্টার হরমন সান্ধুর সঙ্গে মিলে হামলার পরিকল্পনা করার দায় স্বীকার করেছে অনিল। পলাতক সান্ধু চলতি বছরের গোড়ায় দিল্লিতে গায়ক গুরু রণধাওয়ার জিমে গুলি চালানোর দায়ও স্বীকার করেছিল। বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সদস্য অনিল পণ্ডিত ক্যালিফোর্নিয়ায় গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছে বলে অভিযোগ।

সামাজিক মাধ্যমে হিন্দিতে লেখা একটি পোস্টে ওই দু’জন দাবি করেছে বলে অভিযোগ, “আমরা আগে ওকে ফোন করে বুঝিয়েছিলাম। কিন্তু ও বোঝেনি। তাই আজ বেশ ভাল করেই বুঝিয়ে দিয়েছি—মুম্বইয়ের চলচ্চিত্র জগতে যে আমাদের কথা মানবে না, অথবা সলমন খানের সঙ্গে কাজ করবে, এর পরে তার পালা আসবে। অপেক্ষা করো, দেখতে পাবে।”

এই হামলাকে কেন্দ্র করে মহারাষ্ট্রে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। শিবসেনার রাজ্যসভার সাংসদ মিলিন্দ দেওরা ঘটনাটিকে গভীর উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে, শিবসেনা (ইউবিটি)-র সাংসদ সঞ্জয় রাউতের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে রাজ্য সরকার।

রাউত বলেন, “মুম্বই এবং রাজ্যজুড়ে জঙ্গলরাজ চলছে। আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। নব্বইয়ের দশকে মুম্বইয়ে তোলাবাজি, গুলি, অপহরণ ও গ্যাংয়ের লড়াই দেখা গিয়েছিল। এখন সেই দিনই ফিরে আসছে।” মহারাষ্ট্রে একজন পূর্ণসময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সমালোচনার জবাবে মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীস বলেন, “ওঁরা কি ভুলে গিয়েছেন, কী ভাবে ওঁদের মন্ত্রীদের জেলে যেতে হয়েছিল? ওঁদের আমলে দেশের বৃহত্তম শিল্পপতিও নিরাপদ ছিলেন না। তাঁর বাড়ির বাইরে বোমা রাখা হয়েছিল।”