বাংলাস্ফিয়ারঃ দুর্গাপুজোর মণ্ডপগুলিতে, বিশেষ করে চিত্তরঞ্জন পার্কে (সিআর পার্ক), হাজার হাজার দর্শনার্থী ভিড় জমাচ্ছেন। উৎসবকে আনন্দময় ও নিরাপদ রাখতে জরুরি নির্গমনপথ থেকে অগ্নিনিরাপত্তা—বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছেন আয়োজকেরা। তাঁদের বক্তব্য, সিআর পার্কের পুজো কমিটি বিশেষ একটি দুর্যোগ মোকাবিলা দলও গঠন করেছে।

শনিবার সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু এবং ২৫ জন আহত হওয়ার ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

দিল্লি পুলিশের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, বড় জনসমাগমের আয়োজন করতে হলে যে সমস্ত নিরাপত্তার শর্ত পূরণ করতে হবে, সেগুলি দুর্গাপুজো ও রামলীলার আয়োজকদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিটি অনুষ্ঠানস্থলের পরিস্থিতি অনুযায়ী নিরাপত্তা মূল্যায়ন, সচল সিসিটিভি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত ব্যারিকেড, সুপরিকল্পিত প্রবেশ ও বেরোনোর পথ, অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে পুলিশ পোস্ট ও কন্ট্রোল রুম এবং পুলিশকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় রাখার জন্য যথেষ্ট সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক।

পূর্বাঞ্চলীয় রেঞ্জের এক পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, মানুষ মঞ্চে ওঠেন বলে মঞ্চগুলির কাঠামো মজবুত এবং বেশি ওজন বহনে সক্ষম কি না, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে আয়োজকদের। দরজার কাঠামোয় বসানো মেটাল ডিটেক্টর এবং হাতে ব্যবহার করার মেটাল ডিটেক্টরের ব্যবস্থাও রাখতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকের কাছে স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচয় ও অন্যান্য বিবরণ জমা দিতে হবে।

ওই আধিকারিক বলেন, “আগুন নেভানোর সরঞ্জাম, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র এবং বালি ও জলের ব্যবস্থা প্রতিদিন পরীক্ষা করে সেগুলি কার্যকর রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে আয়োজকদের। জরুরি নির্গমনপথ এবং বিপদের সময় মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পথ স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। সেখানে কোনও বাধা রাখা চলবে না। শর্ট সার্কিট ও আগুন লাগার ঝুঁকি এড়াতে বিদ্যুতের সংযোগ ও সরঞ্জাম পরীক্ষা করতে হবে। কোনও আলগা তার খোলা অবস্থায় ফেলে রাখা যাবে না।”

পুলিশ জানিয়েছে, অনুষ্ঠানস্থলের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাথমিক চিকিৎসা, অ্যাম্বুল্যান্স এবং চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থাও রাখতে বলা হয়েছে।

উত্তরাঞ্চলীয় রেঞ্জের আর এক আধিকারিক বলেন, “অনুষ্ঠানস্থলে বা তার আশপাশে বাজি ফাটানো এবং গুলি ছোড়া নিষিদ্ধ। প্রবেশপথ, বেরোনোর পথ ও পথচারীদের চলাচলের জায়গায় জবরদখল এবং হকারদের সরাতে হবে, যাতে মানুষের চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে ভিড় আটকে না যায়। গাড়ি রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনাও থাকতে হবে।”

রাজধানীতে দুর্গাপুজোর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র চিত্তরঞ্জন পার্ক। আয়োজকেরা জানিয়েছেন, সেখানে স্থানীয় বাসিন্দা, প্রবীণ নাগরিক এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা প্রবেশপথের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের গাড়ির পাস এবং সন্ধ্যায় যান চলাচলে বিধিনিষেধ নিয়েও দিল্লি পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করেছেন আয়োজকেরা। সন্ধ্যার সময় দর্শনার্থীর ভিড় বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

কালীমন্দির সিআর পার্ক মন্দির সোসাইটির কার্যনির্বাহী সদস্য এবং সাংস্কৃতিক কমিটির চেয়ারম্যান প্রদীপ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “সিআর পার্কের বাসিন্দারা যাতে ভিড়ের মধ্যে আটকে না পড়ে মণ্ডপে পৌঁছতে পারেন, সে জন্য আমরা তাঁদের পাসের ব্যবস্থা করেছি।”

আয়োজকেরা জানিয়েছেন, ১০টি সর্বজনীন পুজোমণ্ডপের পাশাপাশি আরও ১০টি মণ্ডপে প্রতিমা থাকবে। মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং ভিড় কমাতে সর্বজনীন পুজোমণ্ডপগুলিতে আলাদা নির্গমনপথ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “আলোর যথাযথ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং অ্যাম্বুল্যান্সও রয়েছে।”

তিনি আরও জানান, আয়োজকেরা বিশেষ একটি দুর্যোগ মোকাবিলা দল গঠন করেছেন। প্রাক্তন সেনাকর্মীদের তত্ত্বাবধানে গত এক মাস ধরে এই দলের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

তবে পুজোমণ্ডপে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে অভিযোগও উঠেছে। গঙ্গোপাধ্যায়ের অভিযোগ, শুক্রবার ও শনিবার দিল্লি পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর (সিআরপিএফ) সদস্যেরা মণ্ডপে ঢুকে রাত ১০টার সময় মানুষকে চলে যেতে বলেন।

তিনি বলেন, “ওঁরা আয়োজকদের অনুষ্ঠান গুটিয়ে নিতে বলেন। আগে আমাদের ভদ্রভাবে অনুরোধ করতেন। কিন্তু এ বার জোর করা হয়েছে।” তাঁর বক্তব্য, এলাকায় জোরে সাইরেনও বাজছিল।

সমাজমাধ্যমেও অনেকে একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

সাংবাদিক পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা এক্সে একটি পোস্টে সিআর পার্কের এক বাসিন্দার বক্তব্য তুলে ধরেন। ওই বাসিন্দার অভিযোগ, শনিবার রাত প্রায় সাড়ে ১১টায় লাঠি হাতে প্রায় ২০ জন সিআরপিএফ জওয়ান সিআর পার্কের বি ব্লকের পুজোমণ্ডপে ঢুকে পড়েন। তাঁর দাবি, কমিটির সদস্যেরা এ ভাবে ঢুকে পড়ার প্রতিবাদ করেন এবং জওয়ানদের মণ্ডপ থেকে বের করে দেন।

তবে এক উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিকের বক্তব্য, গত কয়েক বছরের উৎসবের মতোই এ বারও বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “জোরে সাইরেন বাজানো ছাড়া অস্বাভাবিক কিছু নেই। মহিলাদের নিরাপত্তাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। পুলিশের উপস্থিতি যাতে বোঝা যায়, সে জন্যই সাইরেন বাজানো হচ্ছে।”

এ দিকে দুর্গাপুজো উপলক্ষে ১৬ থেকে ২০ অক্টোবর চিত্তরঞ্জন পার্ক, গ্রেটার কৈলাস–২ এবং সংলগ্ন এলাকায় যান চলাচলে বিধিনিষেধ ঘোষণা করে নির্দেশিকা জারি করেছে দিল্লি ট্র্যাফিক পুলিশ। প্রতিদিন বিকেল ৪টে থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত যানজটের আশঙ্কার কথাও জানানো হয়েছে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, বিধিনিষেধ কার্যকর থাকার সময়ে সিআর পার্ক ও গ্রেটার কৈলাস–২ এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়ি ঢুকতে দেওয়া হবে না।

দুই এলাকার ভিতরের রাস্তাগুলির পাশাপাশি বসন্ত বিহার থেকে মোদি মিল উড়ালপুল পর্যন্ত আউটার রিং রোড, লালা লাজপত রাই মার্গ, অগস্ট ক্রান্তি মার্গ, মেহরৌলি–বদরপুর রোড, গুরু রবিদাস মার্গ, লালবাহাদুর শাস্ত্রী মার্গ এবং জোসিপ ব্রজ টিটো মার্গে যান চলাচল ব্যাহত হতে পারে বলে জানিয়েছে ট্র্যাফিক পুলিশ।