বাংলাস্ফিয়ারঃ একদিন যেখানে সূর্যের ছায়া মেপে সময় নির্ণয় করা হতো, সেখানেই পরবর্তী কালে ধ্বনিত হয়েছে রাষ্ট্রের কাছে মানুষের দাবি। দিল্লির যন্তর মন্তর তাই একই সঙ্গে ভারতের বিজ্ঞানচর্চা ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের স্মারক। সোমবার, ১২ অক্টোবর, দিল্লি পুলিশ প্রতিবাদস্থল হিসেবে এর নির্ধারিত মর্যাদা প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করেছে। বিকল্প হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দান।
যন্তর মন্তরের জন্ম অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে। মুঘল সম্রাট মুহম্মদ শাহের অনুরোধে জয়পুরের মহারাজা সওয়াই দ্বিতীয় জয় সিংহ এই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকেন্দ্র নির্মাণ করেন। দিল্লি পর্যটন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণকাল ১৭২৪। প্রথমে এর নাম ছিল ‘যন্ত্র মন্ত্র’। এখানে ‘যন্ত্র’ বলতে পর্যবেক্ষণের উপকরণ এবং ‘মন্ত্র’ বলতে গাণিতিক সূত্র বোঝানো হতো। প্রচলিত ছোট যন্ত্রে নিখুঁত পরিমাপের অসুবিধা দেখে জয় সিংহ বৃহদাকার স্থাপত্যের মাধ্যমে আরও নির্ভুল পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা গড়েছিলেন।
এই কেন্দ্রের প্রধান আকর্ষণ সম্রাট যন্ত্র, রাম যন্ত্র, জয়প্রকাশ যন্ত্র ও মিশ্র যন্ত্র। এগুলি নিছক স্থাপত্যের নিদর্শন নয়; প্রতিটি নির্মাণের পিছনে রয়েছে নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন। বিশাল সূর্যঘড়ির সাহায্যে স্থানীয় সময় নির্ণয় করা হতো। অন্য যন্ত্রগুলি আকাশে জ্যোতিষ্কের অবস্থান মাপতে সাহায্য করত। সূর্যের আলো ও ছায়ার গতিপথ এবং সরাসরি পর্যবেক্ষণ ছিল এই পদ্ধতির ভিত্তি। দূরবিন ছাড়াই জ্যোতির্বিজ্ঞানের জটিল হিসাব করার এক অসাধারণ প্রয়াস ছিল এই স্থাপনা।
দিল্লি ছাড়াও জয়পুর, উজ্জয়িনী, বারাণসী ও মথুরায় জয় সিংহের উদ্যোগে মানমন্দির গড়ে ওঠে। এই বৃহত্তর উদ্যোগ ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। তবে দিল্লির চারপাশে উঁচু বাড়ি তৈরি হওয়ায় এখান থেকে আগের মতো নির্ভুল পর্যবেক্ষণ আর সম্ভব নয়। আজ স্থাপনাটি মূলত ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। স্থাপত্য, গণিত এবং পর্যবেক্ষণকে একত্র করার সেই প্রচেষ্টা আজও দর্শকদের সামনে অতীতের বিজ্ঞানমনস্কতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
প্রতিবাদের ঠিকানা হিসেবে এর পরিচিতি গড়ে ওঠে অনেক পরে। আগে রাজধানীর বড় আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র ছিল বোট ক্লাব। ১৯৮৮ সালে মহেন্দ্র সিংহ টিকায়েতের নেতৃত্বে বিপুল কৃষকসমাবেশ সেই এলাকার জনজীবনে প্রবল প্রভাব ফেলে। পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে সেখানে সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা আসে। ১৯৯৩ থেকে যন্তর মন্তর সংলগ্ন রাস্তাটি প্রতিবাদের পরিচিত জায়গা হয়ে ওঠে। সংসদের কাছাকাছি হলেও তুলনায় ছোট এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য হওয়ায় প্রশাসনের কাছেও জায়গাটি সুবিধাজনক ছিল।
আন্দোলন হতো মূলত মানমন্দিরের পাশের রাস্তায়। ২০১১ সালে অণ্ণা হাজারের দুর্নীতিবিরোধী অনশন যন্তর মন্তরকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে এনে দেয়। নির্ভয়ার জন্য ন্যায়বিচারের দাবি, তামিলনাড়ুর ঋণগ্রস্ত কৃষকদের বিক্ষোভ এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী জমায়েতও এই এলাকার ইতিহাসের অংশ। ২০২৩ সালে ব্রিজভূষণ শরণ সিংহের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে আন্দোলনকারী কুস্তিগিরদের অবস্থান আবার দেশজুড়ে মনোযোগ কাড়ে। ভিনেশ ফোগট, সাক্ষী মালিক ও বজরং পুনিয়া ছিলেন সেই আন্দোলনের সামনের সারিতে।
এই প্রতিবাদপরিসর নিয়ে সংঘাত অবশ্য নতুন নয়। শব্দদূষণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অসুবিধার প্রশ্নে ২০১৭ সালে জাতীয় পরিবেশ আদালত সেখানে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছিল। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে সুপ্রিম কোর্ট সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে। আদালত জানায়, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার এবং বাসিন্দাদের শান্তিতে থাকার অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য প্রয়োজন। সমাবেশের জন্য নিয়ম নির্ধারণের নির্দেশও দেওয়া হয়। অর্থাৎ, প্রতিবাদের আয়োজন এবং জনজীবনের স্বাভাবিকতা রক্ষার প্রশ্ন দুটি একসঙ্গেই বিবেচনায় এসেছিল।
এই দীর্ঘ বিবর্তন যন্তর মন্তরকে একটি অনন্য পরিচয় দিয়েছে। সেখানে বিজ্ঞানী আকাশের গতিবিধি বুঝতে চেয়েছিলেন; প্রতিবাদী নাগরিক চেয়েছেন ক্ষমতার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বিক্ষোভের ঠিকানা বদলাতে পারে। কিন্তু তিন দশকের স্লোগান, অনশন ও প্রতিরোধের স্মৃতি এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে। সেই কারণেই যন্তর মন্তরের ইতিহাস স্থাপত্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভারতের জনজীবনের ইতিহাস হয়ে উঠেছে।