বাংলাস্ফিয়ারঃ দিল্লির প্রতিবাদের পরিচিত ঠিকানা যন্তর মন্তর আর পুলিশের নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল থাকছে না। সোমবার, ১২ অক্টোবর, দিল্লি পুলিশ এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। পরিবর্তে মধ্য দিল্লির রামলীলা ময়দান, উত্তর দিল্লির বুরারি মাঠ এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি মাঠকে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ আয়োজনের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এর ফলে রাজধানীতে সংগঠিত প্রতিবাদের স্থানসংক্রান্ত ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এল।

পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমারের জারি করা নির্দেশটির তারিখ ১১ অক্টোবর। নির্দেশে বলা হয়েছে, নাগরিকদের প্রতিবাদ আয়োজনের জন্য বর্তমান নির্ধারিত স্থানের বিকল্প খুঁজতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক একটি কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই যন্তর মন্তরের স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে তিনটি নতুন জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থার বিস্তারিত কার্যপদ্ধতি অবশ্য এখনও এই নির্দেশে জানানো হয়নি। তিনটি মাঠে প্রতিবাদ আয়োজনের জন্য সংশোধিত ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিয়োর’ বা এসওপি আলাদাভাবে প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। নতুন নির্দেশের মাধ্যমে ২০২২ সালের ২৮ এপ্রিলের পূর্ববর্তী স্থায়ী নির্দেশ আংশিক সংশোধন করা হয়েছে। ফলে আয়োজকদের কাছে পরবর্তী নিয়মাবলির বিশেষ গুরুত্ব থাকবে।

এই সিদ্ধান্তের আগে সুপ্রিম কোর্টও বিকল্প প্রতিবাদস্থল চিহ্নিত করার বিষয়টি বিবেচনা করতে বলেছিল। গত ৯ অক্টোবরের শুনানিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের উপযুক্ত সুযোগসুবিধাসম্পন্ন জায়গার প্রসঙ্গ ওঠে। শৌচাগার, পানীয় জল, চিকিৎসা সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়। আদালতের আলোচনার মূল বিষয় ছিল, প্রতিবাদকারীদের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি জনসাধারণের চলাচল নিশ্চিত করা।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর ঘিরে ধারাবাহিক বিক্ষোভের মধ্যেই এই পরিবর্তন ঘটল। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতেও রাজধানীতে আন্দোলন চলছে। ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি এবং অন্য সংগঠনগুলির সাম্প্রতিক কর্মসূচিকে ঘিরে যন্তর মন্তর ও মধ্য দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক পুলিশি মোতায়েন ও বহু বিক্ষোভকারীকে আটকের ঘটনা ঘটেছে।

সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছে সিজেপি। সোমবার সংগঠনের সহ-আহ্বায়ক সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্তার উদ্দেশে চিঠি দিয়ে যন্তর মন্তরেই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জন্য দিন ও সময় বরাদ্দের আবেদন জানিয়েছেন। তাঁদের এই পদক্ষেপ বুঝিয়ে দিচ্ছে, বিকল্প মাঠ ঘোষণার পরেও পুরনো প্রতিবাদস্থলে জমায়েতের দাবি থেকে সংগঠনটি সরে আসছে না।

যন্তর মন্তরের গুরুত্ব তার অবস্থানেও। সংসদ এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি এই জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ নিজেদের দাবিদাওয়া জানাতে এসেছেন। ধর্না, অনশন ও প্রতিবাদসভা মিলিয়ে এলাকাটি নাগরিক ক্ষোভ প্রকাশের অন্যতম পরিচিত মঞ্চ হয়ে উঠেছিল। ফলে জায়গাটির স্বীকৃতি প্রত্যাহারের তাৎপর্য কেবল একটি জমায়েত অন্যত্র সরানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।

তবে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে যন্তর মন্তরকে বাদ দেওয়া এবং গোটা দিল্লিতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিষিদ্ধ করা এক বিষয় নয়। ঘোষিত সিদ্ধান্তটি প্রতিবাদের জন্য অনুমোদিত স্থান পরিবর্তনের। নতুন তিনটি মাঠে কর্মসূচির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অনুমতি ও পুলিশি বিধি মানতে হবে। তাই শুধু ‘প্রতিবাদ বেআইনি’ বললে নির্দেশটির প্রকৃত পরিধি সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

নতুন তিনটি জায়গায় কর্মসূচি আয়োজনের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের যাতায়াতের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের পক্ষে সেখানে পৌঁছনো কতটা সহজ, প্রয়োজনীয় পরিষেবা কোথায় মিলবে এবং নিজেদের বক্তব্য বৃহত্তর জনপরিসরে পৌঁছে দেওয়া কতটা সম্ভব হবে, সেগুলিও বিবেচ্য। ফলে বিকল্প স্থানের কার্যকারিতা বিচার করতে পরিকাঠামোর পাশাপাশি প্রতিবাদকারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতাও আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

এখন নজর থাকবে নতুন এসওপির দিকে। অনুমতির আবেদন কীভাবে করতে হবে, জমায়েতের সময় ও পরিসর কী হবে এবং আন্দোলনকারীরা কী কী সুবিধা পাবেন, সেই নিয়ম স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। প্রতিবাদের নতুন ঠিকানা ঘোষিত হলেও সেখানে নাগরিকদের দাবি প্রকাশের বাস্তব সুযোগ কতটা থাকবে, তা বোঝা যাবে পরবর্তী নির্দেশ ও তার প্রয়োগে।