বাংলাস্ফিয়ার: খাদ্যপণ্য, জ্বালানি এবং মূল্যবান ধাতুর দাম বৃদ্ধির জেরে সেপ্টেম্বরে দেশের খুচরো মূল্যবৃদ্ধি পৌঁছল ২৩ মাসের সর্বোচ্চ স্তরে। সোমবার, ১২ অক্টোবর প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে উপভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআই-ভিত্তিক মূল্যবৃদ্ধির হার হয়েছে ৫.৫৪ শতাংশ। অগস্টে সংশোধিত হার ছিল ৪.৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে বার্ষিক মূল্যবৃদ্ধির হার বেড়েছে ০.৭১ শতাংশ পয়েন্ট। ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর এই হারই সর্বোচ্চ।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে খাবারের দাম। সেপ্টেম্বরে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার বেড়ে হয়েছে ৭.৭৪ শতাংশ, যা অগস্টে ছিল ৫.৯৭ শতাংশ। সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় খাবারের দাম অনেক দ্রুত বাড়ায় দৈনন্দিন বাজার খরচে চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের আয়ের বড় অংশ খাবার কিনতেই ব্যয় হয়, তাদের পক্ষে অন্য প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উৎসবের মরসুমে এই পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের সংসারের বাজেট নিয়ে উদ্বেগ বাড়াল।
খাদ্যের মধ্যে পেঁয়াজ, আদা এবং রসুনের দাম বৃদ্ধির প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে সরকারি তথ্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, সেপ্টেম্বরে পেঁয়াজের দাম এক বছর আগের তুলনায় বেড়েছে ১০৮.০৯ শতাংশ। আদার ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ৬২.৮৫ শতাংশ এবং রসুনে ৫৪.৬২ শতাংশ। চাল, চিনি ও কিছু ভোজ্যতেলের দামও চাপ বাড়িয়েছে। তবে সব খাবারের দাম একইভাবে বাড়েনি; আলু ও টম্যাটোর মতো কয়েকটি পণ্যের দাম কমেছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিও সামগ্রিক সূচককে উপরে তুলেছে। এর প্রভাব শুধু পরিবারের সরাসরি জ্বালানি খরচে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহণ এবং পণ্য উৎপাদনের খরচ বাড়লে তার কিছুটা শেষ পর্যন্ত ক্রেতার ওপর আসতে পারে। ফলে খাবারের বাজারে ইতিমধ্যেই যে চাপ তৈরি হয়েছে, জ্বালানি সেই চাপ আরও ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অস্থিরতা এই কারণেই ভারতের মূল্যবৃদ্ধির পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পাশাপাশি সোনা ও রুপোর মতো মূল্যবান ধাতুর দামও খুচরো মূল্যসূচক বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে গয়নার দাম বাড়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের দাম বাড়ার প্রভাব এক নয়। সাধারণ সংসারের তাৎক্ষণিক ব্যয়ের চাপ বুঝতে খাদ্য ও জ্বালানির গতিপ্রকৃতি আলাদাভাবে দেখা প্রয়োজন। সামগ্রিক সূচক বিভিন্ন পণ্য ও পরিষেবার দামের পরিবর্তনকে একত্র করে একটি গড় চিত্র তুলে ধরে।
গ্রাম ও শহরের হিসাবেও ফারাক রয়েছে। সেপ্টেম্বরে গ্রামীণ এলাকায় খুচরো মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ৬.০৮ শতাংশ, শহরে ৪.৮৮ শতাংশ। অর্থাৎ, সর্বভারতীয় গড়ের তুলনায় গ্রামে মূল্যবৃদ্ধির চাপ বেশি। এই ব্যবধান মনে করিয়ে দেয়, জাতীয় স্তরে একটি মাত্র হার দিয়ে সব পরিবারের অভিজ্ঞতা বোঝা যায় না। কোথায় বসবাস, কী কেনা হচ্ছে এবং আয়ের কতটা বাজারে খরচ হচ্ছে, তার ওপর বাস্তব চাপ নির্ভর করে।
নতুন পরিসংখ্যান রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সামনেও চ্যালেঞ্জ বাড়িয়েছে। মূল্যবৃদ্ধি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের ৪ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার উপরে এবং ৬ শতাংশ ঊর্ধ্বসীমার কাছাকাছি রয়েছে। এর মধ্যেই ৭ অক্টোবর রেপো রেট ০.২৫ শতাংশ পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫.৫ শতাংশ করেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। চলতি অর্থবর্ষে মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাসও ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫.২ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে ঋণ সস্তা হওয়ার প্রত্যাশা আরও দুর্বল হতে পারে।
এই হিসাব বোঝার ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি: সেপ্টেম্বরে মূল্যবৃদ্ধি ৫.৫৪ শতাংশ মানে অগস্টের তুলনায় সব জিনিসের দাম ততটা বেড়েছে, এমন নয়। এটি গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় গড় দামের পরিবর্তন। সামনের মাসগুলিতে খাদ্যের সরবরাহ, ফসলের পরিস্থিতি এবং জ্বালানির দাম কোন দিকে যায়, তার ওপর স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা নির্ভর করবে। আপাতত পরিসংখ্যানের বার্তা স্পষ্ট—নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ছে, আর সেই চাপ সামলাতে পরিবারের অন্য খরচ ও সঞ্চয়ের জায়গা ছোট হওয়ার আশঙ্কা থাকছে। আয় একই গতিতে না বাড়লে এই পরিস্থিতিতে ক্রয়ক্ষমতা কমবে, বিশেষত নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের