বাংলাস্ফিয়ার: ডলারের তুলনায় টাকার দাম ক্রমাগত দুর্বল হতে থাকায় বিদেশি মুদ্রার বাজারে একগুচ্ছ কড়া ব্যবস্থা নিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। শনিবার, ১০ অক্টোবর ঘোষিত পদক্ষেপগুলির লক্ষ্য, ফাটকা লেনদেন কমানো এবং ডলারের চাহিদার চাপ সামলানো। শুক্রবার প্রতি মার্কিন ডলারের দাম দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৯৬.৭৩ টাকা। চলতি বছরে ভারতীয় মুদ্রার দর সাত শতাংশের বেশি কমেছে। এর আগে ৭ অক্টোবর রেপো রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫.৫০ শতাংশ করেছিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। কিন্তু তারপরেও টাকার বিনিময় হারে স্থায়ী স্বস্তি ফেরেনি।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে বিদেশি মুদ্রার ডেরিভেটিভ লেনদেনে। ভবিষ্যতে বিনিময় হার বদলানোর ঝুঁকি সামলাতে এই ধরনের চুক্তি করা হয়। প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রার দায় বা ঝুঁকির প্রমাণ প্রতিষ্ঠা না করে লেনদেনের সীমা ১০ কোটি ডলার থেকে কমিয়ে ৫০ লক্ষ ডলার করা হয়েছে। অর্থাৎ সীমা কমেছে ৯৫ শতাংশ। স্বীকৃত শেয়ার বাজারগুলিতে টাকা সম্পর্কিত মুদ্রা ডেরিভেটিভের ক্ষেত্রেও সম্মিলিতভাবে এই সীমা প্রযোজ্য। তবে ৫০ লক্ষ ডলারের বেশি সমস্ত লেনদেন নিষিদ্ধ হয়নি।
বাতিল করা চুক্তি ফের করার সুযোগও বন্ধ হচ্ছে। নির্দেশ জারির পরে কোনও অনুমোদিত ডিলারের কাছে টাকা সম্পর্কিত বিদেশি মুদ্রার ডেরিভেটিভ চুক্তি বাতিল করলে সেটি অন্য ডিলারের কাছেও পুনরায় করা যাবে না। তবে চালু নিয়ম মেনে মেয়াদ শেষে চুক্তি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে।
একই আর্থিক ঝুঁকির বিপরীতে একাধিক ব্যাঙ্কে সুরক্ষামূলক চুক্তি করার প্রবণতা আটকাতেও নজরদারি বাড়ছে। গ্রাহককে লিখিত অঙ্গীকার দিতে হবে যে, সংশ্লিষ্ট দায়ের জন্য অন্য অনুমোদিত ডিলারের কাছে একই সুরক্ষা নেওয়া হয়নি। ব্যাঙ্ককে সেই ঘোষণা সংগ্রহ করে রাখতে হবে। ফলে গ্রাহকের দাবির সত্যতা যাচাই এবং নথি সংরক্ষণের গুরুত্ব বাড়ছে।
আরেকটি বড় পদক্ষেপ ‘ফরেন এক্সচেঞ্জ রিস্ক রিজার্ভ’। চলতি হিসাবের দায়ের ঝুঁকি সামলাতে টাকার বিনিময়ে বিদেশি মুদ্রা কেনার নির্দিষ্ট ডেরিভেটিভ চুক্তিতে এই ব্যবস্থা প্রযোজ্য। চুক্তির নির্ধারিত মূল অঙ্ক ২০ লক্ষ ডলারের বেশি হলে, তার টাকায় সমমূল্যের ২০ শতাংশ নগদ রিজার্ভ ব্যাঙ্কে রাখতে হবে অনুমোদিত ডিলারকে। এটি গ্রাহকের উপর সরাসরি ২০ শতাংশ কর বা ফি নয়। তবে ব্যাঙ্কের অর্থ আটকে থাকায় এমন চুক্তির খরচ বাড়তে পারে। এর ফলে প্রকৃত প্রয়োজনের অতিরিক্ত মুদ্রা সুরক্ষার চুক্তি করা ব্যবসায়িক সংস্থাগুলির কাছে আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
পাশাপাশি ইন্ডিয়ান অয়েল, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম এবং ভারত পেট্রোলিয়ামের দৈনিক ডলারের চাহিদা মেটাতে বিশেষ ব্যবস্থা চালু হচ্ছে সোমবার, ১২ অক্টোবর থেকে। রাষ্ট্রায়ত্ত এই তেল সংস্থাগুলিকে ডলার জোগাবে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। তেল আমদানিকারীরা বিদেশি মুদ্রার বড় ক্রেতা। তাদের চাহিদা সাধারণ বাজার থেকে সরিয়ে নিলে সেখানে চাপ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই চাপের একটি অংশ গিয়ে পড়বে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে।
ইতিমধ্যেই সঞ্চিত বিদেশি মুদ্রা কমেছে। ২ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে ভাণ্ডার ১,২৯৫ কোটি ডলার কমে দাঁড়িয়েছে ৭৩,৪৬০ কোটি ডলারে। ফলে বাজার সামলানোর পাশাপাশি সঞ্চয়ের গতিপ্রকৃতিও এখন নজরে রাখতে হবে।
টাকার দুর্বলতার পিছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির বড় ভূমিকা রয়েছে। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ এবং জ্বালানির চড়া দাম ভারতের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির উপর চাপ বাড়িয়েছে। সুদ বাড়ানো এবং বাজারে ডলার বিক্রি করেও সেই চাপ পুরোপুরি কাটানো যায়নি। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক এবার মুদ্রা বাজারে বড় অঙ্কের অবস্থান নেওয়ার খরচ ও শর্ত—দুইই কঠোর করছে। অপরিশোধিত তেলের প্রয়োজনের নব্বই শতাংশেরও বেশি আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয় বলে ভারতের উপর এই ধাক্কা বিশেষভাবে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ব্যবস্থা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক তেলের দাম, মার্কিন বন্ডের সুদ এবং বিদেশি মূলধনের প্রবাহ প্রতিকূল থাকলে টাকার উপর চাপ বজায় থাকবে। সোমবার বাজার খোলার পর বোঝা যাবে, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হচ্ছে।