বাংলাস্ফিয়ার: প্রতিবাদকারীদের আটকের পরে তাঁদের সঙ্গে পুলিশের আচরণ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে রাজধানীতে। গত ১০, ১১ ও ১২ অক্টোবর হাজার হাজার মানুষকে আটক করার ঘটনাপ্রবাহে সাংবাদিক, ছাত্র ও যুব সংগঠনের সদস্য এবং নাবালকেরাও রয়েছেন। আটক ব্যক্তিদের একাংশের অভিযোগ, তাঁদের মারধর করা হয়েছে, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন ঘিরে প্রতিবাদ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের মধ্যেই এসব অভিযোগ সামনে এসেছে।
আইনজীবী অর্জুন উন্নিকৃষ্ণনের অভিযোগ, ১১ অক্টোবর আটক ব্যক্তিদের নির্জন রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে বসিয়ে পুলিশ খুঁজছিল কারা বিক্ষোভের ছবি বা ভিডিও তুলেছেন। মোবাইলের পাসওয়ার্ড দিতে অস্বীকার করলে মারধর করা হয় বলে তাঁর দাবি। তিনি নাবালকদেরও আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। অন্য আটক ব্যক্তিরা দাবি করেছেন, তাঁদের ফোন থেকে ছবি ও ভিডিও মুছে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগগুলি এখনও স্বাধীন তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
মধ্য দিল্লি থেকে কয়েকজনকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে পাণ্ডওয়ালান খুর্দের একটি কমিউনিটি সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে খাবার, জল, চিকিৎসা এবং আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। তাঁদের কাছে পৌঁছতে যাওয়া আইনজীবীদেরও প্রথমে বাধা দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতাতেও উঠে এসেছে আটক করার কারণ এবং গন্তব্য সম্পর্কে অন্ধকারে রাখার অভিযোগ। সাংবাদিক অগ্নিভ রায় নিজের বিবরণে জানিয়েছেন, ১০ অক্টোবর সকাল প্রায় ১১টা ২০ মিনিটে কনট প্লেসে খবর সংগ্রহের সময় তাঁকে আটক করা হয়। পরিচয়পত্র দেখিয়েও রেহাই মেলেনি। কোন আইনি প্রক্রিয়ায় আটক করা হচ্ছে, কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে—বারবার জানতে চাইলেও উত্তর পাননি বলে তাঁর দাবি।
রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, প্রায় দুই ঘণ্টার যাত্রায় গরমের মধ্যে পর্যাপ্ত পানীয় জল দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত এক ট্রাকচালকের কাছ থেকে বাসের জানালা দিয়ে জল পান তাঁরা। তবে বাসে কলা, বিস্কুট ও কচুরির মতো খাবার ছিল বলেও তিনি জানিয়েছেন। তাঁদের বাওয়ানার রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আরও আটক ব্যক্তিকে রাখা হয়েছিল। বারবার আলোচনার পরে বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ আরেক সাংবাদিকের সঙ্গে তিনি ছাড়া পান।
একটি সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, তাদের তিন সাংবাদিক ও এক শিক্ষানবিশকে ১০ অক্টোবর খবর সংগ্রহের সময় আটক করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যবহৃত তিনটি ফোনও পুলিশ নিয়ে নেয় বলে অভিযোগ। সাংবাদিকদের পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। একই প্রতিবেদনে স্ক্রলের সাংবাদিক আয়ুষ তিওয়ারিকেও দৃশ্যমান পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও আটকের কথা জানানো হয়েছে। সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস আটক সংবাদকর্মীদের মুক্তি, সরঞ্জাম ফেরত এবং শারীরিক নিগ্রহের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে অভিযোগ করেছেন, আটকের সময়ে আত্মীয় ও আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েও অনুমতি পাননি। সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তিনি তাঁর আটকের সম্পূর্ণ, অসম্পাদিত ভিডিও প্রকাশের দাবি তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রচারিত খণ্ডিত দৃশ্য দিয়ে সেই সময়কার সম্পূর্ণ পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়।
পুলিশের বক্তব্য হিসেবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটক করার সময়ে কিছু প্রতিবাদকারী সহযোগিতা না করায় তাঁদের সরাতে বলপ্রয়োগ প্রয়োজন হয়েছিল। তবে হেফাজতে মারধর, ফোনের তথ্য মুছে দেওয়া কিংবা চিকিৎসা ও আইনি যোগাযোগে বাধার প্রতিটি অভিযোগের বিস্তারিত জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে এখন আটকের পরের আচরণ। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, চিকিৎসার নথি, উপস্থিত ব্যক্তিদের সাক্ষ্য এবং উপলব্ধ ভিডিও পরীক্ষা করেই ঘটনাগুলির সত্যতা নির্ধারণ প্রয়োজন। হেফাজতের ভিতরে কী ঘটেছে, তা স্পষ্ট করতে পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান জরুরি; সেখানেই পুলিশের জবাবদিহি ও নাগরিকের সুরক্ষার প্রশ্নটি জড়িয়ে রয়েছে।