বাংলাস্ফিয়ার: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর, ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কা এবং নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দিল্লির রাস্তায় সমবেত হয়েছেন ছাত্রছাত্রী, সমাজকর্মী, আইনজীবী ও সচেতন নাগরিকেরা। তাঁদের উদ্বেগ, মানুষ গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক অধিকার—ভোট দেওয়ার অধিকার—থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। ভোটার তালিকা থেকে যাঁর নাম বাদ পড়ে, তাঁর কাছে বিষয়টি নিছক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়। প্রশ্নটি হল, কারা তাঁকে শাসন করবেন, সেই সিদ্ধান্তে তাঁর কোনও মত থাকবে কি না। সমান মর্যাদার নাগরিক হিসেবে তাঁকে গণ্য করা হবে কি না। রাজনৈতিক সাম্যের যে প্রতিশ্রুতি গণতন্ত্র দেয়, তা রক্ষিত হবে কি না।

আন্দোলনকারীরা মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের জবাবদিহি দাবি করেছেন, কারণ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি প্রতিষ্ঠানকে মানুষের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হয়। তাঁদের প্রতিবাদ গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে নয়; গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্যই। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি কি জনশান্তি বিঘ্নিত করতে পারে? সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করা কি জনশৃঙ্খলার পক্ষে বিপজ্জনক? গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা কি শান্তি বজায় রাখার পরিপন্থী?

এর পাশাপাশি রয়েছে রাস্তায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি। তাঁদের বারবার বাধা দেওয়া হয়েছে, টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, আটক করা হয়েছে এবং প্রতিবাদস্থলে পৌঁছতে দেওয়া হয়নি। এই নিবন্ধের লেখকের অভিযোগ, পুলিশকর্মীরা তাঁকে শারীরিকভাবে হেনস্থা করেছেন। শরীরে তার ফলে তৈরি হওয়া আঁচড় ও কালশিটের দাগও তিনি দেখিয়েছেন। অন্য মহিলা প্রতিবাদকারী ও সাংবাদিকেরাও পুলিশের অসদাচরণের অভিযোগ তুলেছেন। ১৬ অক্টোবর মাণ্ডি হাউসে লেখককে আটক করা হয় এবং সারা রাত পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়। এত কিছুর পর তাঁকেই এমন একটি নোটিস দেওয়া হয়েছে, যেখানে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে তিনি শান্তিভঙ্গ করতে পারেন।

জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, এসআইআর প্রত্যাহার এবং নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগসংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইন বাতিলের দাবিতে তাঁর স্লোগান কি শান্তিভঙ্গের কারণ হতে পারে? নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় তিনি টানা ২৩ দিন অনশন করেছিলেন। ন্যায়বিচারের দাবি শোনা হবে, এই আশায় নিজেই অনাহারের কষ্ট সহ্য করার পথ বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি কখনও শান্তি বিঘ্নিত করতে চাননি। অন্যায়ের সামনে নীরব থাকাই শান্তি বজায় রাখার শর্ত—শুধু এই ধারণা মেনে নিতে অস্বীকার করেছেন।

নোটিসে যে কারণগুলি উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে, সেগুলি প্রতিবাদ, স্লোগান ও জমায়েতসংক্রান্ত; তাঁর কোনও হিংসাত্মক কাজের বিবরণ নয়। অন্যদিকে, ছবি, ভিডিয়ো এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিবরণে লেখক-সহ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ঘটনা নথিবদ্ধ রয়েছে।

তাঁকেই প্রমাণ করতে বলা হচ্ছে যে তিনি শান্তি বজায় রাখবেন। অথচ জনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যাঁদের হাতে, তাঁদের কাছ থেকে আন্দোলনকারীরা যে হিংসার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ, তার জন্য একইভাবে জবাবদিহি চাওয়া হচ্ছে না। তা হলে শান্তি বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? রাস্তায় মানুষের অনুপস্থিতিই কি শান্তি? প্রতিবাদকারীদের ছত্রভঙ্গ করে, আটক করে কিংবা ভয় দেখিয়ে ঘরে থাকতে বাধ্য করার পরে যে নীরবতা নেমে আসে, সেটিই কি শান্তি? অন্যায়ের শিকার মানুষকে সেই অন্যায়ের কথা বলতে না দিলেই কি কোনও সমাজকে শান্তিপূর্ণ বলা যায়?

শান্তির একটি অস্বস্তিকর ধারণার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় ইতিহাস। রোমান সাম্রাজ্য ‘প্যাক্স রোমানা’ বা ‘রোমান শান্তি’ উদ্‌যাপন করত। এর সঙ্গে স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলার সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সেই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা হয়েছিল দাসপ্রথা, ভূখণ্ড দখল, সামরিক আধিপত্য এবং প্রতিরোধ দমনের মাধ্যমেও। শাসকেরা যে শান্তি উদ্‌যাপন করতেন, তাঁদের ক্ষমতার অধীন মানুষও যে তাকে শান্তি হিসেবে অনুভব করতেন, তা নয়।

তা হলে কি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না করেও শৃঙ্খলা চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব? যে যন্ত্রণা থেকে প্রতিরোধের জন্ম, তার প্রতিকার না করেই কি প্রতিরোধকে স্তব্ধ করে দেওয়া যায়? যে অসাম্য ও হিংসার উপরে কোনও শান্তিব্যবস্থা দাঁড়িয়ে, সেগুলিকে অক্ষত রেখেই কি শান্তি ঘোষণা করা যায়? একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে শান্তির অর্থ নিশ্চয়ই এমন হতে পারে না।

মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র তাঁর স্ট্রাইড টুওয়ার্ড ফ্রিডম (১৯৫৮) বইয়ে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, “প্রকৃত শান্তি নিছক উত্তেজনার অনুপস্থিতি নয়; তা ন্যায়বিচারের উপস্থিতি।” পরে লেটার ফ্রম বার্মিংহাম জেল (১৯৬৩)-এ তিনি নেতিবাচক ও ইতিবাচক শান্তির মধ্যে পার্থক্য করেছেন। প্রথমটির অর্থ উত্তেজনার অনুপস্থিতি; দ্বিতীয়টির ভিত্তি ন্যায়বিচার।

প্রতিবাদ উত্তেজনা সৃষ্টি করে। মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলে। ক্ষমতাসীনদের এমন সব প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেগুলির উত্তর তাঁরা এড়িয়ে যেতে চান। কিন্তু অন্যায়কে প্রশ্ন করার ফলে যে অস্বস্তি তৈরি হয়, তাকে সেই অন্যায়ের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না।

এই প্রসঙ্গে লেখক স্মরণ করেছেন রামধারী সিংহ দিনকরের রশ্মিরথী কাব্যকে। সেখানে কৃষ্ণ হস্তিনাপুরে যান সংঘাত উসকে দিতে নয়, এমন একটি ন্যায়সংগত মীমাংসার সন্ধানে, যা যুদ্ধ ঠেকাতে পারে। ন্যায্য ভাগ পাওয়া অসম্ভব বলে মনে হওয়ার পরেও তিনি পাঁচটি গ্রাম দেওয়ার আবেদন জানান। ন্যায়বিচারের দাবি সেখানে শান্তি রক্ষারই চেষ্টা। সেই ন্যূনতম দাবিটুকুও স্বীকার করতে অস্বীকার করাই শান্তিপূর্ণ সমাধানকে অসম্ভব করে তোলে। কুরুক্ষেত্র কাব্যে দিনকর লিখেছেন, “শান্তি নহীঁ তব তক, যব তক, সুখ-ভাগ ন নর কা সম হো।” অর্থাৎ, সুখ ও সমৃদ্ধিতে প্রতিটি মানুষের সমান ভাগ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শান্তি আসতে পারে না।

ক্ষমতাবানেরা ঘোষণা করলেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। মানুষকে নিজের জীবনে সেই শান্তি অনুভব করতে হয়—সাম্যের নিশ্চয়তায়, প্রতিষ্ঠানগুলির নিরপেক্ষতায়, নিজের কথা শোনানোর মর্যাদায় এবং এই বিশ্বাসে যে কঠিন প্রশ্ন তোলার জন্য তাঁর অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে না।

ভারতীয় সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদ বাক্‌ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। ১৯(১)(খ) অনুচ্ছেদ দিয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হওয়ার অধিকার। জনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজন-সহ নির্দিষ্ট কিছু কারণে এই অধিকারগুলির উপরে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপ করা যায়। কিন্তু সেই বিধিনিষেধের অজুহাতে নাগরিকদের নিয়মিত তাঁদের স্বাধীনতা প্রয়োগে বাধা দেওয়া যায় না। বৃন্দা গ্রোভারের মতো বহু আইনজীবী যে কথা বলেছেন, তা হল, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সীমিত করার জন্য পুলিশের নির্দেশ ও পদক্ষেপকে আইনানুগতা, যুক্তিসংগততা, বৈধতা এবং আনুপাতিকতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। কোনও নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে বলেই সাংবিধানিক স্বাধীনতার উপরে আরোপিত বিধিনিষেধ ন্যায়সংগত হয়ে যায় না।

হিংসা প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্বের মধ্যে নাগরিকদের পুলিশের মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ থেকে রক্ষা করা এবং তাঁরা যাতে নিরাপদে সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করাও পড়ে।

সুতরাং, লেখকের এই নোটিসকে চ্যালেঞ্জ করা নিছক ১০ হাজার টাকার মুচলেকার বিষয় নয়। প্রশ্ন হল, ক্ষতির বিশ্বাসযোগ্য আশঙ্কার প্রমাণ ছাড়াই প্রতিরোধমূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করে গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চাকারী মানুষকে জনশান্তির পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরা যায় কি না। প্রশ্ন আরও হল, ক্ষমতার প্রয়োগের চেয়ে ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করাকেই বেশি বিপজ্জনক বলে গণ্য করা হলে তার পরিণতি কী হয়।

গণতন্ত্র মতভেদহীন সমাজের প্রতিশ্রুতি দেয় না। তার প্রতিশ্রুতি হল, পরস্পরের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সাম্য অস্বীকার না করেও মতভেদ নিয়ে একসঙ্গে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা। রাস্তায় কখনও কখনও স্লোগান উঠবে। প্রতিষ্ঠানগুলিকে প্রশ্ন করা হবে। সরকারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা সমালোচিত হবেন। এগুলি গণতন্ত্রের ব্যর্থতার লক্ষণ নয়। বরং এগুলি দেখায়, মানুষ এখনও বিশ্বাস করেন যে তাঁদের কণ্ঠস্বরের মূল্য রয়েছে এবং সম্মিলিত উদ্যোগে পরিবর্তন আনা সম্ভব।

মানুষ এখনও প্রতিবাদ করছেন—উদ্বেগের কারণ সেটি নয়। উদ্বেগের কারণ হল, মানুষ যখন প্রতিবাদ করতে ভয় পেতে শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে দেশের কল্পনা করেছিলেন—“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির”—লেখক তেমন একটি দেশেই বাস করতে চান। এমন এক দেশ, যেখানে নাগরিকেরা নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারেন। যেখানে তরুণেরা মারধর বা আটকের শিকার না হয়ে সংবিধান রক্ষার জন্য সমবেত হতে পারেন। যেখানে পুলিশ নাগরিকদের রক্ষা করে, তাঁদেরও, যাঁরা সরকারের সঙ্গে একমত নন। যেখানে শান্তি বজায় রাখার অর্থ নীরবতা বজায় রাখা নয়।

আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নেমেছেন, কারণ তাঁদের বিশ্বাস, গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য লড়াই করা প্রয়োজন। তাঁরা প্রশ্ন করে যাবেন, কারণ প্রশ্ন করার অধিকার এবং সম্মিলিত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার অধিকার পরস্পরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতন্ত্রের শান্তিকে বিপন্ন করে না। সকলের জীবনে সেই শান্তিকে অর্থবহ করে তোলার সংগ্রামে প্রতিবাদ অন্যতম পথ।