বাংলাস্ফিয়ার: গত কয়েক দিনে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় দুর্গাপুজোর মণ্ডপে বাম দলগুলির বইয়ের স্টলে হামলা হয়েছে। শুধু কলকাতায় নয়, জেলাগুলিতেও আক্রান্ত হয়েছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) বা সিপিআই(এম), ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিআই এবং সোশ্যালিস্ট ইউনিটি সেন্টার অব ইন্ডিয়া (কমিউনিস্ট) বা এসইউসিআই(সি)-র পরিচালিত স্টল। বেশ কয়েকটি জায়গায় অস্থায়ী বইয়ের স্টল তৈরির অনুমতিও দেয়নি পুলিশ।

১৭ অক্টোবর রাতে যাদবপুর এলাকায় একটি অস্থায়ী বইয়ের স্টল বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে পুর কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ। স্টলটি ঘিরে মানববন্ধন গড়ে তোলেন বাম দলগুলির সমর্থকেরা। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি বা এপিডিআর-সহ অরাজনৈতিক সংগঠনগুলির অস্থায়ী বইয়ের স্টলেও হামলা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে বইয়ের স্টল দেওয়ার রীতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সিপিআই(এম) এবং অন্য বাম দলগুলি দুর্গাপুজোর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয় না। তাদের কাছে এই স্টলগুলি নিছক রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যম নয়; রাজ্যের অন্যতম বৃহৎ জনউৎসবের সময়ে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলারও একটি উপায়।

দুর্গাপুজোর প্রায় এক মাস আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পুজো উদ্যোক্তাদের কাছে আবেদন জানান, তাঁরা যেন মণ্ডপে বাম দলগুলিকে বইয়ের স্টল করতে না দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, যে দলগুলি দুর্গাপুজোর ধর্মীয় তাৎপর্যের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত না করে তাকে ‘শারদোৎসব’ বলে উল্লেখ করে, তাদের মণ্ডপে স্টল বসানোর অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।

২০ অক্টোবর, উৎসব শেষ হয়ে আসার সময়ে, দুর্গাপুজোয় বাম দলগুলির বইয়ের স্টল দেওয়ার বিরোধিতায় আবার সরব হন শুভেন্দু। তিনি বলেন, বাম দলগুলি বই বিক্রি করতে চাইলে রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাদের দলীয় কার্যালয়গুলি থেকেই তা করতে পারে। দুর্গাপুজো বা অন্য উৎসবকে সমর্থন করে না যে দলগুলি, তাদের পুজোমণ্ডপে স্টল বসাতে দেওয়া উচিত নয় বলেও ফের যুক্তি দেন তিনি।

২০ অক্টোবর শুভেন্দু বলেন, “যাঁরা দুর্গাপুজো বা অন্য কোনও পুজোয় বিশ্বাস করেন না, তাঁদের দুর্গাপুজোর সময়ে বই বিক্রি করতে না দেওয়াই ভাল। বইগুলি নিজেদের পার্টি অফিসে রাখুন, লাইব্রেরি তৈরি করুন এবং সেখান থেকে বই বিক্রি করুন। রাজ্যে প্রাসাদের মতো চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার পার্টি অফিস রয়েছে, আর সবগুলিই খোলা।”

মুখ্যমন্ত্রী যখন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে বাম দলগুলির বইয়ের স্টলের বিরোধিতা করে চলেছেন, তখন তাঁর মন্ত্রিসভার সহকর্মী স্বপন দাশগুপ্ত, রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রবীণ নেতা জিষ্ণু বসু হামলার বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন।

অর্থ দফতরের দায়িত্বে থাকা স্বপন দাশগুপ্ত জানান, বইয়ের স্টলে হামলা তিনি সমর্থন করতে পারেন না। তাঁর কথায়, “আমি ৩০-৪০ বছর ধরে এই ধরনের স্টল দেখে আসছি। খুব যে মানুষের নজর কাড়ে, তা নয়। তবু ওঁরা স্টল দেন। কিন্তু বইয়ের স্টলকে ঘিরে এই গুন্ডামি আমি কোনও ভাবেই সমর্থন করি না।”

শমীক ভট্টাচার্য বলেন, দলের কোনও কর্মী বইয়ের স্টল ভাঙচুরে জড়িত থাকতে পারেন না; কেউ জড়িত বলে প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জিষ্ণু বসু বলেন, বইয়ের স্টলে হামলা করার মধ্যে কোনও বীরত্ব নেই এবং যাঁরা এই কাজ করছেন, তাঁরা নিজেদের হিন্দু বলে দাবি করতে পারেন না।

বিজেপি ও আরএসএস নেতৃত্বের একাংশের এই আপত্তি সত্ত্বেও হামলা চলতে থাকে। প্রশাসনও তা রুখতে ব্যর্থ হয়। বিজেপি নেতৃত্বের মধ্যে এমন ভিন্ন সুর অবশ্য এই প্রথম নয়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার পরেও দল ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের বক্তব্যে মতপার্থক্য প্রকাশ পেয়েছিল।

বনগাঁয় একটি অস্থায়ী বইয়ের স্টল তৈরির অনুমতি পুলিশ না দেওয়ায় কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয় সিপিআই(এম)।

১৫ অক্টোবর হাই কোর্টের একক বেঞ্চ রাজ্য সরকারকে ওই স্টলের অনুমতি দেওয়ার নির্দেশ দেয়। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য তাঁর নির্দেশে পর্যবেক্ষণ করেন, গণতন্ত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক চিন্তা ও মতাদর্শের প্রসার স্বাগত। এর ফলে গণতন্ত্র আরও ফলপ্রসূ হয়, তার শিকড় আরও গভীরে পৌঁছয় এবং তা আরও পরিণত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী মানুষ যাতে দ্বিধাহীন ভাবে নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারেন, শাসকপক্ষকে তেমন পরিবেশ তৈরি করার আহ্বান জানান তিনি।

কিন্তু রাজ্য সরকার ওই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চে যায়। ১৬ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র বিঠলরাও ঘুগে এবং বিচারপতি শব্বর রশিদির বেঞ্চ একক বেঞ্চের নির্দেশে স্থগিতাদেশ দেয়।

২০ অক্টোবর যাদবপুরে নিজেদের বইয়ের স্টলে পুলিশি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে হাই কোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চের দ্বারস্থ হয় সিপিআই(এম)। আদালত আবেদনটি খারিজ করে জানায়, বনগাঁর বইয়ের স্টল সংক্রান্ত মামলায় বিষয়টি ইতিমধ্যেই বিবেচিত হয়েছে।

বাম দলগুলির বইয়ের স্টলকে নিশানা করার ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের মে মাসে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বেরই অংশ। নির্বাচনী জয় এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ায় উজ্জীবিত বিজেপি এখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বামেদের দিকে নজর ঘুরিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।

অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) সমর্থকদের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া ও শিক্ষকদের উদ্দেশে বিজেপি নেতাদের মন্তব্য এবং সম্প্রতি সিপিআই(এম)-এর প্রাক্তন সাংসদ তথা প্রবীণ আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের উপর হামলা—এই ঘটনাগুলি রাজ্যে বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থীদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বক্তব্য, বই আসলে অজুহাতমাত্র; শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত কর্মকাণ্ডের উপর দমন-পীড়ন চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে শাসকদল।

হামলার প্রতিবাদ বামফ্রন্টের গণ্ডি ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। জোটের বাইরের নেতারাও বইয়ের স্টলকে নিশানা করার বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। ফলে এই বিতর্ক পশ্চিমবঙ্গের বাম দলগুলি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার প্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।