বাংলাস্ফিয়ার: বিজেপি সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দুর্গাপুজোয় স্পষ্ট রাজনৈতিক পালাবদলের ছাপ। বদলেছে পুজো কমিটির নেতৃত্ব ও মণ্ডপের ভাবনা; বেড়েছে ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলার উপর জোর। খাবার ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক থেকে সর্বজনীন পরিসরে বিধিনিষেধ—উৎসবের নানা দিক ঘুরে দেখে এই লেখায় বোঝানো হয়েছে কীভাবে নতুন শাসনব্যবস্থা রাজ্যের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরকে নতুন চেহারা দিচ্ছে।

কয়েক দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজো বদলেছে, তার ব্যাপ্তি বেড়েছে। রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্য দিয়েও অটুট থেকেছে তার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব। এ বছর ১০ অক্টোবর মহালয়া উপলক্ষে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্স ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দেবী দুর্গাকে স্বাগত জানাতে প্রথম বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল রাজ্যের সদ্য নির্বাচিত ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার। দেবীপক্ষের প্রথম দিন মহালয়া থেকেই শুরু হয় দুর্গাপুজোর দিন গোনা। বিজেপির এই অনুষ্ঠানে একই সঙ্গে ধরা পড়েছিল পরিবর্তন ও ধারাবাহিকতার ছবি।

মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রেড রোড থেকে ইডেন গার্ডেন্স পর্যন্ত দু’কিলোমিটার পথ হাঁটেন। উজ্জ্বল লাল ও ক্রিম রঙের আলোয় সাজানো হয়েছিল সেই পথ। রাজ্যের বিভিন্ন জেলার শিল্পধারার উপস্থাপনায় সাজানো অনুষ্ঠানটি মনে করিয়ে দিচ্ছিল তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে আয়োজিত দুর্গাপুজোর কার্নিভালের কথা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিষ্ঠিত ও তাঁর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস ২০১১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছে।

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিকল্পনায় শুরু হওয়া সেই কার্নিভাল ছিল পুজোর উৎসবের সমাপ্তিপর্ব। রেড রোড দিয়ে এগিয়ে যেত বড় বড় পুজোর প্রতিমা; সঙ্গে থাকত সাংস্কৃতিক দলের অনুষ্ঠান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলত সেই আয়োজন। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের তারকাদের সঙ্গে তৃণমূল নেত্রীকেও প্রায়ই নাচে পা মেলাতে দেখা যেত। কোটি কোটি টাকার বাজেটে পুজো কমিটিগুলির আয়োজিত এই বড় পুজোগুলি রাজ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সেখানে বিপুল ভিড় হয়; পৃষ্ঠপোষক হিসেবে প্রায়ই থাকেন সুপরিচিত রাজনৈতিক নেতারা।

দুর্গাপুজোর দশ দিনের বার্ষিক উৎসব ‘ঐতিহ্য’ মেনে পালনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া বিজেপি সরকার কার্নিভাল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ রেড রোডের সেই পুরনো কার্নিভালস্থল থেকে পাঁচশো মিটারেরও কম দূরে ইডেন গার্ডেন্সে উৎসবের সূচনাপর্বকে বিরাট সাফল্য করে তুলতে কোনও চেষ্টাই বাকি রাখেনি সেই সরকার।

অক্টোবরের আর্দ্র সন্ধ্যাতেও প্রায় ৪০ হাজার মানুষ অনুষ্ঠান দেখতে জড়ো হয়েছিলেন। প্রায় ১০ হাজার ঢাকির সমবেত বাদ্য, এক হাজার শঙ্খের ধ্বনি, সুপরিচিত শিল্পী ও গায়কদের অনুষ্ঠান এবং স্টেডিয়ামের আকাশে আলো ছড়ানো তিন হাজার ড্রোন—সবই ছিল সেই আয়োজনে।

আয়তন ও জাঁকজমকে বিজেপির দুর্গাপুজোর অনুষ্ঠান তৃণমূল আমলের কার্নিভাল থেকে খুব আলাদা ছিল না। পরিবর্তনটি ছিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বার্তায়: মণ্ডপে জাতীয়তাবাদী বিষয়ভাবনা, পুজো কমিটির রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক বদল, আমিষ খাবার নিয়ে বিরোধ এবং মণ্ডপের কাছে বইয়ের স্টলের উপর বিধিনিষেধ। এই পরিবর্তনগুলি একসঙ্গে বুঝিয়ে দিচ্ছে, বাংলার সবচেয়ে বড় উৎসবের রাজনীতিকে কীভাবে নতুন করে সাজাচ্ছে নতুন শাসনব্যবস্থা।

ইডেন গার্ডেন্সে শুভেন্দু বলেন, “এ বছর সমস্ত দুর্গাপুজোয় যথাযথ ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলা হবে।” পূর্বসূরিকে কটাক্ষ করে তাঁর অভিযোগ, দেবীপক্ষ শুরুর আগেই পুজোর উদ্বোধন করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উৎসবের আচারবিধিকে অগ্রাহ্য করতেন। তিনি বলেন, “এই প্রথম নির্ধারিত সময়ের আগে পুজোর উদ্বোধন হয়নি। এটাই আমাদের পরম্পরা; প্রত্যেককে ধর্মশাস্ত্র ও ঐতিহ্য মেনে চলতে হবে। প্রত্যেক ধর্মের নিজস্ব নিয়মকানুন রয়েছে। কোনও মুখ্যমন্ত্রীরই নিজের ইচ্ছেমতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা নেই।”

ইডেন গার্ডেন্স থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে কুমোরটুলির সরু গলিতেও নতুন সরকারের ঐতিহ্যের উপর জোর দেওয়ার প্রভাব পড়েছে শিল্পীদের কাজে। নদীর ধারের এই মৃৎশিল্পী পাড়ায় প্রতি বছর দেবী দুর্গার প্রায় চার হাজার মাটির প্রতিমা তৈরি হয়। এই জনপদের ইতিহাস দু’হাজার বছরেরও বেশি পুরনো—কলকাতার জমিদারেরা দুর্গাপুজোর প্রতিমা গড়ার জন্য কৃষ্ণনগর থেকে শিল্পীদের নিয়ে এসেছিলেন, সেই সময় থেকে।

এ বছর প্রতিমা তৈরির সময় বিজেপি নেতা ও মন্ত্রীরা পুজো উদ্যোক্তাদের বারবার আবেদন জানিয়েছেন, দেবীর ‘প্রথাগত’ রূপ বজায় রাখতে হবে, বিকৃত উপস্থাপনা এড়াতে হবে। অথচ গত কয়েক দশকে দুর্গাপুজো প্রথাগত উপাসনার সীমা ছাড়িয়ে বিষয়ভিত্তিক শিল্পচর্চাকে গ্রহণ করেছে; দেবীকে তুলে ধরা হয়েছে নানা রূপে।

এ বছর শিল্পীরা বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন প্রথাগত বা সাবেকি প্রতিমায়। সাবেকি প্রতিমায় বজায় থাকে চিরচেনা বাঙালি রূপ: বড়, টানা চোখের পরিচিত দুর্গামুখ, একই চালার মধ্যে গোটা দেবপরিবার এবং সাদা শোলার কাজের মতো ঐতিহ্যবাহী সাজসজ্জা।

কুমোরটুলির প্রবীণ শিল্পী বঙ্কিম পাল বলেন, নতুন সরকার দেবীমূর্তির আকার ও রূপ নিয়ে অলিখিত নির্দেশ দেওয়ার পর বহু পুজো উদ্যোক্তা মণ্ডপের শিল্পকর্ম নিয়ে সতর্ক হয়ে গিয়েছেন। তবে তিনি দৃঢ়ভাবে জানান, কোনও সরকারি নির্দেশ শিল্পকে থামাতে পারে না। তাঁর কথায়, “থিমের পুজো আমাদের ভাল লাগতেও পারে, না-ও পারে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পকেও নতুন কৌশল ও নতুন রূপে বিকশিত হতে দিতে হবে। এটাই শিল্পের স্বভাব।”

সাবেকি ও থিমের প্রতিমার এই টানাপড়েনের মধ্যে সমীর পালের মতো কয়েকজন প্রতিমাশিল্পী জানাচ্ছেন, ব্যবসায় মন্দা চলছে। সমীর বলেন, “সাধারণত আমি অন্তত ২০টি প্রতিমা বিক্রি করি। এ বছর মাত্র ১৬টির বরাত পেয়েছি। যে পুজো কমিটিগুলি আমার কাছ থেকে দুর্গাপ্রতিমা কিনত, তাদের কয়েকটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে, কারণ সেগুলি তৃণমূল-সমর্থিত ছিল।” উৎসবের ব্যস্ততম সময়ে কুমোরটুলির শিল্পীদের মাটির তীব্র সংকটের মুখেও পড়তে হয়েছে। কাজের দেরি এবং ভাল মানের মাটি কিনতে বাড়তি দাম দিতে হওয়ায় তাঁদের লাভ আরও কমেছে।

বিজেপি সরকারের আমলে দুর্গাপুজোয় ঐতিহ্যের প্রাধান্য বাড়লেও থিমের মণ্ডপ হারিয়ে যায়নি। বরং নতুন নতুন বিষয় উঠে এসেছে, যা দেখাচ্ছে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব কতটা সর্বব্যাপী। কলকাতার বড় পুজোগুলির অন্যতম প্রধান বিষয় ‘বন্দে মাতরম্’ এবং জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির কাছে শ্যামাপ্রসাদ হয়ে উঠেছেন নতুন এক সাংস্কৃতিক প্রতীক। যেমন, নিউ আলিপুরের সুরুচি সঙ্ঘের ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোর ভাবনায় বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতির অনুপ্রেরণার পাশাপাশি রয়েছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য।

‘বন্দে মাতরম্’-এর ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতীয় স্তোত্রটি এবং তার রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এ বছর কলকাতার বহু পুজোমণ্ডপের বিষয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের দুর্গাপুজো। তাদের থিম ‘সনাতনী চেতনায় বন্দে মাতরম্’।

তৃণমূল আমলেও বিজেপি নেতা সজল ঘোষের উদ্যোগে আয়োজিত সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের পুজো এ বার বেছে নিয়েছে জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ভাবনা। কালীঘাটের ৬৬ পল্লি, কাঁকুড়গাছি মিলন মেলা সমিতি এবং সোদপুরের বিজয়পুর সর্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটি-সহ কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পুজো কমিটিও এ বছর ‘বন্দে মাতরম্’-কে থিম করেছে।

মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে, যে পুজো কমিটিগুলির সঙ্গে আগে স্থানীয় তৃণমূল নেতা, কাউন্সিলর ও মন্ত্রীরা যুক্ত ছিলেন, সেগুলির নতুন পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছেন বিজেপি নেতারা। দক্ষিণ কলকাতার রাজডাঙা এলাকায় পরিচিত ক্লাব রাজডাঙা নব উদয় সঙ্ঘের আশপাশের বাসিন্দারা এই রাজনৈতিক বদল বোঝাতে বলছেন, “এক ঘোষ এলেন, অন্য ঘোষ গেলেন।” গত বছর পর্যন্ত এই বারোয়ারি দুর্গাপুজো হত তৃণমূল নেতা সুশান্ত ঘোষের নেতৃত্বে। তোলাবাজি, দুর্নীতি ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র-সহ একাধিক অভিযোগে ১৮ জুন কলকাতা পুলিশ প্রাক্তন এই তৃণমূল কাউন্সিলরকে গ্রেফতার করে।

প্রভাবশালী রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক হারানোর পর পুজোর উদ্যোক্তারা বিজেপি নেত্রী ও মুখপাত্র কেয়া ঘোষকে পুজো কমিটির সভাপতি করেছেন। কলকাতার প্রায় প্রতিটি বড় পুজোতেই একই ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে—বিজেপি নেতারা জায়গা করে নিয়েছেন, তৃণমূল নেতারা সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

গত ১৫ বছর ধরে জাঁকজমকপূর্ণ থিমের দুর্গাপুজোর জন্য বিখ্যাত শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবের নাম প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল সুজিত বসুর সঙ্গে। প্রাক্তন এই তৃণমূল বিধায়ক রাজ্যের দমকল ও জরুরি পরিষেবা দফতরের মন্ত্রীও ছিলেন। এ বছর সেই পুজোর উদ্বোধন করেছেন শুভেন্দু অধিকারী। ১৮ অক্টোবর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যে অল্প কয়েকটি পুজোমণ্ডপ পরিদর্শন করেন, তার মধ্যেও ছিল শ্রীভূমি।

ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক দেবজিৎ চট্টোপাধ্যায় তাঁদের পুরনো পৃষ্ঠপোষক সম্পর্কে কিছু বলতে চান না। সেই পৃষ্ঠপোষক এখন কারাগারে। দেবজিৎ বলেন, “সরকার বদলানোর পর মানুষ এখন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন। মুখ্যমন্ত্রী এখানে এসেছেন, এতটা সময় কাটিয়েছেন—এ আমাদের সৌভাগ্য। নতুন সরকারকে সঙ্গে নিয়ে আমরা গোটা পুজো ও উৎসবকে নতুন করে ভাবছি।”

নতুন সরকারের সঙ্গে তাল মেলাতে অন্য বড় পুজোগুলিও পিছিয়ে নেই। আগে প্রাক্তন বিদ্যুৎ ও আবাসনমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের তত্ত্বাবধানে থাকা নিউ আলিপুর সুরুচি সঙ্ঘের পুজো কমিটি বিজেপি বিধায়ক সৌরভ সিকদারকে নতুন পৃষ্ঠপোষক করেছে। মধ্য কলকাতার মহম্মদ আলি পার্কের দুর্গাপুজোর উদ্বোধন করতেন তৃণমূল সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। এ বছর সেই দায়িত্ব নিয়েছেন রাজ্যের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়। কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ও প্রাক্তন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে যুক্ত চেতলা অগ্রণীর পুজোর উদ্বোধনও এ বছর করেছেন শুভেন্দু অধিকারী।

ইতিহাসবিদ ও শিক্ষাবিদ তপতী গুহঠাকুরতা এক সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করেছেন, কেন দুর্গাপুজোর ক্লাব ও উদ্যোক্তারা পক্ষ বদলাচ্ছেন। তিনি বলেন, “দুর্গাপুজো বরাবরই রাজনৈতিক বিষয়, বিশেষ করে স্থানীয় ক্লাব এবং এলাকার রাজনীতির ক্ষেত্রে। মমতা পুজোকে শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিসেবে নিজের বলে দাবি করেননি, একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবেও ব্যবহার করেছেন। তিনি সেটিকে চরমে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং রাষ্ট্র পরিচালিত অনুষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন। পুজোর উপর তৃণমূলের এত শক্ত দখল ছিল বলেই এখন আক্রমণের খড়্গ উঠেছে ।

২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপুজোকে ইউনেস্কোর মানবতার নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য যে নথি তৈরি হয়েছিল, তা রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তপতী। তাঁর মতে, বর্তমান সরকার চায়, “আগের সরকার যা যা করেছিল, তার প্রতিটি জিনিস অনুকরণ করতে।”

দুর্গাপুজো পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিরও একটি প্রধান চালিকাশক্তি। রাজ্যের বহু বড় পুজো ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে; তাদের বাজেট ২০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের চাঁদার পাশাপাশি কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতা থেকে এই অর্থ আসে। বিনিময়ে প্রায়ই মণ্ডপের চারপাশে ব্যানার ও হোর্ডিং লাগানোর সুযোগ দেওয়া হয়।

২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন দফতরের উদ্যোগে ব্রিটিশ কাউন্সিল দুর্গাপুজোর সঙ্গে যুক্ত সৃজনশীল অর্থনীতির সমীক্ষা করে। তার আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছিল ৩২ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা, যা রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ২.৫৮ শতাংশের সমান। ২০১৮ সালে রাজ্য সরকার দুর্গাপুজো কমিটিগুলিকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া শুরু করে। ২০২৫ সালে সেই অনুদান বেড়ে হয় পুজোপিছু ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা। বিজেপি সরকার ২০২৬ সালেও এই প্রকল্প চালু রেখেছে। তবে বড় বাজেটের পুজো কমিটিগুলিকে অনুদানের জন্য আবেদন না করার আহ্বান জানিয়েছে।

এ বছর উৎসবের পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে আদানি গোষ্ঠী। ১০ থেকে ১২ অক্টোবর আয়োজিত হয় ‘দুর্গাপুজো আদানি প্রিভিউ’। বেছে নেওয়া আটটি পুজোর প্রত্যেককে ২৫ লক্ষ টাকা করে অনুদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ২০২২ সাল থেকে দুর্গাপুজোর এমন আগাম প্রদর্শনের আয়োজন করে আসছিল অলাভজনক সংস্থা ‘মাসআর্ট’। ওই সংস্থার আয়োজকদের মধ্যে রয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন পর্যটনমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। আগাম প্রদর্শনীকে ঘিরে আর্থিক অনিয়ম ও টিকিট বিক্রির কেলেঙ্কারির অভিযোগে আয়োজকদের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট।

দুর্গাপুজোর প্রায় ৪০ দিন আগে পশ্চিমবঙ্গের এক অনুষ্ঠানে বাঙালিদের পুজোমণ্ডপ থেকে আমিষ খাবার দূরে রাখতে বলে বিতর্ক সৃষ্টি করেন ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ গর্গ, যিনি বাগেশ্বর ধাম বাবা নামেও পরিচিত। মধ্যপ্রদেশের বাগেশ্বর ধাম বালাজি মন্দিরের এই প্রধান বাংলায় দুর্গাপুজোর সময় পরিবেশিত আমিষ খাবারকে ‘নোংরা’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “যাঁরা এ ধরনের খাবার খান, তাঁরা ধার্মিক নন; তাঁরা ভণ্ড।”

রাজ্যের মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করতে শুভেন্দু অধিকারী এবং রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য-সহ দলের গোটা নেতৃত্বকে বিবৃতি দিতে হয়। নিজেদের খাদ্যাভ্যাস এবং পুজোয় কীভাবে খাওয়াদাওয়া করবেন, তা নিয়ে কোনও ‘বহিরাগত’-র উপদেশ শুনতে রাজি ছিলেন না তাঁরা।

কলকাতার বনেদি বাড়িগুলি-সহ বহু দুর্গাপুজোর উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, আমিষ নিবেদন ও খাওয়া শক্তি উপাসনার শাক্ত পরম্পরার অংশ। এই বনেদি পরিবারগুলির অনেকেই কয়েক শতাব্দী ধরে বাড়িতে দুর্গাপুজো করে আসছেন। দক্ষিণ কলকাতার বেহালায় দুর্গাপুজোর আয়োজনকারী সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পঁয়ত্রিশতম প্রজন্মের সদস্য শ্রীমন্ত রায়চৌধুরী বলেন, “আমাদের পুজো ৪১৭ বছরের পুরনো। বাইরে থেকে কোনও ব্যক্তি বা বাবা এসে বলে দেবেন না, আমরা আমাদের পুজোয় কী করব। প্রত্যেক ধর্মের নিজস্ব পরম্পরা রয়েছে। আমরা কী খাব, কী পরব, তা কেউ বলে দিতে পারেন না। এ আমাদের মৌলিক অধিকার।”

খাবার নিয়ে বিতর্ক অবশ্য ধীরেন্দ্রর মন্তব্যেই শেষ হয়নি। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিরিয়ানির একটি দোকানের বিজ্ঞাপনী হোর্ডিংয়ে বিরিয়ানির হাঁড়ির পাশে দেবী দুর্গার ছবি ব্যবহার করা হয়। তা নিয়ে হুগলি জেলায় বিতর্ক বাধে। স্থানীয় এক বিজেপি বিধায়ক অভিযোগ করেন, এতে হিন্দুদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। উত্তরপাড়ার হিন্দমোটর এলাকার একটি বহুতল আবাসনের বাইরে লাগানো ওই হোর্ডিংয়ে বাংলায় লেখা কথার মর্ম ছিল, ‘এ পুজোয় দেবীর প্রতি ভক্তি… স্বাদে রকস্টার’। শেষ পর্যন্ত হোর্ডিংটি সরিয়ে দিতে হয়।

উত্তরবঙ্গেও বিরিয়ানিকে ঘিরে বিভাজনমূলক প্রচার শুরু হয়। ‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চ’ নামে একটি সংগঠন পোস্টার দিয়ে মানুষকে হিন্দুদের মালিকানাধীন দোকান থেকে বিরিয়ানি ও পুজোর সামগ্রী কেনার আহ্বান জানায়। রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ওই পোস্টারের ব্যাপক নিন্দা হয়।

দুর্গাপুজোকে ঘিরে বিজেপির তৎপরতা শুধু মণ্ডপেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উৎসব উপলক্ষে শহরের রাস্তার চেহারা বদলাতে কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় রামধনুর রং লাগায় সরকার। এর মধ্যে ছিল চিংড়িঘাটা ও গড়িয়াহাট উড়ালপুল। প্রথমে এই উদ্যোগ প্রশংসা পেলেও, অল্প বৃষ্টির পর চিংড়িঘাটা উড়ালপুলে তিনটি মোটরবাইক পিছলে পড়ে যাওয়ার ভিডিয়ো সামনে আসে। তড়িঘড়ি রং ঘষে তোলার চেষ্টা করে কর্তৃপক্ষ। রামধনু রঙের উড়ালপুলে বসানো হয় রোড স্টাড, খসখসে করা হয় রাস্তার উপরিভাগ।

উড়ালপুলে রং করার অনুমতি দিয়েছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে যে নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালকে, তিনি জানান, পিছলে যাওয়া ঠেকানোর উপযোগী রংই ব্যবহার করা হয়েছিল। তাঁর কথায়, “দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে আধিকারিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, গাড়ি চালানোর সময় রংগুলি চোখে চাপ ফেলছে। যদি তা-ই হয়, বিকল্প ব্যবস্থা করা হবে। মানুষের প্রয়োজনের পক্ষে যা সুবিধাজনক, তা-ই করা হবে।” কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয়কুমার নন্দ বলেন, উড়ালপুলের রঙের সঙ্গে বাইক দুর্ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে—এমন চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বৃষ্টি হলে চিংড়িঘাটা উড়ালপুলে মোটরবাইক চলাচল বন্ধ রাখা হবে বলেও জানান তিনি।

এ বারের উৎসবে বাম দলগুলির বইয়ের স্টল বসানোর উপর বিধিনিষেধও বিরোধের একটি বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। সিপিআই(এম)-সহ বাম দলগুলির নেতারা জানিয়েছেন, দুর্গাপুজোর মণ্ডপের কাছে বইয়ের স্টল বসানোর অনুমতি দিচ্ছে না পুলিশ। গত কয়েক দিনে এমন স্টলে হামলা হয়েছে বলে একাধিক ঘটনার উল্লেখও করেছেন তাঁরা। সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেন, “বই তো অজুহাত মাত্র; আসলে শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত সবকিছুর উপরেই ওরা আঘাত করতে চায়। এই সৃজনশীল ক্ষেত্রগুলির বিরুদ্ধে ওরা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।”

দুর্গাপুজোর মণ্ডপে বইয়ের স্টল বসানোর দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সিপিআই(এম) ও অন্য বাম দলগুলি দুর্গাপুজোর আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয় না। এই স্টলগুলি শুধু তাদের মতাদর্শ জনপ্রিয় করার উপায় নয়, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলারও মাধ্যম।

এক মাসেরও বেশি আগে, ১০ সেপ্টেম্বর, শুভেন্দু অধিকারী পুজো কমিটিগুলিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, যাঁরা দুর্গাপুজোকে ‘শারদোৎসব’ বলেন, তাঁদের যেন মণ্ডপের কাছে কোনও জায়গা না দেওয়া হয়। দুর্গাপুজো ঐতিহ্য মেনেই পালিত হবে বলে দাবি করা শুভেন্দুর বক্তব্য, ‘শারদোৎসব’ শব্দের ব্যবহার আসলে উৎসবের ধর্মীয় চরিত্রকে লঘু করা এবং কমিউনিস্ট সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার জন্য বাম দলগুলির পরিকল্পিত প্রচেষ্টার অংশ।

উৎসবকে ঘিরে এত বিতর্কের মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দাবি, রাজ্যে দুর্গাপুজোর মণ্ডপের সংখ্যা ১২ হাজার ৪০০ বেড়েছে। এখন রাজ্যে মোট দুর্গাপুজোর মণ্ডপের সংখ্যা ৫৭ হাজার ৪০০।

২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপুজোকে মানবতার নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সময় ইউনেস্কো একে বর্ণনা করেছিল “জনপরিসরে ধর্ম ও শিল্পের সম্মিলিত প্রকাশের শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত” হিসেবে। তাদের ভাষায়, এই উৎসবে “শিল্পসজ্জা দেখতে দর্শকদের ভিড় যখন ঘুরে বেড়ায়, তখন শ্রেণি, ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের বিভাজনগুলি ভেঙে পড়ে।” পশ্চিমবঙ্গ যখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের আরও একটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, দুর্গাপুজোও নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে। এই পালাবদল উৎসবকে নতুন ও ভিন্ন কোনও রূপে বদলে দেবে কি না, তার উত্তর সময়ই দেবে।