বাংলাস্ফিয়ার: বাম ছাত্রনেতা নেহা বোরা এবং সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বিজেপি-বিরোধী আন্দোলন থেকে উঠে আসা সাম্প্রতিকতম মুখ। কিন্তু বিরোধীদের সাংগঠনিক দুর্বলতা থেকেই গিয়েছে।

বিজেপির গভীর শিকড় ছড়ানো নির্বাচনী যন্ত্রের মোকাবিলায় বিরোধী পরিসরের কাঠামোগত ও সাংগঠনিক ভিত আরও মজবুত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।

হার্দিক পটেল

এই প্রবণতার শুরু ২০১৫ সালে। গুজরাতে পাটিদারদের সংরক্ষণের দাবিতে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হঠাৎই উত্থান ঘটে ২২ বছরের হার্দিক পটেলের। বিজেপির সমালোচকেরা তাঁকে সাদরে বরণ করে নিয়েছিলেন। মনে হচ্ছিল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নিজের রাজ্যেই শাসক দলের বিরুদ্ধে হাওয়া ঘুরিয়ে দিচ্ছেন তিনি। কিন্তু ২০১৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের ১৮২টি আসনের মধ্যে ৯৯টিতে জেতে বিজেপি। কংগ্রেস অবশ্য নিজেদের আসনসংখ্যা বাড়িয়ে ৭৭-এ নিয়ে যায়। বিজেপির চেনা বিপুল জয় না হলেও, দলটি সেই চ্যালেঞ্জ সামলে ক্ষমতায় টিকে যায়।

হার্দিক ২০১৯–২০ সালে কংগ্রেসে যোগ দেন এবং গুজরাত প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির কার্যকরী সভাপতি হন। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন এবং বিধায়ক নির্বাচিত হন।

কানহাইয়া কুমার

২০১৬ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সভাপতি কানহাইয়া কুমার জাতীয় স্তরে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তখন তিনি সিপিআইয়ের ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানে ভারত-বিরোধী স্লোগান ওঠার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে ধরপাকড় শুরু হলে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। হিন্দিতে তাঁর বক্তৃতার দক্ষতা বহু মানুষকে মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে বিহারের বেগুসরাই থেকে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে বিজেপির গিরিরাজ সিংহের কাছে হেরে যান কানহাইয়া। পরে তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও দিল্লিতে বিজেপির মনোজ তিওয়ারির কাছে পরাজিত হন তিনি। বর্তমানে তিনি দলের ছাত্র সংগঠন ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া বা এনএসইউআইয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির নেতা। কিন্তু যন্তর মন্তরের আন্দোলনের পরে এ বছর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এনএসইউআই সব পদে হেরে যাওয়ায় তাঁকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। এনএসইউআইয়ের টিকিট না পাওয়া দীপাংশু শোকিন নির্দল প্রার্থী হিসেবে বিপুল ব্যবধানে সহ-সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর সংগঠন এবং কানহাইয়া—উভয়ের বিরুদ্ধেই সমালোচনা ওঠে।

জিগ্নেশ মেবাণী

২০১৬ সালেই গুজরাতের উনায় দলিতদের বেত্রাঘাতের ঘটনার বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করে পরিচিতি পান জিগ্নেশ মেবাণী। দলিত অধিকারকর্মী ও আইনজীবী মেবাণী ২০১৭ সালে নির্দল প্রার্থী হিসেবে গুজরাতের ভাদগাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হন। পরে তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন এবং ২০২২ সালে কংগ্রেসের টিকিটে ফের ভাদগাম থেকে জেতেন। তবে একসময় যেভাবে তিনি আলোড়ন তুলেছিলেন, এখন আর সেভাবে পারছেন না।

চন্দ্রশেখর আজাদ

দলিতদের বিভিন্ন প্রশ্নে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলা ভীম আর্মির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে চন্দ্রশেখর আজাদের উত্থান ঘটে। সেই সময় মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি ক্রমশ দুর্বল হচ্ছিল। আজাদ মায়াবতীরই জাতিগোষ্ঠী—জাটভ—থেকে উঠে এসেছেন। দু’জনের অঞ্চলও এক: পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ।

আজাদ সমাজ পার্টিরও প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ২০২৪ সালে এই দলের টিকিটেই নাগিনা লোকসভা আসনে জয়ী হন। এখন বিএসপির ভোটভিত্তির দাবিদারদের মধ্যে তিনিও একজন। আগামী বছর উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন তাঁর সামনে বড় পরীক্ষা। তাঁর দল কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, সেই নির্বাচনে তা বোঝা যাবে।

অভিজিৎ দীপকে

কয়েক মাস আগে অনলাইনে একটি ব্যঙ্গাত্মক মঞ্চ হিসেবে সিজেপি গড়ে তুলে পরিচিত হয়ে ওঠেন অভিজিৎ দীপকে। তার আগে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত কর্মহীন, বিক্ষুব্ধ তরুণদের ‘আরশোলা’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। সেই মন্তব্য ঘিরে তুমুল বিতর্ক হয়। পরে প্রধান বিচারপতি ব্যাখ্যা দেন, তিনি তরুণদের সমালোচনা করেছেন—এমন দাবি ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’।

ইনস্টাগ্রামে দ্রুত জনপ্রিয়তা পায় সিজেপি। অনলাইনে তৈরি হওয়া এই সাড়াকে এমন একটি আন্দোলনে রূপ দিতে পেরেছেন দীপকে, যা মানুষকে প্রতিবাদে রাস্তায় নামাতে পারে। বিশেষ করে নিট পরীক্ষা বাতিলের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশন ঘিরে ভিড় বাড়তে শুরু করার পর এই প্রক্রিয়া গতি পায়। প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হওয়ায় নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করে সিজেপি।

কিন্তু রাস্তায় নেমে আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্বে সিজেপি নেতাদের রাষ্ট্রের অনেক বেশি কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হয়েছে। দীপকে এবং তাঁর সহযোগী সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার ভবিষ্যৎ পথ আপাতত অনিশ্চিত। সৌরভ ও আশুতোষ বর্তমানে তিহাড় জেলে রয়েছেন।

নেহা বোরা

জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় যাঁরা অনশনে বসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন আইসার সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরা। তাঁর অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা, অনশন এবং প্রতিবাদ মিছিল বহু মানুষের মনে সাড়া জাগিয়েছে।

১২ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে বিরোধীদের প্রতিবাদ মিছিলে নেহাকে রাহুল ও প্রিয়ঙ্কা গান্ধীর পাশে দেখা যায়। এর ফলে এনএসইউআইয়ের একাংশে অসন্তোষের গুঞ্জন ওঠে। কয়েক দিন পরে বাংলাদেশের যুব অভ্যুত্থানকে এ দেশের জেন জি আন্দোলনের প্রেরণা হিসেবে প্রশংসা করে বিতর্কে জড়ান তিনি। বিজেপি দ্রুত সেই বক্তব্যকে হাতিয়ার করে অভিযোগ তোলে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের যে অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছিল, তার আদলে নেহা ও বিরোধীরা এ দেশেও ‘ক্ষমতার পালাবদল’ ঘটাতে চাইছেন।

কাঠামোগত দুর্বলতা

বিজেপি-বিরোধী আন্দোলন থেকে হঠাৎ উঠে আসা মুখগুলিকে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরার একটি দুর্বলতা হল, এর মাধ্যমে বিরোধী দলগুলির, বিশেষ করে কংগ্রেসের, সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী হয় না। উল্টে নেহার আকস্মিক উত্থান ও তাঁর প্রতি কংগ্রেস নেতৃত্বের প্রচ্ছন্ন সমর্থন, কিংবা কানহাইয়ার কংগ্রেসে যোগ দিয়ে এনএসইউআইয়ের দায়িত্ব পাওয়ার মতো ঘটনায় এনএসইউআই ও যুব কংগ্রেসের কর্মীদের মনোবল আরও ভেঙে পড়ে।

বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র গুরু প্রকাশ বলেন, “নিজেদের সংগঠনের ভিতর থেকে নেতৃত্ব তৈরি করতে না পারলে এভাবেই কৃত্রিমভাবে নেতৃত্ব নির্মাণ করতে হয়। কংগ্রেসের অবস্থা স্থায়ী অশান্তি ও অস্থিরতার মধ্যে আটকে রয়েছে।”

তাঁর বক্তব্য, “সংগঠনের অভাবে সরাসরি রাজনৈতিক লড়াইয়ে নামার সদিচ্ছা যে তাদের নেই, এর মধ্যে সেটাই ফুটে ওঠে। তাই তারা বাইরে থেকে আনা নেতৃত্বের উপর নির্ভর করে—কানহাইয়া কুমার ও জিগ্নেশ মেবাণীর মতো নেতাদের উপর। নেতৃত্বের এই মডেল আগেও প্রয়োগ করা হয়েছে, পরীক্ষা করা হয়েছে এবং তা ব্যর্থ হয়েছে। বাইরে থেকে নেতৃত্ব আমদানি করার এই সূত্র কাজ করবে না।”

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কংগ্রেস নেতা বলেন, এর মধ্যে নতুন কিছু নেই। প্রতিটি আন্দোলনই কয়েকটি মুখের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠে।

তাঁর কথায়, “গান্ধীবাদী আন্দোলনগুলিকে ওই নামে ডাকা হয়, কারণ গান্ধী সেগুলির প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। সত্তরের দশকের জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলন কিংবা ২০১১ সালের আন্না হাজারের আন্দোলনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাহলে আমরা কীভাবে বলি যে মোদীর পাল্টা হিসেবে ইচ্ছাকৃতভাবে কয়েকজন ব্যক্তিকে সামনে তুলে ধরা হচ্ছে? আন্দোলনের সঙ্গে যাঁদের মুখ জড়িয়ে যায়, মানুষ তাঁদের দিয়েই সেই আন্দোলনকে চেনে।”

তবে তিনি স্বীকার করেন, দলের বাইরে থেকে উঠে আসা এই মুখগুলির মতো, গত কয়েক দশকে কোনও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কংগ্রেস নিজস্ব কোনও মুখ তৈরি করতে পারেনি।

ওই কংগ্রেস নেতা আরও বলেন, আশির দশকের শেষ এবং নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় রাম জন্মভূমি আন্দোলনে বিজেপির একটি মুখ ছিল: লালকৃষ্ণ আডবাণী।

তাঁর বক্তব্য, “মহাত্মা গান্ধীর পর থেকে কংগ্রেস এটা করে উঠতে পারেনি। কারণ, আমরা অধিকাংশ সময়ই ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার অংশ থেকেছি, আর এই ধরনের নেতাদের জন্ম হয় প্রতিরোধের মধ্যে দিয়ে। তবে এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ যে রাহুল গান্ধী ইতিমধ্যেই হয়ে উঠেছেন, তা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। কংগ্রেসের পক্ষে সেটা ইতিবাচক।”