শিবের বরযাত্রার সকলকে আপন করে নেওয়ার ভাবনা এবং ব্যাটম্যানের নিজের উদ্যোগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চিত্রকল্পকে পথের প্রতিবাদের সঙ্গে মিলিয়ে কংগ্রেস এমন এক দৃশ্যভাষা তৈরি করেছে, যা সাংস্কৃতিক প্রতীকের ব্যবহারে বিজেপির একচেটিয়া দখলকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
রাহুল গান্ধীর সাংবাদিক বৈঠকের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ‘শিবজি কি বরাত’ বা শিবের বরযাত্রার উপমা। বিজেপির উপর থেকে নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণের রাজনৈতিক বয়ানের মোকাবিলায় বিরোধীদের স্বতঃস্ফূর্ত, বিকেন্দ্রীভূত প্রতিবাদের ধরনকে তুলে ধরতে এই উপমা ব্যবহার করেন তিনি।
‘শিবজি কি বরাত’ বলতে দেবী পার্বতীকে বিবাহ করতে যাওয়ার সময় শিবের সেই অত্যন্ত ব্যতিক্রমী বরযাত্রাকে বোঝানো হয়। শিবপুরাণ এবং তুলসীদাসের ‘রামচরিতমানস’-এর মতো হিন্দু ধর্মগ্রন্থে এই ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলির দায়বদ্ধতা নিয়ে সাংবাদিক বৈঠকে পৌরাণিক প্রতীক ও চিত্রকল্পকে যুক্ত করে ধর্মীয় প্রতীকের ব্যবহারে বিজেপির একচেটিয়া আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানান রাহুল।
কথিত আছে, শিবের বরযাত্রা ছিল এক অভূতপূর্ব সমাবেশ। সেখানে এমন সব সত্তা একত্র হয়েছিল, যারা অন্য সময়ে পরস্পরের ঘোর শত্রু অথবা সমাজের চোখে ব্রাত্য। এক দিকে মণ্ডল রাজনীতির যাদব উত্তরসূরি অখিলেশ ও তেজস্বীর নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিকেরা, অন্য দিকে বাম রাজনীতির উদীয়মান মুখ নেহা বোরা—এঁদের একত্র করে বিরোধীদের লড়াইকে এমন এক বহুকেন্দ্রিক সম্মিলিত উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন রাহুল, যেখানে কোনও একজন ‘নেতা’ উঁচু বেদিতে বসে নেই।
বিজেপি নেতৃত্ব দ্রুত এই চিত্রকল্পের পাল্টা দিতে নামে। নিজেদের পরিচিত রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে উপমাটির অর্থ বদলে দেওয়ার আগ্রাসী চেষ্টা শুরু হয়। শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রীরা মেরুকরণমূলক শব্দবন্ধ ব্যবহার করে পাল্টা আক্রমণ করেন। জোটকে তাঁরা বলেন ‘হুড়দঙ্গিয়োঁ কি জামাত’—অর্থাৎ হইহল্লা ও অরাজকতা সৃষ্টিকারীদের সমাবেশ। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জোটের অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যগুলিকে মহাজাগতিক বিদ্রোহের শৈব চিত্রকল্পে তুলে ধরার রাহুলের এই কৌশল বিরোধীদের গতি দিচ্ছে। আর তা ঘটছে এমন সময়ে, যখন নৈতিক আদর্শরাজ্য হিসেবে বিজেপির ‘রামরাজ্য’-ভাবনায় ফাটল দেখা দিচ্ছে।
এই আন্দোলনকে ‘তাণ্ডব, শিবের নৃত্য’ বলে বর্ণনা করে এবং ‘কোনও পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই’ বলে রাহুল বিজেপির বহুল ব্যবহৃত সমালোচনাটিকেই উল্টে দিয়েছেন। বিরোধীরা ‘অসংগঠিত’ বা ‘বিশৃঙ্খল’—এই অভিযোগের জায়গায় তাঁদের অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপগুলিকে তিনি তুলে ধরেছেন এক স্বতঃস্ফূর্ত, দৈব ও অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে।
রাহুল যখন বলেন, ‘শিবের বরযাত্রায় যে কেউ যোগ দিতে পারেন… যে কোনও জীব আসতে পারে, আমরা কাউকে আটকাব না’, তখন সম্ভবত তিনি পরোক্ষে এই অত্যন্ত অপ্রচলিত রাজনৈতিক সমাবেশের বাস্তবতাকেই স্বীকার করে নিচ্ছিলেন। তার এক প্রান্তে রয়েছে বামপন্থী ছাত্রগোষ্ঠীগুলির আপসহীন রাজপথের প্রতিরোধ, অন্য প্রান্তে নিজেদের স্বাধীন সত্তার বিষয়ে অনমনীয় ককরোচ জনতা পার্টি। মতাদর্শগত ঐক্যহীন ‘খিচুড়ি’ জোটের ভাবমূর্তির জবাবে তিনি বরযাত্রীদের সামনে একটি অভিন্ন লক্ষ্য রেখেছেন: ক্ষমতার কথিত অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ থেকে সংবিধান ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে রক্ষা করা।
প্রতিবাদের এই নমনীয়, মুক্ত প্রবাহের সঙ্গে রাহুল তুলনা করেছেন আরও অনমনীয় এক রাজনৈতিক কাঠামোর। অতীতের সেই কাঠামোয়, তাঁর বর্ণনায়, একজন নির্দিষ্ট ‘রাজা’ থাকতেন, থাকতেন একজন ‘পরিচালক’, আর জনতা রথের পিছনে চলত। এর মধ্য দিয়ে তিনি ইঙ্গিত করেছেন, মানুষ রথযাত্রার যুগ পেরিয়ে এগিয়ে গিয়েছে।
এর আগেও রাহুল সংসদের ভিতরে নির্ভয়তার কথা বলতে শিবের প্রতীক ব্যবহার করেছেন—কখনও অভয়মুদ্রা দেখিয়েছেন, কখনও দেবদেবীর ছবি তুলে ধরেছেন। কিন্তু এই সাংবাদিক বৈঠক ছিল আলাদা। কারণ, কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁর উপমা রাজপথের বাস্তব কর্মকাণ্ড এবং টেলিভিশনের প্রাইম টাইমের পর্দায় জীবন্ত হয়ে ওঠে।
ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতারা আর কে আশ্রম মার্গ থেকে কনট প্লেস পর্যন্ত নেহা বোরার ‘টেম্পল রান’-এর দৃশ্য নিয়ে ইনস্টাগ্রাম রিল বানাতে শুরু করেন। আবহে ব্যবহার করা হয় ‘হনুমান অংশ’-এর জনপ্রিয় গান ‘যব জিদ পর আ গয়ি পার্বতী’—অর্থাৎ ‘যখন পার্বতী জেদ ধরে বসলেন’। গানটি এমনিতেই বিপুল জনপ্রিয়। কিন্তু ব্যবহারের প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ায় সেটিই হয়ে উঠেছে কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে নারীর দুর্দমনীয় প্রতিরোধের প্রতীক।
বছরের পর বছর ফয়েজ আহমদ ফয়েজের ‘হম দেখেঙ্গে’ প্রগতিশীল বাম আন্দোলনের প্রায় অবধারিত সংগীত হয়ে থেকেছে। কিন্তু এবারের নবরাত্রিতে সমাজমাধ্যম ছেয়ে যাচ্ছে ‘সুহাগ’ ছবির জনপ্রিয় ভক্তিগীতি ‘সবসে বড়া তেরা নাম ও শেরোঁয়ালি’-তে। সঙ্গে থাকছে মহিলা প্রতিবাদকারীদের আটক করার দৃশ্য।
একই সময়ে কংগ্রেসের তথ্যপ্রযুক্তি শাখা রাহুলকে ব্যাটম্যান হিসেবে তুলে ধরার কাজ করছে। এর সূত্রপাত অগস্টে ইনস্টাগ্রামে একটি ‘যা খুশি প্রশ্ন করুন’ পর্বে। সেখানে এক ব্যবহারকারী রাহুলকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনিই কি ব্যাটম্যান? পরে উঁচু হলুদ পুলিশি ব্যারিকেড বেয়ে উঠে রাহুলের জাতীয় পতাকা ওড়ানোর দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়লে, দলের সমাজমাধ্যমের কর্মীরা তার সঙ্গে জুড়ে দেন গথাম শহরের দিকে তাকিয়ে থাকা ব্যাটম্যানের চলচ্চিত্রের দৃশ্য। অনলাইনে এই চিত্রকল্প আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।
মিছিল চলাকালীন এক সমর্থক ভিড়ের মধ্যে দিয়ে প্রবীণ বিরোধী নেতাদের বহনকারী বাসে একটি ব্যাটম্যানের মুখোশ পৌঁছে দেন। রাহুল সেই মুখোশ নিয়ে ছবি তোলার ভঙ্গি করেন। মজার ছলে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেকেও সেটি পরে দেখতে সাহায্য করেন।
শাসকদল অভিযোগ করে, বিরোধীরা গুরুতর বিতর্ককে জনপ্রিয় সংস্কৃতির নাটুকে চমকে পরিণত করছেন। মন্ত্রী জয়ন্ত চৌধুরী এক্স-এ লেখেন, ‘দিল্লি গথাম নয়। আর আমাদের কোনও অন্ধকারের সুপারহিরো ও রবিনের প্রয়োজন নেই।’
উত্তরপ্রদেশের কংগ্রেসের অন্দরমহলের এক তরুণ সদস্যের মন্তব্য, গথাম শহরের মানুষও মনে করতেন, তাঁদের কোনও সুপারহিরোর প্রয়োজন নেই। তাঁর মতে, আরও গভীর পৌরাণিক স্তরে শিব ও ব্যাটম্যানের চিত্রকল্পের মধ্যে বিস্ময়কর সাদৃশ্য রয়েছে। প্রতিবাদে একই সঙ্গে এই দুই প্রতীক ব্যবহার করে কংগ্রেস মানুষের মনের একটি অভিন্ন প্রতিমূর্তিকে স্পর্শ করেছে: ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো এমন এক ‘বহিরাগত’, যিনি সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে লড়ছেন এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিরুদ্ধে, যা নিজের নীতি ও দায়িত্বের সঙ্গে আপস করেছে।