বাংলাস্ফিয়ার: রাজধানীতে বিপুল নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েনের মুখে অহিংস প্রতিরোধের ডাক দিয়েছিলেন তরুণ প্রতিবাদীরা
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১০ অক্টোবর যাঁরা স্বেচ্ছায় আটক হলেন, তাঁদের কর্মসূচি যেন নতুন করে জীবন্ত করে তুলল ১৯২২ সালে ঔপনিবেশিক আদালতে মহাত্মা গান্ধীর দেওয়া সেই ঐতিহাসিক বক্তব্যকে। রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় বিচার চলাকালীন তিনি বলেছিলেন, ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভিন্নমত কীভাবে নিজের অবস্থান প্রকাশ করবে।
জাতীয় রাজধানীতে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েনের মধ্যেই তরুণ প্রতিবাদীরা অহিংস প্রতিরোধের ডাক দিয়েছিলেন।
১৯২২ সালের ১৮ মার্চ দিনটিও ছিল শনিবার, এই ১০ অক্টোবরের মতোই। আমেদাবাদের জেলা ও দায়রা বিচারক সি এন ব্রুমফিল্ড খোলা আদালতে বক্তব্য রাখার সুযোগ দিলে তা গ্রহণ করেন মহাত্মা গান্ধী।
একসময়ের আইনজীবী, পরবর্তী কালে জাতির জনক হিসেবে পরিচিত গান্ধী বলেছিলেন, “আইন দিয়ে অনুরাগ সৃষ্টি করা যায় না, নিয়ন্ত্রণও করা যায় না।”
তাঁর বক্তব্য ছিল, “কোনও ব্যক্তি বা ব্যবস্থার প্রতি কারও অনুরাগ না থাকলে, সেই অনুরাগহীনতা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করার স্বাধীনতা তাঁর থাকা উচিত—যতক্ষণ তিনি হিংসার পরিকল্পনা করছেন না, হিংসাকে উৎসাহ দিচ্ছেন না কিংবা তাতে উসকানি দিচ্ছেন না।”
তিনি ‘হিংসাত্মক অসহযোগ’-এর বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন। তাঁর মতে, তা “অকল্যাণকেই বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়”।
গান্ধী বলেছিলেন, অহিংসার অর্থ হল, “অসহযোগের জন্য নির্ধারিত শাস্তি স্বেচ্ছায় মেনে নেওয়া”।
নিজের পত্রিকা ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’য় তিনটি প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য গান্ধীর বিচার হচ্ছিল। তিনি এবং পত্রিকার মুদ্রক ও প্রকাশক শঙ্করলাল ঘেলাভাই ব্যাঙ্কার—দু’জনেই অভিযোগ স্বীকার করেন। গান্ধীকে ছয় বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ব্যাঙ্কারের সাজা হয় এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা জরিমানা।
স্বাধীন ভারতের সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে বাক্স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠন গড়ার অধিকার এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে এই অধিকারগুলি সুরক্ষিত হয়েছে। গান্ধীর বক্তব্যে উঠে আসা ভিন্নমত প্রকাশের চেতনারই প্রতিফলন দেখা যায় সেখানে।
আদালত জানিয়েছে, মতামত প্রকাশের জন্য জনপথ একটি স্বাভাবিক স্থান। জনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে সমাবেশের অধিকারের উপর যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। কিন্তু পুলিশ নিজের হাতে খেয়ালখুশিমতো ক্ষমতা তুলে নিয়ে সমস্ত সভা-সমাবেশের উপর ঢালাও নিষেধাজ্ঞা চাপাতে পারে না।
১৯৭২ সালে ‘হিমৎ লাল কে শাহ বনাম আমেদাবাদের পুলিশ কমিশনার’ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ বলেছিল, “রাষ্ট্র কেবল এমন বিধি তৈরি করতে পারে, যা প্রত্যেক নাগরিকের সমাবেশের অধিকার প্রয়োগে সহায়ক। জনশৃঙ্খলার স্বার্থে রাষ্ট্র কেবল যুক্তিসংগত বিধিনিষেধই আরোপ করতে পারে। … সংবিধান কার্যকর হওয়ার আগে আইন করে সমবেত হওয়ার অধিকার সংকুচিত করা বা কেড়ে নেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু সংবিধান কার্যকর হওয়ার পরে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপের পথ ছাড়া এই অধিকার সংকুচিত করা যায় না।”
প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে, ২০১৬ সালে, সুপ্রিম কোর্ট ফের জানায়, নিজেদের ক্ষোভ ও অভিযোগ তুলে ধরতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করা মৌলিক অধিকার। শান্তিপূর্ণভাবে প্রকাশ্যে ভিন্নমত জানানোর অধিকারকে এভাবেই আরও একবার দৃঢ় স্বীকৃতি দেয় শীর্ষ আদালত।
‘অনিতা ঠাকুর বনাম জম্মু ও কাশ্মীর সরকার’ মামলায় আদালত বলেছিল, “সংগঠিত, অহিংস প্রতিবাদ মিছিল ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার এখন সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত।”
আদালত আরও জানিয়েছিল, পুলিশের অনুচিত আচরণের ফলে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে ফৌজদারি আইন এবং ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত দেওয়ানি দায়ের পাশাপাশি জনআইনের অধীনেও দায় সৃষ্টি হতে পারে। মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া যেতে পারে।
২০১৬ সালের ওই রায়ে বলা হয়েছিল, মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ‘সার্বভৌম দায়মুক্তি’র নীতি প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ, রাষ্ট্র তার সার্বভৌম ক্ষমতার দোহাই দিয়ে এই দায় এড়াতে পারে না; জনআইনের অধীনে এমন যুক্তিকে আত্মপক্ষসমর্থনের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।