বাংলাস্ফিয়ার: শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার সাধারণ অধিকার থাকলেও, আইনসম্মত প্রতিরোধমূলক নির্দেশ জারি থাকলে কোনও জমায়েতের উপর বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হতে পারে। প্রতিবাদকারীদের কাছে এই বিষয়টির বাস্তব তাৎপর্য রয়েছে।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে দিল্লিতে ধারাবাহিক প্রতিবাদ-বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীতে প্রকাশ্য বিক্ষোভ আয়োজনের নিয়মকানুন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বা আইসার নেতৃত্বে প্রতিবাদ, নাগরিক সমাজের বিক্ষোভ এবং বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের জমায়েত—মধ্য দিল্লিতে এমন একাধিক কর্মসূচির পর বিক্ষোভকারীদের আটক করা হয়েছে, মামলা হয়েছে এবং পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দিল্লি পুলিশ এই কর্মসূচিগুলিকে ‘অনুমতিহীন’ অথবা জারি থাকা বিধিনিষেধের পরিপন্থী বলে বর্ণনা করেছে।

এই প্রতিবাদগুলি আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। নাগরিকদের যদি সমবেত হওয়া এবং প্রতিবাদ জানানোর অধিকার থাকে, তা হলে একটি বিক্ষোভ আয়োজনের আগে দিল্লির একজন সাধারণ বাসিন্দাকে ঠিক কী করতে হয়? পুলিশকে জানানোই কি অনুমতি পাওয়া? যন্তর মন্তর বিক্ষোভের জন্য নির্ধারিত স্থান বলেই কি সেখানে কর্মসূচি করা যায়? পুলিশ অনুমতি না দিলে অথবা বিধিনিষেধ জারি করলে কী হয়? প্রচলিত নিয়ম এবং দিল্লি পুলিশের বর্তমান প্রক্রিয়া কী বলছে, তা দেখে নেওয়া যাক।

পুলিশকে জানানো এবং পুলিশের অনুমতি চাওয়া এক বিষয় নয়। যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের পরিকল্পনা করলে আয়োজকদের সংশ্লিষ্ট এলাকার ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ বা ডিসিপির কাছে আবেদন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকা নয়াদিল্লি পুলিশ জেলা। অন্তত ১০ দিন আগে আবেদন জমা দিতে হয়।

আবেদনে প্রস্তাবিত বিক্ষোভের দিন ও সময়, উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এবং আয়োজনসংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য দিতে হয়। শৃঙ্খলা বজায় রাখা, আরোপিত শর্ত মেনে চলা এবং জমায়েতের দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে পুলিশ আয়োজকদের কাছে অঙ্গীকারপত্রও চাইতে পারে।

এর পরে পুলিশ আবেদনটি মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নেয়—অনুমতি দেওয়া হবে, শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দেওয়া হবে, আবেদন খারিজ করা হবে, নাকি অন্য কোনও স্থানে কর্মসূচি করার পরামর্শ দেওয়া হবে।

সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলির ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বেশ কয়েকটি সংগঠন পুলিশকে এমন চিঠি দিয়েছে, যেগুলিকে তারা ‘অবহিতকরণপত্র’ বা ‘ইন্টিমেশন লেটার’ বলেছে। এই ধরনের চিঠির মাধ্যমে প্রস্তাবিত জমায়েতের কথা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। কিন্তু শুধু ওই চিঠি দেওয়ার ফলে বিক্ষোভের অনুমতি মিলে যায় না।

যন্তর মন্তরে জমায়েতের সংখ্যারও সীমা রয়েছে। ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের পরে আরোপিত বিধিনিষেধ অনুযায়ী, নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলে সর্বোচ্চ ১,০০০ মানুষ জমায়েত করতে পারেন।

পুলিশের মূল্যায়ন কেবল আবেদনপত্রে উল্লেখ করা অংশগ্রহণকারীর সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বাস্তবে কত মানুষ আসতে পারেন, আয়োজক কারা এবং তাঁরা কোন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, প্রতিবাদের বিষয়টি কী, পাল্টা বিক্ষোভের আশঙ্কা রয়েছে কি না এবং যান চলাচল ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতে কী প্রভাব পড়তে পারে—পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ এই সব দিক খতিয়ে দেখে।

একই সময়ে ওই এলাকায় অন্য কোনও বিক্ষোভ হচ্ছে কি না, পর্যাপ্ত পুলিশকর্মী মোতায়েন করা সম্ভব কি না এবং ব্যারিকেড, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার জন্য যথেষ্ট সংস্থান রয়েছে কি না, তা-ও দেখা হয়।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি সমস্যা হল বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার ‘উন্মুক্ত আহ্বান’, বিশেষত সমাজমাধ্যমে। এ ধরনের আহ্বানে শেষ পর্যন্ত কত মানুষ আসবেন, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায় না। জমায়েত পরিচালনার দায়িত্বে কে থাকবেন, সে বিষয়েও অনেক সময় স্পষ্টতা থাকে না।

একেবারে শেষ মুহূর্তে অনুমতি চাইলেও একই ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিক্ষোভের মাত্র এক বা দু’দিন আগে কর্তৃপক্ষের কাছে গেলে প্রস্তাব যাচাই, পুলিশ মোতায়েন, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং ভিড় সামলানোর ব্যবস্থা করার সময় খুব কম থাকে। আধিকারিকদের বক্তব্য, ১০ দিন আগে আবেদন করার নিয়ম থাকলে সম্ভাব্য জমায়েতের পরিসর বুঝে সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়।

আয়োজকদের কাছ থেকে অঙ্গীকারপত্র নেওয়ার উদ্দেশ্যও হল, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বিক্ষোভের জন্য আরোপিত শর্ত মেনে চলার দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা।

কোনও স্থান বিক্ষোভের জন্য নির্ধারিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে সেখানে প্রস্তাবিত প্রতিটি কর্মসূচি আপনা থেকেই অনুমতি পাবে।

২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার স্বীকার করার পাশাপাশি স্পষ্ট করেছিল, এই অধিকারের সঙ্গে জনশৃঙ্খলা, স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকার এবং সর্বসাধারণের ব্যবহার্য স্থান ব্যবহারকারী অন্য মানুষের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। ওই রায়ের পরে দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরে জমায়েতের সর্বোচ্চ সংখ্যা ১,০০০-এ সীমাবদ্ধ করে।

অর্থাৎ, পুলিশকে শুধু প্রতিবাদের অধিকার বিবেচনা করলেই চলে না। প্রস্তাবিত স্থানে সংশ্লিষ্ট জমায়েত নিরাপদে আয়োজন করা সম্ভব কি না, সেটিও দেখতে হয়।

বড় জমায়েতের ক্ষেত্রে কর্মসূচির আকার এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী আয়োজকদের রামলীলা ময়দান বা নারেলা গ্রাউন্ডের মতো জায়গায় যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

পুলিশ আরও জানিয়েছে, দিল্লিতে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের উপর কোনও সার্বিক নিষেধাজ্ঞা নেই। পরিস্থিতি মূল্যায়নের পরে ছোট বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে যন্তর মন্তরের কাছাকাছি কিছু জমায়েতও রয়েছে।

ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা বা বিএনএসএসের ১৬৩ ধারায় সম্ভাব্য বিপদ, জনশান্তি বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা অথবা জননিরাপত্তার অনুরূপ হুমকির পরিস্থিতিতে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিরোধমূলক নির্দেশ জারি করতে পারেন।

সাম্প্রতিক বিক্ষোভ এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষিতে মধ্য দিল্লির কিছু অংশে দিল্লি পুলিশ এই ধারা প্রয়োগ করেছে। যেখানে এই নির্দেশ কার্যকর থাকে, সেখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এবং নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে বিশেষ ধরনের জমায়েত, মিছিল বা অন্যান্য কাজকর্ম নিষিদ্ধ করা যেতে পারে।

সুতরাং, এটি গোটা দিল্লিতে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের উপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা নয়। নির্দিষ্ট নির্দেশে কোন এলাকা, কতটা সময় এবং কী ধরনের কার্যকলাপের উল্লেখ রয়েছে, তার উপর এই বিধিনিষেধের প্রয়োগ নির্ভর করে।

তবে প্রতিবাদকারীদের কাছে এর বাস্তব তাৎপর্য গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার সাধারণ অধিকার থাকলেও, আইনসম্মত প্রতিরোধমূলক নির্দেশের আওতায় কোনও জমায়েতের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া অথবা এই ধরনের বিধিনিষেধ অমান্য করে বিক্ষোভ আয়োজন করলে কিংবা তাতে অংশ নিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।