বাংলাস্ফিয়ার: রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে নিরপেক্ষ দূরত্ব বজায় রাখার নীতিই ছিল এই প্রত্যাখ্যানের ভিত্তি। প্রধান বিচারপতি তাঁর চিঠিতে জোর দিয়ে বলেছেন, বিচার বিভাগ সাংবিধানিক সীমারেখা অস্পষ্ট করে দিতে পারে না।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের আটক এবং দিল্লির প্রধান সড়কগুলি অবরুদ্ধ করে রাখার বিষয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন বিরোধী নেতারা। সেই উদ্দেশ্যে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে সাক্ষাতের আবেদন জানিয়েছিলেন তাঁরা। প্রধান বিচারপতি সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন।
রাজনৈতিক বিতর্কের জটিল পরিসর থেকে নিরপেক্ষ দূরত্ব বজায় রাখার নীতির ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত। প্রধান বিচারপতির চিঠিতে স্পষ্ট করা হয়েছে, বিচার বিভাগ সাংবিধানিক সীমারেখা ঝাপসা করে দিতে পারে না।
১০ অক্টোবর রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে চিঠি দেন। অন্য এক সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ, অর্থাৎ মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে বিরোধী নেতৃত্বের সরাসরি দেশের সর্বোচ্চ বিচারবিভাগীয় পদাধিকারীর দ্বারস্থ হওয়া ছিল এক বিরল ও ঐতিহাসিক ঘটনা।
দুই নেতার যৌথ লেটারহেডে লেখা সংক্ষিপ্ত আবেদনটিতে বলা হয়েছিল, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং ভারতের নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে তাঁরা প্রধান বিচারপতির কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দিতে চান। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত নাগরিকদের উপর পুলিশের নৃশংস দমনপীড়নের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবেদনটি পাঠানো হয়। তাতে বলা হয়, ছাত্রছাত্রীদের নির্বিচার গ্রেফতার, মেট্রো স্টেশন বন্ধ, ট্রেন বাতিল এবং রাস্তায় ব্যারিকেড বসানোর ফলে দিল্লিতে “অবরুদ্ধ নগরীর পরিবেশ” তৈরি হয়েছে।
১১ অক্টোবর রাহুল গান্ধী প্রধান বিচারপতিকে দ্বিতীয় একটি বিস্তারিত আবেদন পাঠান। সেখানে তিনি সংবিধান এবং প্রত্যেক নাগরিকের ভোটদানের মৌলিক অধিকারের রক্ষক হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। ভোটার তালিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বিগ্ন কোটি কোটি ভোটারের হয়ে, লোকসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে চিঠিটি লিখেছিলেন রাহুল। তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০২৩ সালের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ, চাকরির শর্ত এবং কার্যকালের মেয়াদ সংক্রান্ত আইনের ৭ নম্বর ধারায় গঠিত বাছাই কমিটিরও সদস্য তিনি।
রাহুল জানান, ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ওই কমিটির বৈঠকে জ্ঞানেশ কুমারকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে বেছে নেওয়ার জন্য অনুসৃত পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ভিন্নমত নথিভুক্ত করেছিলেন।
আবেদনটিতে অভিযোগ করা হয়, এসআইআর প্রক্রিয়ায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার খামখেয়ালি ও একতরফাভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন। রাহুল প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করেন, তাঁর এই আবেদনকে জনস্বার্থে দায়ের করা পত্র-আবেদন হিসেবে গ্রহণ করা হোক।
নির্বাচন কমিশনের কাছে থাকা এসআইআর-সংক্রান্ত সমস্ত নথি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়ার আর্জিও জানান তিনি। পাশাপাশি, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্টের কোনও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন কমিটি গঠনের দাবি করেন। সেই কমিটি এসআইআর চলাকালীন নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি পর্যালোচনা করবে এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিরীক্ষা করবে। অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে গোটা এসআইআর প্রক্রিয়া স্থগিত রাখারও আবেদন জানান রাহুল।
১২ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি সাক্ষাৎ চেয়ে পাঠানো ১০ অক্টোবরের চিঠির জবাব দেন। তবে রাহুলের ১১ অক্টোবরের পরবর্তী আবেদনটির সরাসরি উল্লেখ তাঁর জবাবে ছিল না।
খাড়গে ও রাহুলকে সম্বোধন করে লেখা চিঠিতে প্রধান বিচারপতি ১২ অক্টোবর বিকেল ৪টে থেকে ৫টার মধ্যে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার জন্য সাক্ষাতের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি জানান, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার-সংক্রান্ত বিষয়, নির্বিচার গ্রেফতার, মেট্রো বন্ধ এবং ট্রেন বাতিলের মতো প্রশ্নগুলি ইতিমধ্যেই আদালতে বিচারাধীন।
প্রধান বিচারপতি লেখেন, “সুতরাং বিচারাধীন মামলাগুলি নিয়ে আলোচনার জন্য বৈঠক ডাকা ক্ষমতার পৃথকীকরণের নীতিকে সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন করবে। এই নীতি ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক কাঠামো তত্ত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমন বৈঠক প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতা ও বিচারবিভাগীয় শিষ্টাচারের সঙ্গেও অসংগত হবে।”
দু’পাতার জবাবে তিনি বিরোধী নেতাদের আরও মনে করিয়ে দেন, তাঁদের চিঠিতে উত্থাপিত বিষয়গুলি মোকাবিলা করার মতো প্রশাসনিক ক্ষমতা সাংবিধানিক কাঠামো সুপ্রিম কোর্টকে দেয়নি। তবে ভারতের নাগরিকদের প্রভাবিত করে এমন গুরুতর বিষয়গুলি বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা সুপ্রিম কোর্টের কর্তব্য।
প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও সুরক্ষার প্রতি আদালতের দায়বদ্ধতার কথাও পুনরায় জানান প্রধান বিচারপতি। সূর্য কান্ত বলেন, আইনস্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে নাগরিকেরা “যে কোনও সময়ে এই অধিকারগুলি কার্যকর করার প্রতিকার চাইতে পারেন”।
দুই বিরোধী নেতাকে তাঁর পরামর্শ ছিল, “প্রশাসনিক স্তরে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার পরিবর্তে সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক ক্ষমতার আশ্রয় নেওয়াই আপনাদের পক্ষে অধিকতর উপযুক্ত হবে।”
প্রধান বিচারপতি জানান, একই ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করা কয়েকটি আবেদন ১৩ অক্টোবর শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত রয়েছে। আইনি পরামর্শ নিয়ে বিরোধী নেতারা ১২ অক্টোবরই নিজেদের আবেদন দাখিল করতে পারেন। তিনি আশ্বাস দেন, “এ ধরনের যে কোনও আবেদনের শুনানি আইন অনুসারে যথাসম্ভব দ্রুত করা হবে।”
এর পরে রাহুল গান্ধী এবং আরও ১২ জন বিরোধী নেতা একটি রিট আবেদন দাখিল করেন। সেটি যথাযথভাবে নথিভুক্ত হয়েছে, মামলা নম্বরও দেওয়া হয়েছে এবং বিচারিক শুনানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
প্রধান বিচারপতির জবাবের কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি বিষয়—ক্ষমতার পৃথকীকরণের নীতি, বিচারাধীন বিষয় নিয়ে বিধিনিষেধ ও বিচারবিভাগীয় শিষ্টাচার এবং বেঙ্গালুরু নীতিমালা।
সূর্য কান্তের জবাবে বলা হয়েছে, ক্ষমতার পৃথকীকরণ শাসনব্যবস্থাকে তিনটি স্বতন্ত্র অঙ্গে ভাগ করে—আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। এই পৃথকীকরণ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর এমন একটি অংশ, যা পরিবর্তন করা যায় না।
আদালত একটি নিরপেক্ষ মীমাংসাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। তার নির্দিষ্ট দায়িত্ব হল নিরপেক্ষভাবে বিরোধের নিষ্পত্তি করা, আইন প্রয়োগ করা এবং প্রতিষ্ঠিত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাসন বিভাগ বা আইন বিভাগের পদক্ষেপ পর্যালোচনা করা। সরকারি নীতি বা শাসনসংক্রান্ত দাবিদাওয়ায় একতরফাভাবে হস্তক্ষেপ করার মতো নির্বাহী কিংবা প্রশাসনিক তদারকির ক্ষমতা বিচার বিভাগের নেই।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার-সংক্রান্ত মামলাগুলির শুনানি যে বেঞ্চে হচ্ছে, তার নেতৃত্বেও রয়েছেন প্রধান বিচারপতি। সেই অবস্থায় আদালতের বাইরে বিরোধী নেতাদের সঙ্গে তাঁর আলাদা বৈঠক ন্যায়সংগত আচরণের পরিপন্থী এবং যথাযথ প্রক্রিয়াগত ন্যায্যতাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হবে। আদালতকক্ষের বাইরে রাজনৈতিক পক্ষগুলির সঙ্গে পৃথক সাক্ষাৎ বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ করে এবং পক্ষপাতের ধারণা তৈরি করে।
বিরোধের নিষ্পত্তি হতে হবে প্রকাশ্য আদালতে, স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়ায়। সেখানে স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতি অনুসারে বিপরীত পক্ষগুলিকেও নিজেদের বক্তব্য জানানোর সমান সুযোগ দিতে হবে।
বিচারকদের আচরণসংক্রান্ত বেঙ্গালুরু নীতিমালায়—‘ব্যাঙ্গালোর প্রিন্সিপলস অব জুডিশিয়াল কনডাক্ট’—বিচারকদের জন্য নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারিত রয়েছে। তার অন্যতম শর্ত, বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে জনসাধারণের ধারণা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমন কোনও অনুচিত আচরণ বিচারকদের এড়িয়ে চলতে হবে।
২০২৪ সালে গণেশ চতুর্থীর পুজোয় অংশ নিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় চন্দ্রচূড়ের বাসভবনে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার ধারণা তৈরি হওয়ায় সেই সফর প্রকাশ্যে সমালোচিত হয়েছিল।
কর্মরত বিচারপতিদের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করার ঐতিহাসিক নজিরও রয়েছে। ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় ফেরার পরে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন বিচারপতি পি এন ভগবতী। বিচারপতি এম আর শাহ প্রধানমন্ত্রী মোদীকে “আদর্শ ও নায়ক” বলে বর্ণনা করেছিলেন বলেও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। একইভাবে, সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অরুণ মিশ্র প্রকাশ্যে মোদীকে “বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী” এবং “আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত এমন এক দূরদর্শী নেতা, যিনি বিশ্বজনীন চিন্তা করতে পারেন এবং স্থানীয় স্তরে তা কার্যকর করতে পারেন” বলে বর্ণনা করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন।
অন্য এক সময়ে, বিমস্টেক সম্মেলনের ফাঁকে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের আমন্ত্রণে সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। অবসর গ্রহণের পরে বিচারপতি গগৈ রাজ্যসভায় মনোনীত হন।
ঘটনাচক্রে, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে যে চার জন প্রবীণ বিচারপতি নজিরবিহীন সাংবাদিক বৈঠক করেছিলেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন গগৈ। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের অধীনে মামলা বণ্টনে শাসন বিভাগের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ সামনে এনেছিলেন তাঁরা।
ইতিহাস দেখিয়েছে, রাজনীতি ও বিচার বিভাগের সংঘাতের অস্বস্তিকর পরিণতি হতে পারে। সংসদের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতায় সীমা টেনে মৌলিক কাঠামোর তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল ঐতিহাসিক কেশবানন্দ ভারতী মামলার রায়। তার পরে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার বিচারপতি জে এম শেলাট, কে এস হেগড়ে এবং এ এন গ্রোভারকে ডিঙিয়ে বিচারপতি এ এন রায়কে ভারতের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করে। এর প্রতিবাদে ওই তিন বিচারপতি অবিলম্বে পদত্যাগ করেন।
কয়েক দশক পরে বিচারপতি নিয়োগকে শাসন বিভাগের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজন থেকেই শেষ পর্যন্ত কলেজিয়াম ব্যবস্থার উদ্ভব এবং বেঙ্গালুরু নীতিমালা গ্রহণের পথ তৈরি হয়।