বাংলাস্ফিয়ার: উৎসবের মরসুমে ব্যবসায়ীদের আপত্তির মুখে ইউপিআই লেনদেনে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর চালুর দিন পিছিয়ে দিল ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া (এনপিসিআই)। মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ২,০০০ টাকার বেশি নির্দিষ্ট ইউপিআই লেনদেনে এই মাশুল কার্যকর হওয়ার কথা ছিল ১৫ অক্টোবর। মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, এনপিসিআই জানিয়েছে, তা চালু হবে ‘দীপাবলির অব্যবহিত পরে’। তবে নির্দিষ্ট তারিখ এখনও ঘোষণা করা হয়নি। পরবর্তী বিজ্ঞপ্তিতে সেই তারিখ জানানো হবে।

এনপিসিআইয়ের ইউপিআই অ্যান্ড সার্ভিসেস স্টিয়ারিং কমিটি উৎসবের মরসুমের কথা বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলি সরকারকে জানিয়েছিল, এই কেনাকাটার সময়ে নতুন মাশুল বসলে বিক্রিতে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষত পোশাক, বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম এবং গৃহস্থালির সামগ্রীর বাজারে এই সময়ে লেনদেন বাড়ে। সেই ব্যস্ততার মধ্যে লেনদেনের খরচ ও হিসাবরক্ষণে পরিবর্তন আনা নিয়েও উদ্বেগ ছিল। ফলে সময় পিছোনোর সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতির বাড়তি সুযোগ পাবেন।

এমডিআর হল ডিজিটাল মাধ্যমে ক্রেতার দেওয়া টাকা গ্রহণ ও সেই লেনদেন সম্পন্ন করার জন্য ব্যবসায়ীর প্রদেয় মাশুল। ঘোষিত কাঠামো অনুযায়ী, আওতাভুক্ত ব্যবসায়ীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টভিত্তিক ইউপিআই লেনদেনে ২,০০০ টাকার বেশি অর্থের উপর ০.৪ শতাংশ হারে মাশুল বসবে। প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ মাশুল ৩০০ টাকা। অর্থাৎ, সাধারণ হারে ৫,০০০ টাকার কেনাকাটায় ব্যবসায়ীর মাশুল হবে ২০ টাকা।

তবে সমস্ত ইউপিআই লেনদেন এই মাশুলের আওতায় আসছে না। বন্ধু বা পরিবারের কাউকে টাকা পাঠানোর মতো ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির লেনদেন এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। ২,০০০ টাকা পর্যন্ত ব্যবসায়িক পেমেন্টও মাশুলমুক্ত থাকবে। ছাড়প্রাপ্ত ছোট ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও মাশুল লাগবে না। কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের প্রকাশিত প্রশ্নোত্তরে বলা হয়েছে, ব্যবসায়ীরা এমডিআরের খরচ আলাদা করে ক্রেতার উপর চাপাতে পারবেন না। ফলে দোকানে ইউপিআই ব্যবহার করলেই ক্রেতাকে অতিরিক্ত টাকা দিতে হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়।

এর আগে অল ইন্ডিয়া মোবাইল রিটেলার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং অল ইন্ডিয়া কনজিউমার প্রোডাক্টস ডিস্ট্রিবিউটর্স ফেডারেশন মাশুল চালু পিছোনোর দাবি জানিয়েছিল। ছোট ব্যবসায়ীদের ছাড়ের সীমা বাড়ানো এবং এক ব্যবসায়ী থেকে অন্য ব্যবসায়ীর লেনদেনে ছাড় দেওয়ার দাবিও ছিল। ৩০ সেপ্টেম্বর অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের সঙ্গে বৈঠকের পরে সংগঠনগুলি ২ অক্টোবরের প্রস্তাবিত ‘নো ইউপিআই ডে’ কর্মসূচি প্রত্যাহার করে। সেই আলোচনার পরেই এবার কার্যকর হওয়ার দিন পিছোল।

অন্যদিকে, ব্যাঙ্ক ও পেমেন্ট সংস্থাগুলির বক্তব্য, বিপুল সংখ্যক ইউপিআই লেনদেন চালানোর পরিকাঠামোর ব্যয় মেটাতে স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন। এনপিসিআইয়ের প্রধান দিলীপ আসবে জানিয়েছিলেন, এই ব্যবস্থার বার্ষিক পরিচালনব্যয় প্রায় ২১,০০০ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত মাশুল থেকে প্রথম বছরে ১৩,০০০ থেকে ১৫,০০০ কোটি টাকা আসতে পারে। প্রযুক্তি উন্নয়ন, জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং ক্রমবর্ধমান লেনদেন সামলানোর ক্ষমতা বাড়াতে এই আয় কাজে লাগানোর প্রত্যাশা রয়েছে।

লেনদেনের সংখ্যার বিচারে ৯৫ শতাংশের বেশি ব্যবসায়িক ইউপিআই পেমেন্ট মাশুলমুক্ত থাকার কথা। কিন্তু বড় অঙ্কের কেনাকাটার মোট আর্থিক মূল্য যথেষ্ট বেশি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের উদ্বেগও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এখানে দ্বন্দ্বটি মূলত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালানোর খরচ এবং ব্যবসায়ীদের লেনদেনের ব্যয়ের মধ্যে। উৎসবের সময়ে মাশুল স্থগিত রাখায় আপাতত চাপ কমল। তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির অন্যান্য দাবি মেনে মূল কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

এনপিসিআইয়ের সর্বশেষ ঘোষণা তাই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের ঘোষণা নয়, কার্যকর করার সময়সূচিতে পরিবর্তন। দীপাবলির কেনাকাটার সময়ে পুরনো ব্যবস্থাই চলবে; এরপর ব্যবসায়ী, ব্যাঙ্ক এবং পেমেন্ট সংস্থাগুলিকে নতুন বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আপাতত নজর থাকবে নতুন তারিখ ঘোষণার দিকে। পাশাপাশি বাস্তবে মাশুল আদায়ের পদ্ধতি সম্পর্কে ব্যবসায়ীদের কাছে পরিষ্কার তথ্য পৌঁছনোও জরুরি। উৎসবের সাময়িক স্বস্তির পরে ডিজিটাল লেনদেনের খরচ নিয়ে বিতর্ক যে চলবে, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির দাবিতেই তার ইঙ্গিত রয়েছে।