বাংলাস্ফিয়ার: কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব এবং রাজ্যসভার সদস্যপদ থেকে ইস্তফার ঘোষণা করলেন এল. মুরুগান। মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর তাঁর এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে দীপাবলির আগেই নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভায় রদবদলের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংসদীয় বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা মুরুগান জানিয়েছেন, তিনি তামিলনাড়ুতে বিজেপির সংগঠন শক্তিশালী করার কাজে পুরো সময় দিতে চান। তবে মন্ত্রিসভায় রদবদলের কোনও নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। এই ঘোষণায় কেন্দ্রীয় রাজনীতির পাশাপাশি নজর ফিরেছে তামিলনাড়ুর দিকেও।
প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে মুরুগান নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য তিনি তামিলনাড়ুর গ্রামে গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায় যেতে চান। সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং দলীয় কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোই হবে তাঁর কাজের প্রধান লক্ষ্য। সেই কারণেই কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি এবং রাজ্যসভার সদস্যপদ ছাড়ার অনুমতি চেয়েছেন তিনি। দিল্লির প্রশাসনিক দায়িত্ব ছেড়ে রাজ্যের সংগঠনে মন দেওয়ার ইচ্ছাই তাঁর প্রকাশ্য অবস্থান।
নিজের সামাজিক পটভূমির কথাও চিঠিতে তুলে ধরেছেন মুরুগান। দৈনিক মজুরের সন্তান হিসেবে তাঁর বেড়ে ওঠা এবং সেখান থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদে পৌঁছনোর অভিজ্ঞতাকে জীবনের বিরাট প্রাপ্তি বলে বর্ণনা করেছেন। মোদীর নেতৃত্বে দেশ ও তামিলনাড়ুর সেবা করার সুযোগের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, এবার সরাসরি মানুষের কাছে গিয়ে দলকে আরও শক্তিশালী করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে চান। এই লক্ষ্যের সঙ্গেই আগামী লোকসভা নির্বাচনের প্রস্তুতিকে যুক্ত করেছেন।
মুরুগানের পদত্যাগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ রাজ্যসভায় তাঁর মেয়াদ এখনই শেষ হওয়ার কথা ছিল না। তামিলনাড়ুর নেতা হলেও তিনি মধ্যপ্রদেশ থেকে উচ্চকক্ষে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম রাজ্যসভার সদস্য হন; ২০২৪ সালের এপ্রিলে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পরে তাঁর মেয়াদ ছিল ২০৩০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। ফলে এই প্রস্থান মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার স্বাভাবিক ঘটনা নয়। প্রায় সাড়ে তিন বছর বাকি থাকতেই নিজের সংসদীয় অবস্থান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
মধ্যপ্রদেশের আসনটির রাজনৈতিক গুরুত্ব এখানে বোঝা দরকার। ওই রাজ্যের বিধানসভায় বিজেপির শক্তির কারণে মুরুগানের ছেড়ে যাওয়া আসনে দলের প্রার্থীর জয়ের পথ সুগম। সেই আসন দিয়ে নতুন কাউকে সংসদে এনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদে জায়গা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কে প্রার্থী হবেন বা তাঁকে মন্ত্রী করা হবে কি না, তা এখনও জানা যায়নি। সুযোগ তৈরি হওয়া আর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার মধ্যে ব্যবধান রয়েছে।
ইতিমধ্যেই কয়েকজন মন্ত্রীর প্রস্থান এবং অন্যদের সংসদীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার ঘটনা রদবদলের আলোচনাকে উসকে দিয়েছে। দ্য হিন্দুর উদ্ধৃত অংশে জর্জ কুরিয়ান, রবনীত সিং বিট্টু, হরদীপ সিং পুরী এবং বি. এল. বর্মার নাম রয়েছে। পিটিআই জানিয়েছে, রাজ্যসভায় নতুন করে মনোনয়ন না পাওয়ার পরে কুরিয়ান জুনে এবং বিট্টু জুলাইয়ে মন্ত্রিত্ব ছেড়েছিলেন। তাঁদের পরে মুরুগানের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রীদের সারিতে আরও একটি পরিবর্তন আনল।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। উত্তরপ্রদেশের রাজ্যসভা নির্বাচনে পুনরায় মনোনয়ন না পেলেও পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী তখনও মন্ত্রিসভায় রয়েছেন। একইভাবে বি. এল. বর্মাও নিজের মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তাঁদের দুজনের পদও ইতিমধ্যে খালি হয়ে গিয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বিদায় নিয়েছেন কারা এবং কাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে, এই দুই তালিকা এক নয়।
শিক্ষামন্ত্রকের পরিবর্তনও এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের অংশ। ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিদায়ের পরে ওই দফতরের দায়িত্ব কীভাবে স্থায়ীভাবে সাজানো হবে, তা সম্ভাব্য রদবদলের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। সাউথ ফার্স্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ে প্রধানের পদত্যাগের পরে প্রহ্লাদ জোশীকে শিক্ষামন্ত্রকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ফলে নতুন মুখ অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি ইতিমধ্যে অতিরিক্ত দায়িত্বে চলা দফতরের কাজ পুনর্বণ্টনের প্রশ্নও সামনে রয়েছে।
সরকার ও দলের দায়িত্বের সমন্বয়ের বিষয়টিও নজরে রয়েছে। পঙ্কজ চৌধুরী এবং হর্ষ মালহোত্রা যথাক্রমে উত্তরপ্রদেশ ও দিল্লি বিজেপির সভাপতি হওয়ার পরেও কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। সম্ভাব্য রদবদলে তাঁদের ভূমিকা বদলাবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত ঘোষণা নেই। তবে এমন দ্বৈত দায়িত্ব থাকায় মন্ত্রিপরিষদের বিন্যাস নিয়ে আলোচনায় দলের সাংগঠনিক প্রয়োজনও স্বাভাবিকভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
দীপাবলির আগে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে দ্য উইকও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাদের বিবরণে, কয়েকটি পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে ঘিরেই জল্পনা বেড়েছে। তবে আগে সরকারের শীর্ষ সূত্র রদবদলের সম্ভাবনা উড়িয়েও দিয়েছিল। ফলে মুরুগানের ইস্তফাকে রদবদলের নিশ্চিত ঘোষণা হিসেবে দেখা যাবে না। কোনও মন্ত্রী সরে গেলে তাঁর দায়িত্ব অন্য কাউকে দেওয়া এবং গোটা মন্ত্রিপরিষদ নতুনভাবে সাজানো পৃথক সিদ্ধান্ত; শেষ পর্যন্ত কতটা পরিবর্তন হবে, সেটিই এখন প্রশ্ন।
রাজনৈতিক বিচারে মুরুগানের সিদ্ধান্তের দুটি দিক স্পষ্ট। একদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারে তাঁর দায়িত্ব এবং মধ্যপ্রদেশের রাজ্যসভা আসন ঘিরে নতুন ব্যবস্থা করার প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, তিনি নিজের ভবিষ্যৎ কাজের ক্ষেত্র হিসেবে তামিলনাড়ুর সংগঠনকে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর বক্তব্য থেকে এটুকু বোঝা যায় যে রাজ্যে দলের উপস্থিতি বাড়ানোকে তিনি অগ্রাধিকার দিতে চাইছেন। তবে এই সিদ্ধান্তের পিছনে অপ্রকাশিত দলীয় বিরোধ বা অসন্তোষ রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এখন নজর থাকবে মুরুগানের পরবর্তী সাংগঠনিক দায়িত্ব, তাঁর রাজ্যসভা আসনে বিজেপির প্রার্থী নির্বাচন এবং কেন্দ্রীয় দফতরগুলির দায়িত্ব বণ্টনের দিকে। এই সিদ্ধান্তগুলি একসঙ্গে নেওয়া হলে বৃহত্তর পুনর্বিন্যাসের ছবি স্পষ্ট হবে। আপাতত নিশ্চিত খবর মুরুগানের সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা এবং তামিলনাড়ুতে পূর্ণসময়ের দলীয় কাজে ফেরার ইচ্ছা। দীপাবলির আগে মন্ত্রিসভার নতুন চেহারা দেখা যাবে কি না, তার উত্তর দেবে সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত।