নয়াদিল্লি, ১৪ অক্টোবর: পরীক্ষার বহু আগে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নপত্র তৈরি করে রাখার প্রয়োজন কী? তার বদলে বিপুল প্রশ্নভান্ডার থেকে পরীক্ষার ঠিক আগে প্রশ্নপত্র তৈরি করা হোক। প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে এমনই প্রস্তাব দিলেন পরীক্ষা সংস্কার সংক্রান্ত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্ক ফোর্সের প্রধান নন্দন নিলেকানি। মঙ্গলবার দিল্লিতে ব্লুমবার্গ নিউ ইকনমি ফোরামে ইনফোসিসের সহপ্রতিষ্ঠাতা এই ভাবনার কথা জানান।

নিলেকানির যুক্তি, আগে থেকেই চূড়ান্ত প্রশ্নপত্র তৈরি থাকলে সেটি চুরি করে বিক্রির আর্থিক প্রলোভন তৈরি হয়। কোন প্রশ্নগুলি পরীক্ষায় আসবে, তা আগাম জানা থাকাই এই অবৈধ ব্যবসার ভিত্তি। একটি বড় প্রশ্নভান্ডার থেকে একেবারে শেষ মুহূর্তে প্রশ্ন বেছে নিলে নির্দিষ্ট প্রশ্নপত্র আগাম হাতানোর সুযোগ কমবে। তাঁর মতে, এভাবে প্রশ্নফাঁসের পিছনে থাকা আর্থিক উৎসাহই দূর করা সম্ভব। ফলে প্রশ্নপত্র চূড়ান্ত হওয়া এবং পরীক্ষা শুরু হওয়ার মধ্যবর্তী সময় যত কমবে, আগাম পাচারের সম্ভাবনাও তত সংকুচিত হবে।

প্রশ্নফাঁসকে সমাধানযোগ্য সমস্যা বলেই মনে করেন নিলেকানি। তাঁর বক্তব্য, সমস্যাটির মূল কারণ চিহ্নিত করে গোটা ব্যবস্থাকে বিচার করতে হবে এবং প্রযুক্তির সাহায্য নিতে হবে। পরীক্ষার দিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে প্রশ্নপত্র তৈরি করা সম্ভব কি না, জানতে চাওয়া হলে তিনি ইতিবাচক উত্তর দেন। তবে টাস্ক ফোর্সের চূড়ান্ত সুপারিশের বিস্তারিত তিনি প্রকাশ করেননি।

নিটের প্রশ্নফাঁস বিতর্ক এবং ছাত্রবিক্ষোভের পটভূমিতে এই সংস্কার উদ্যোগ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে আন্দোলনের পর ২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ইস্তফা দেন। পরদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ছয় সদস্যের টাস্ক ফোর্স ঘোষণা করেন। কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছিল।

প্রশ্নভান্ডার তৈরির পক্ষে সুপারিশ করেছে একটি সংসদীয় কমিটিও। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির সংস্কার সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশ্নের সংগ্রহ হতে হবে বড়, বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং নিয়মিত হালনাগাদ করা। পরীক্ষার অল্প আগে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সেখান থেকে প্রশ্ন বাছাই করা যেতে পারে; বিশেষজ্ঞরা তা যাচাই করবেন। উদ্দেশ্য, প্রশ্নপ্রণেতারাও যাতে আগে থেকে চূড়ান্ত প্রশ্নপত্রের বিষয়বস্তু জানতে না পারেন।

কম্পিউটারে পরীক্ষা নেওয়ার পরিকাঠামো বাড়ানোর প্রস্তুতিও চলছে। সরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে মানসম্মত পরীক্ষাকেন্দ্র গড়ার জায়গা খুঁজতে এআইসিটিইকে বলেছে এনটিএ। এক সরকারি আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি মাসের শেষেই টাস্ক ফোর্সের রিপোর্ট জমা পড়ার কথা। ইতিমধ্যে কমিটি প্রায় ১৮টি বৈঠক এবং ৪০টি পরামর্শসভা করেছে। বিভিন্ন মহল থেকে জমা পড়েছে ৫০ হাজারের বেশি পরামর্শ। নিলেকানির দাবি, কমিটির সুপারিশ কার্যকর করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আগ্রহী; ব্যবস্থাগত সমস্যাগুলির সমাধানই তাঁদের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

নিলেকানি কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষাকেন্দ্রের বিস্তারেও জোর দিয়েছেন। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় দেড় লক্ষ স্থানে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে; সেই ব্যবস্থা আরও প্রসারিত করতে হবে। তবে নতুন পদ্ধতি সফল করতে নির্ভরযোগ্য কম্পিউটার, নিরাপদ সফটওয়্যার, বিদ্যুৎ, প্রয়োজনীয় ইন্টারনেট সংযোগ এবং প্রশিক্ষিত কর্মী প্রয়োজন। ছোট শহর ও গ্রামের পরীক্ষার্থীদের কাছেও উপযুক্ত কেন্দ্র পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি সমান জরুরি।

প্রস্তাবটির বাস্তবায়নে আরও কিছু প্রশ্ন রয়েছে। প্রশ্নভান্ডার নিজেই কতটা সুরক্ষিত থাকবে, অনধিকার প্রবেশ কীভাবে ঠেকানো হবে এবং আলাদা প্রশ্নপত্রের কঠিনতার মান সমান থাকবে কি না—এসবের উত্তর প্রয়োজন। পরীক্ষার সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে বা কম্পিউটার বিকল হলে পরীক্ষার্থীর জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে, সেটিও নির্দিষ্ট করতে হবে। অর্থাৎ, প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে প্রশ্নের গুণমান, পরীক্ষার নিরাপত্তা এবং প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টিও জড়িয়ে রয়েছে।

আপাতত এটি বিবেচনাধীন প্রস্তাব; নিটের পরীক্ষাপদ্ধতি বদলে গিয়েছে, এমন কোনও ঘোষণা হয়নি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় প্রশ্নপত্র তৈরি কিংবা সম্পূর্ণ কম্পিউটারভিত্তিক নিট চালুর নির্দিষ্ট দিনও জানানো হয়নি। টাস্ক ফোর্সের রিপোর্ট, সরকারের সিদ্ধান্ত এবং বাস্তব পরিকাঠামোর প্রস্তুতির উপরেই নির্ভর করবে পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ।