তারকা, গায়ক ও রাজনীতিকদের বারবার নিশানা করা জেলবন্দি গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই এবং বিদেশে ছড়িয়ে থাকা তার সহযোগীদের নেটওয়ার্ক ফের আলোচনার কেন্দ্রে। রবিবার মুম্বইয়ে অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে তিন হামলাকারী গুলি চালানোর পর এই অপরাধচক্রের কার্যকলাপ নতুন করে সামনে এসেছে। সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে হামলার দায় স্বীকার করেছে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের দুই সন্দেহভাজন সদস্য।

শ্রফের আগে এই আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের নিশানায় এসেছেন বলিউড তারকা সলমন খান, রণবীর সিংহ, আমির খান এবং পরিচালক রোহিত শেট্টি। জনপ্রিয় পঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসেওয়ালাকে ২০২২ সালের মে মাসে এবং মহারাষ্ট্রের রাজনীতিক বাবা সিদ্দিকিকে ২০২৪ সালের অক্টোবরে হত্যা করা হয়।

আমেরিকায় থাকা অনিল পণ্ডিত শ্রফের উপর হামলার দায় স্বীকার করেছে। ইদানীং সে গ্যাংয়ের হয়ে নিজেকে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। উদ্দেশ্য, আমেরিকায় বিষ্ণোইয়ের অন্যতম প্রধান সহযোগী সতবিন্দর সিংহ ওরফে গোল্ডি ব্রারের দিক থেকে নজর ঘোরানো। মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই ব্রারের খোঁজ করছে।

গোয়েন্দা আধিকারিকদের বক্তব্য, শ্রফকে নিশানা করার বিষয়ে সমাজমাধ্যমে পণ্ডিতের দায় স্বীকারের দাবি আপাতদৃষ্টিতে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে। তবে তদন্তকারীরা বৃহত্তর নেটওয়ার্কটিও খতিয়ে দেখছেন। তার মধ্যে রয়েছে এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহারের অভিযোগ এবং শুটারদের কাছে বিদেশে তৈরি অত্যাধুনিক অস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি।

এফবিআই এই অপরাধচক্রকে ‘লরেন্স বিষ্ণোই অর্গানাইজড ক্রাইম গ্রুপ’ বা ওসিজি নামে চিহ্নিত করেছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে কাজ চালানো, বিদেশে বসে স্থানীয় শুটার নিয়োগ করা এবং পরিচিত ব্যক্তিদের নিশানা করে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে তাঁদের কাছ থেকে টাকা আদায় করার সক্ষমতা দেখিয়েছে এই গ্যাং। সেই অর্থেই চলে অপরাধচক্রের কাজকর্ম।

কে এই অনিল পণ্ডিত?

হরিয়ানার পানিপতের রাইর কালান গ্রামের বাসিন্দা অনিল পণ্ডিতের বয়স ৩২। মনে করা হচ্ছে, ২০২৩ সালে ভারত থেকে পালিয়ে সে প্রথমে তাইল্যান্ড, পরে কানাডা এবং শেষ পর্যন্ত আমেরিকায় পৌঁছয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে আমেরিকায় দায়ের হওয়া একটি অভিযোগপত্র অনুযায়ী, গ্যাংস্টার রণদীপ মালিক এবং কানাডায় থাকা রবিন্দর সিংহ ধান্ডার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। ধান্ডা লরেন্স বিষ্ণোই অপরাধচক্রের সঙ্গে কাজ করে।

ভারতীয় তদন্তকারীদের বক্তব্য, পণ্ডিত ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কাজ চালায়। গোল্ডি ব্রারের সঙ্গেও তার যোগাযোগ রয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। শ্রফকে নিশানা করার আগে চলতি বছরে একাধিক গুলিচালনা ও তোলাবাজির ঘটনায় তার নাম উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে পশ্চিম দিল্লিতে গায়ক গুরু রণধাওয়ার সঙ্গে যুক্ত এক জিমমালিককে লক্ষ্য করে গুলিচালনা, পুণের একটি গয়নার শোরুমে গুলি এবং ভিওয়াড়ি ও সোনিপতে দু’টি হামলা।

দিল্লি ও হরিয়ানা পুলিশ এই ঘটনাগুলির তদন্ত করছে। শুটারদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিদেশে তৈরি অস্ত্র তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ‘সিগন্যাল’ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কে হরমন সান্ধু?

সাম্প্রতিক হামলায় আর এক গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহভাজন হরমনবীর সিংহ ওরফে হরমন সান্ধু। জুন মাসে এফবিআইয়ের ‘ওয়ান্টেড’ তালিকাতেও তার নাম ওঠে। বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সঙ্গে কাজ করা রবিন্দর ধান্ডার নেটওয়ার্কের সদস্য সান্ধুকে জুলাইয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় এফবিআই হেফাজতে নিয়েছিল বলে জানা যায়। এই পরিস্থিতিতে শ্রফের গাড়িতে গুলিচালনার ঘটনায় তার নাম কী ভাবে উঠে এল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

২৩ জুন ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে অবস্থিত সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট অব ক্যালিফোর্নিয়ার মার্কিন জেলা আদালত সান্ধুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল মাদক বিতরণ এবং বিতরণের উদ্দেশ্যে মাদক নিজের কাছে রাখার ষড়যন্ত্র, মাদক রফতানির ষড়যন্ত্র এবং বিতরণের উদ্দেশ্যে মাদক নিজের কাছে রাখা।

তদন্তকারীদের বক্তব্য, কাদের নিশানা করা হবে তা চিহ্নিত করা, শুটারদের মধ্যে সমন্বয় রাখা, অস্ত্রের ব্যবস্থা করা অথবা যোগাযোগে সাহায্য করার মতো কাজে সান্ধু জড়িত ছিল বলে অভিযোগ।

গ্যাং সম্পর্কে কী বলেছে এফবিআই ও মার্কিন কৌঁসুলিরা?

জুলাই মাসে মার্কিন কর্তৃপক্ষ ‘অপারেশন হার্ড বল’-এর কথা ঘোষণা করে। আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির এই সমন্বিত অভিযানে তিনটি পৃথক ফেডারেল অভিযোগপত্রে ভারত থেকে আসা ৩৭ জন গ্যাংস্টারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। তাঁদের মধ্যে ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযুক্তেরা লরেন্স বিষ্ণোই, জগ্গু ভগবানপুরিয়া এবং রবিন্দর সিংহ ধান্ডার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত।

মার্কিন কৌঁসুলিদের অভিযোগ, ভারতের গুজরাতের কারাগারে বসেই লরেন্স বিষ্ণোই তার অপরাধমূলক কাজকর্ম পরিচালনা করে। এ জন্য ব্যবহার করা হয় বেআইনি ভাবে জেলে ঢোকানো মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে কথা বলার ‘ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রোটোকল’ বা ভিওআইপি প্রযুক্তির যন্ত্র। অপরাধচক্রের কাজের তালিকায় রয়েছে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে খুন, গুলিচালনা, তোলাবাজি, অপহরণ, মাদক পাচার এবং বেআইনি ভাবে মানুষকে সীমান্ত পার করানো।

লরেন্স বিষ্ণোই ছাড়াও এফবিআই গোল্ডি ব্রার ও রোহিত গোদারার নাম করেছে। সংস্থাটির বক্তব্য, তারা বিষ্ণোইয়ের শীর্ষ সহযোগী হিসেবে কাজ করে এবং বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা সদস্য ও সহযোগীদের নির্দেশ দিতে সাহায্য করে।

মার্কিন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, এই গ্যাংগুলি বহুল আলোচিত হিংসাত্মক ঘটনা ঘটিয়ে এবং অনলাইনে তার দায় স্বীকার করে আতঙ্ক তৈরি করে। বিশেষত ভারত এবং প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে সেই ভয় ছড়ানো হয়। তার পরে সেই ভয়কে কাজে লাগিয়েই টাকা আদায় করা হয়।

২০২৩ সালের জুনে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার সারে শহরে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হরদীপ সিংহ নিজ্জরকে হত্যার ঘটনায় বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতার কথাও উল্লেখ করেছেন মার্কিন কৌঁসুলিরা। এফবিআই এই অপরাধচক্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোকেন পাচার এবং প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাধী গোষ্ঠীর মাদকের চালান চুরির যোগসূত্রও তুলে ধরেছে।

গ্যাংস্টারদের কার্যকলাপ নিয়ে তদন্ত করা ভারতীয় আধিকারিকদের মতে, বিষ্ণোই সিন্ডিকেট বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা একটি নেটওয়ার্ক। এতে রয়েছে জেলবন্দি গ্যাংস্টার, বিদেশে বসে নির্দেশ দেওয়া পরিচালনাকারী, স্থানীয় শুটার এবং অর্থ জোগানদাতারা।

২০২৩ সালের মার্চে দাখিল করা একটি চার্জশিটে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএ জানিয়েছিল, উত্তর ভারতকেন্দ্রিক গ্যাংস্টারদের সঙ্গে খলিস্তানপন্থীদেরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এই যোগসাজশ গড়ে ওঠার ইতিহাসে ২০১৫ সালের বরগাড়ি আন্দোলন এবং ২০১৬ সালের নাভা জেল ভেঙে পালানোর ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে চিহ্নিত করেছিল সংস্থাটি।

এনআইএ-র বক্তব্য ছিল, খলিস্তানপন্থীদের প্রয়োজন ছিল অভিজ্ঞ শুটার, অস্ত্র এবং কাজ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা। অন্য দিকে, গ্যাংস্টাররা চাইছিল অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং অর্থের নতুন উৎস। এই জায়গাতেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় বিষ্ণোই গ্যাং।

তদন্তকারী সংস্থাটি জানিয়েছিল, বিষ্ণোই সিন্ডিকেটের জাল ছড়িয়ে রয়েছে পঞ্জাব, হরিয়ানা, চণ্ডীগড়, রাজস্থান, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাত, মহারাষ্ট্র, বিহার ও ঝাড়খণ্ডে। অপরাধমূলক কাজ থেকে পাওয়া অর্থ পাঠানো হত কানাডা, আমেরিকা, তাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া-সহ বিভিন্ন দেশে। সেই অর্থ ব্যবহার করা হত বিদেশে থাকা গ্যাংয়ের সদস্যদের সহায়তা এবং খলিস্তানপন্থীদের অর্থ জোগাতে।

এই নেটওয়ার্কের বিস্তার ও যোগাযোগের সঙ্গে নব্বইয়ের দশকে দাউদ ইব্রাহিমের ‘ডি-কোম্পানি’-র অপরাধজগতের কাঠামোর তুলনা করেছিল এনআইএ।

বিদেশে থাকা পরিচালনাকারীদের নাগাল পাওয়াই বড় বাধা

পণ্ডিত এবং বৃহত্তর বিষ্ণোই নেটওয়ার্কের তরফে শ্রফ ও অন্য তারকাদের নিশানা করার ঘটনা ভারতীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির একটি বড় সমস্যাকে সামনে এনেছে। যারা নির্দেশ দেয়, তারা থাকে দেশের বাইরে। আর স্থানীয় স্তরে হামলা চালায় হাজার হাজার ভাড়াটে শুটারের এই বাহিনী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দিল্লির এক পুলিশ আধিকারিক বলেন, “শুটারদের অধিকাংশই বেকার যুবক। অনলাইনে তাদের নিয়োগ করা হয়। যারা নির্দেশ দিচ্ছে, তারা কোথায় থাকে কিংবা গোটা চক্র কী ভাবে চলে, সে সম্পর্কে এই যুবকেরা কিছুই জানে না। টাকা ও অস্ত্র হাতে পেয়ে অপরাধজগতে নাম করার জন্য তারা হামলা চালায়।”

ওই আধিকারিকের বক্তব্য, সন্দেহভাজন নির্দেশদাতা এবং যারা সরাসরি হামলা চালায়, তাদের মধ্যে যোগাযোগের সম্পূর্ণ যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। অস্ত্র ও টাকা কোন পথে এসেছে, তা শনাক্ত করা এবং আলাদা আলাদা ঘটনার সঙ্গে একই অপরাধচক্রের যোগ রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করাও বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি আরও বলেন, “তার পর সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ওদের নাগাল পাওয়া। আমরা এদের কাছে পৌঁছতে পারি না। আর অপরাধ নিজেদের ভূখণ্ডে না ঘটলে আমেরিকা, ইউরোপ ও কানাডার তরফে অনেক সময়ই সাড়া মেলে না।”