বাংলাস্ফিয়ার: ১৯৬৬ সালে শিবাজি পার্কের সেই সমাবেশে এত মানুষ এসেছিলেন যে উদ্যোক্তারাও বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন। সভার পরে দক্ষিণ ভারতীয়দের মালিকানাধীন হোটেলগুলিতে হামলা হয়। আগামী ২০ অক্টোবর পৃথক সমাবেশ করবেন উদ্ধব ঠাকরে ও একনাথ শিন্ডে—দু’পক্ষই দাবি করছেন সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার।

বোম্বাইয়ের মারাঠিভাষী মানুষের অধিকারের দাবিতে বাল ঠাকরের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে সংগঠন গড়ে উঠেছিল, সেই জনসভাই ছিল জনসমক্ষে তার প্রথম শক্তিপরীক্ষা। একই সঙ্গে তা এমন এক রাজনৈতিক রীতির ভিত তৈরি করেছিল, যা ছয় দশক পরেও হাজার হাজার সমর্থককে মুম্বইয়ে টেনে আনে।

আগামী ২০ অক্টোবর সেই রীতি পালিত হবে দু’টি পৃথক সমাবেশে। উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা (ইউবিটি) ফিরছে শিবাজি পার্কে। অন্যদিকে, একনাথ শিন্ডের শিবসেনা প্রতিদ্বন্দ্বী সমাবেশ করবে গোরেগাঁওয়ের নেসকো ময়দানে। দু’পক্ষই দাবি করছে বাল ঠাকরের প্রতিষ্ঠিত দলের উত্তরাধিকার।

সাংবাদিক বৈভব পুরন্দরে তাঁর ‘দ্য সেনা স্টোরি’ বইয়ে লিখেছেন, ওই প্রথম সভার ঘোষণা হয়েছিল ‘মার্মিক’ পত্রিকায়। ১৯৬০ সালে ঠাকরে এই পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন। মারাঠিভাষী মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগের দাবিতে তাঁর প্রচারের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছিল পত্রিকাটি।

সমাবেশের আগের বছরগুলিতে ‘মার্মিক’ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও বেসরকারি কোম্পানির আধিকারিকদের নামের তালিকা প্রকাশ করত। পত্রিকাটির বক্তব্য ছিল, মারাঠি চাকরিপ্রার্থীদের উপেক্ষা করা হচ্ছে। একটি প্রচারে ব্যবহার করা হয়েছিল ‘বাচা আণি ঠান্ডা বসা’—অর্থাৎ, ‘পড়ুন আর চুপ করে বসে থাকুন’—কথাটি। পরে তা বদলে করা হয় ‘বাচা আণি উঠা’—‘পড়ুন আর উঠে দাঁড়ান’।

শহর তখনও ১৯৬০ সালে মহারাষ্ট্র গঠনের পরবর্তী পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে এই আহ্বান সাড়া ফেলেছিল। আলাদা রাজ্য গঠনের ফলে মারাঠিভাষী রাজ্যের দাবি পূরণ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু বোম্বাইয়ে চাকরি, ভাষা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে উদ্বেগের অবসান হয়নি। ঠাকরের বক্তব্য ছিল, শহরে নিজেদের স্থান সুরক্ষিত করতে মারাঠিভাষী বাসিন্দাদের সংগঠিত হতে হবে। শিবসেনার ‘ভূমিপুত্র’ রাজনীতির প্রথম দিককার প্রধান নিশানা হয়ে ওঠেন দক্ষিণ ভারতীয়রা।

সমাবেশের প্রস্তুতিতে চওল বা সাধারণ মানুষের ঘিঞ্জি আবাসনগুলিতে এবং বন্ধুদের বাড়িতে ছোট ছোট বৈঠক হয়েছিল। স্থানীয় ব্যায়ামাগার ও পাড়ার ক্লাবগুলি সমর্থকদের সংগঠিত করতে সাহায্য করেছিল। পরবর্তী সময়ে এই যোগাযোগের জালই শিবসেনার শাখা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় ভিত্তি হয়ে ওঠে। সেই ব্যবস্থার মাধ্যমেই মুম্বইয়ের বিভিন্ন পাড়ায় নিজেদের উপস্থিতি গড়ে তোলে দলটি।

দেশাইয়ের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে বারবার হাততালি আর ‘জিন্দাবাদ’ স্লোগানের কথা। ছগন ভুজবল তখন বীরমাতা জিজাবাই টেকনোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের ছাত্র। পরে তিনি স্মরণ করেছিলেন, জনসমাগমের বিপুল আকার তাঁকে বিস্মিত করেছিল।

সমাবেশে বক্তাদের মধ্যে ছিলেন ঠাকরের বাবা কেশব সীতারাম ঠাকরে, যিনি প্রবোধনকর নামেই বেশি পরিচিত। কংগ্রেস নেতা রামরাও আদিক-সহ আরও কয়েকজন বক্তৃতা করেন। দেশাইয়ের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, প্রবোধনকর সমবেত জনতাকে বলেছিলেন, ‘মহারাষ্ট্রের সেবায় আমি আমার ছেলেকে সমর্পণ করছি।’

সব শেষে বক্তৃতা করেন বাল ঠাকরে। এই সমাবেশ তাঁকে ‘মার্মিক’-এর পাঠকবৃত্তের বাইরেও বৃহত্তর জনসমাজের সামনে পৌঁছে দিয়েছিল। একই সঙ্গে শিবসেনার বার্ষিক রাজনৈতিক ভাষণের মঞ্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল শিবাজি পার্ক।

সমাবেশের পর হামলার অভিযোগ

প্রথম জনসভাটি মনে রাখা হয় সভা ভাঙার পরে ঘটা কথিত ঘটনাগুলির কারণেও।

সেই সময়ের সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘সভা শেষে জনতার মধ্যে আরও বেশি উত্তেজিত কিছু ব্যক্তি উদুপি হোটেলগুলিতে পাথর ছোড়ে।’ ওই সব প্রতিবেদনে ‘মাদ্রাজিদের’ বিতাড়ন এবং ইডলি-সাম্বর বন্ধ করার দাবিতে স্লোগান ওঠার কথাও নথিবদ্ধ হয়েছিল।

সিপিআই(এম) নেতা অশোক ধাওয়ালের পৃথক বিবরণ ‘দ্য শিবসেনা: সেমি-ফ্যাসিজম ইন অ্যাকশন’-এ অভিযোগ করা হয়েছে, দক্ষিণ ভারতীয়দের মালিকানাধীন দোকান ও রেস্তোরাঁয় লুটপাট চালানো হয় এবং আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

যেভাবে একটি সমাবেশ হয়ে উঠল ঐতিহ্য

প্রথম জমায়েতের সাফল্য শিবসেনাকে এমন একটি কর্মসূচির কাঠামো দিয়েছিল, যা তারা প্রতি বছর আয়োজন করতে পারত। দশেরা হয়ে উঠল সমর্থকদের উদ্দেশে দলের নেতৃত্বের ভাষণ দেওয়ার, রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করার এবং সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের বার্ষিক উপলক্ষ। শিবসেনার সমর্থকদের কাছে ‘শিবতীর্থ’ নামে পরিচিত শিবাজি পার্ক এই আয়োজনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে গেল।

২০১২ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এই সমাবেশে ভাষণ দিয়ে গিয়েছেন বাল ঠাকরে। পরের বছর থেকে ভাষণ দিতে শুরু করেন উদ্ধব ঠাকরে। অতিমারির সময়-সহ বিভিন্ন পর্বে স্থান ও আয়োজনের ধরন বদলালেও সমাবেশের ধারাবাহিকতা বজায় থেকেছে। মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে এটি অন্যতম পরিচিত বার্ষিক আয়োজন হয়ে রয়েছে।

দুই শিবসেনা, দুই মঞ্চ, দুই বার্তা

এবার অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতিতে সেই ঐতিহ্য পালিত হচ্ছে। ২০২২ সালে শিবসেনা ভেঙে যাওয়ার পর উদ্ধব ও একনাথ শিন্ডে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের নেতৃত্বে রয়েছেন। দু’পক্ষই বাল ঠাকরের প্রতিষ্ঠিত দলের সঙ্গে নিজেদের যোগসূত্র দাবি করছে। এই বিভাজনের ফলে বার্ষিক সমাবেশ এখন রাজনৈতিক শক্তিপরীক্ষার পাশাপাশি দলের ইতিহাসের উত্তরাধিকার নিয়ে প্রতিযোগিতাও হয়ে উঠেছে।

এ বছর ২০ অক্টোবর শিবাজি পার্কে সমাবেশ করার অনুমতি পেয়েছে শিবসেনা (ইউবিটি)। বৃহন্মুম্বই পুরসভা ২৪টি শর্তসাপেক্ষে ১৯ অক্টোবর প্রস্তুতি এবং পরের দিন মূল অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমোদন দিয়েছে। শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা নেসকো ময়দান বেছে নিয়েছে। ফলে শিবাজি পার্কের দখল নিয়ে আরও এক দফা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা এড়ানো গিয়েছে।

সমাবেশকে ঘিরে দুই শিবিরের বার্তাও আলাদা।

রবিবার শিবসেনা (ইউবিটি) একটি প্রচার-ঝলক প্রকাশ করে কর্মীদের সংবিধান রক্ষার ‘জ্বলন্ত মশাল’ হয়ে শিবাজি পার্কে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরে অনিয়মের অভিযোগে বিরোধীদের যে আন্দোলন চলছে, তার সঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক সমাবেশকে যুক্ত করেছে দলটি।

২০ অক্টোবর বিকেল পাঁচটায় নেসকো ময়দানে নির্ধারিত শিন্ডের সমাবেশটি উৎসর্গ করা হয়েছে খরাপীড়িত কৃষক ও তাঁদের পরিবারগুলিকে। শিন্ডে জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সহায়তা করবে দল। এর মধ্যে রয়েছে মহিলাদের সেলাই মেশিন দেওয়া এবং কৃষক পরিবারের মেয়েদের বিয়ের জন্য আর্থিক সাহায্য। সমাবেশের কর্মসূচির অংশ হিসেবে খরাকবলিত এলাকায় রেশনের সামগ্রীবোঝাই ট্রাক পাঠানোর কথাও ঘোষণা করেছেন তিনি।

দলের রাজনৈতিক জনভিত্তি ধরে রাখা এবং তার উত্তরাধিকারের দাবি প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের মধ্যে শিবাজি পার্কে ফিরে আসার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে উদ্ধবের কাছে। এর মাধ্যমে শিবসেনার বার্ষিক জমায়েতের চিরাচরিত স্থানটি নিজের শিবিরের হাতে রাখছেন তিনি।

১৯৬৬ সালে শিবাজি পার্কে চাঁদা তোলার জন্য ঘুরেছিল একটি স্টিলের টিফিনবাক্স। যে দলের জন্য সেই চাঁদা তোলা হচ্ছিল, তা আদৌ টিকবে কি না, কেউ নিশ্চিত ছিলেন না। ষাট বছর পরে সেই দলের নামের দাবিদার দুই শিবিরের একটি নিজেদের সমাবেশের অঙ্গ হিসেবে খরাপীড়িত কৃষকদের জন্য ট্রাকভর্তি রেশনসামগ্রী পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।