বাংলাস্ফিয়ার: সন্ধ্যা হতে হতে প্রদর্শনীতে অবশিষ্ট ছিল মাত্র ৩৫টি শিল্পকর্ম। সরিয়ে দেওয়া ছবির জায়গায় যে খালি ফ্রেম রাখা হয়েছিল, তা নিয়েও আপত্তি জানান কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বিকানের হাউসের আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

রাইহানের মা, কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা এই পদক্ষেপকে হাস্যকর বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এর মাধ্যমে দেশজুড়ে তরুণদের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আজ ওর সঙ্গে হচ্ছে, কাল অন্য কোনও শিল্পীর সঙ্গে হবে।”

বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা ছবিগুলিতে দিল্লির গত ছ’মাসের গণআন্দোলন ধরা রয়েছে। তবে রাইহানের কথায়, সেগুলি তোলা হয়েছে “গতি ও ছন্দের দৃষ্টিকোণ থেকে”।

২৬ বছরের এই শিল্পী জানান, ছবি তোলার সময়ে তিনি যতটা পর্যবেক্ষক ছিলেন, ততটাই ছিলেন অংশগ্রহণকারী। তাঁর কথায়, “জমায়েতের মধ্যে থেকে তাকে ক্যামেরাবন্দি করা এবং বৃহৎ আন্দোলনের মধ্যে যে কাব্য ফুটে ওঠে, তা দেখতে পাওয়া এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।”

রাইহান বলেন, “প্রদর্শনীর আগের দিন সন্ধ্যা ছ’টায় প্রথম আপত্তি জানানো হয়। আমাকে বলা হয়েছিল, পরে জানানো হবে। প্রথম লিখিত আপত্তি পাঠানো হয় বুধবার বিকেল সাড়ে তিনটেয়, প্রদর্শনী শুরু হওয়ার তিন ঘণ্টা আগে। ১০৫টি ছবির মধ্যে ৭৪টি সরিয়ে নিতে অথবা বদলে দিতে আমাকে ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয়।”

তাঁর বক্তব্য, এর ব্যাখ্যা হিসেবে তাঁকে শুধু বলা হয়েছিল, শিল্পকর্মগুলির “সময় ও প্রেক্ষাপট” উপযুক্ত নয় এবং সেগুলি স্পষ্টতই রাজনৈতিক। গোটা শহর যখন দুর্গের মতো ঘিরে ফেলা হয়েছে, তখন এই ধরনের ছবি দেখানোর উপযুক্ত সময় নয়।

প্রদর্শনীস্থলে প্রচারিত একটি বিবৃতিতে রাইহান জানান, তাঁর দল ছবিগুলির জায়গায় খালি ফ্রেম রেখেছিল। তিনি লেখেন, “এর পরে আমাদের বলা হয়, সেগুলিও গ্রহণযোগ্য নয় এবং সেগুলিও সরিয়ে ফেলতে হবে।”

প্রদর্শনীর আয়োজক স্থানটির কর্তৃপক্ষ সম্পর্কে তিনি বলেন, “১৫ অক্টোবর আমি তাঁদের একটি বিন্যাস-নকশা পাঠিয়েছিলাম। আজ তাঁরা আমাকে বলেছেন, সেটি স্পষ্ট ছিল না, পড়া যাচ্ছিল না।” ওই স্থানে ‘রাজনৈতিক বিষয়বস্তু’ প্রদর্শনের বিরুদ্ধে নীতি থাকায় রাজনৈতিক স্লোগান রয়েছে, এমন ছবিগুলি তিনি আগেই সরিয়ে নিয়েছিলেন।

তাঁর কথায়, “প্রতিটি শিল্পকর্ম আলাদা করে পর্যালোচনা করা হবে, এমন কথা তাঁরা কখনও বলেননি। সব ছবি আগাম জমা দিতেও বলেননি।”

প্রদর্শনীর প্রাক্‌দর্শন উপলক্ষে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি জানান, প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়েছিল ২০২৫ সালের ৩০ জুন। সেখানে “স্পষ্টভাবে বলা ছিল, প্রদর্শনীতে পছন্দ, নিয়ন্ত্রণ ও ঐক্যের ভাবনাকে তুলে ধরে এমন ছবি থাকবে”।

যে ছবিগুলি সরিয়ে নিতে বলা হয়েছিল, তার মধ্যে জাতীয় পতাকা রয়েছে এমন ছবিও ছিল। রাইহান বলেন, “ভারতীয় পতাকার ছবিও তাঁরা আমাকে সরাতে বলছেন দেখে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি আপত্তি জানাই এবং বলি, এগুলির কোনওটিই আমি নিজে সরাব না। আমি ওই চত্বর ছেড়ে বেরোতেই তাঁরা নিজেরাই ছবিটি সরিয়ে দেন।”

‘ইউজুয়াল সাসপেক্টস’ গ্যালারি এবং ‘ইউ ক্যাননট মিস দিস’ শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা রাইহান বলেন, “তাঁদের এই সিদ্ধান্ত, এমনকি খোলাখুলি বললে তাঁদের নীতিটিকেই আমার অদ্ভুত মনে হচ্ছে। আমার মতে, সমস্ত শিল্পই রাজনৈতিক।”

তিনি জানান, এই ঘটনা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিসরের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে তাঁর ধারণাকে আরও স্পষ্ট করেছে। তাঁর কথায়, “যেভাবে ঘটনাটি ঘটল, তা দেখে আমি বিস্মিত। আমার মনে হয়, জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলির দায়িত্ব শুধু তাদের মালিক বা পরিচালকদের প্রতি নয়, বৃহত্তর জনসাধারণের প্রতিও। শিল্পকর্ম বা তার বিষয়বস্তু কাকে ক্ষুব্ধ করছে কিংবা কার স্বস্তিতে আঘাত করছে, তা যা-ই হোক না কেন, কোনও প্রদর্শনীস্থলের পক্ষে সেগুলির উপর সেন্সরশিপ চাপানো অন্যায়।”

রাইহানের বক্তব্য, ‘নো আইডিয়া ইজ ফাইনাল’ প্রদর্শনীটি তাঁর আগের কাজের পদ্ধতি থেকে সরে আসার একটি প্রয়াস। তিনি বলেন, “মূল ভাবনা ছিল এমন শিল্পকর্ম নিয়ে একটি প্রদর্শনী সাজানো, যেগুলি প্রথমে আমার নিজের মনে সাড়া জাগায়, তার পরে কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে মেলে। আগে আমি প্রথমে একটি আখ্যান সাজাতাম, তার পরে তার মধ্যে শিল্পকর্মগুলিকে বসাতাম। এ বার সেই পদ্ধতি থেকে সরে এসেছি।”

প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলিতে বন্যপ্রাণী থেকে গণআন্দোলন ও বিমূর্ত ছবি—নানা বিষয় স্থান পেয়েছে।

অবশিষ্ট শিল্পকর্মগুলি ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সাধারণ দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। ইনস্টাগ্রামে রাইহান জানিয়েছেন, “শীঘ্রই অন্য একটি জায়গায় গোটা সংগ্রহটি প্রদর্শন করব।”