বাংলাস্ফিয়ারঃ গত বছরের সেপ্টেম্বরে কেরল থেকে চার ব্যক্তি কাতারে উড়ে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। সেখানে ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগের (আইইউএমএল) জনকল্যাণমূলক সংগঠন কেরল মুসলিম কালচারাল সেন্টারের (কেএমসিসি) দপ্তরের সিন্দুক ভেঙে তাঁরা ৩১ লক্ষ কাতারি রিয়াল—ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় আট কোটি টাকা—লুট করেন বলে অভিযোগ। তার পরে বিমানে দেশে ফিরে আসেন। প্রায় এক বছর ধরে এই ডাকাতির কিনারা হয়নি। এর মধ্যেই ঘটনাটি এবং তা নিয়ে সংগঠনের ভূমিকা ঘিরে প্রশ্ন উঠতে থাকে।
বুধবার থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন পারাপ্পিল বালাকৃষ্ণন। পেশায় ঝালাইমিস্ত্রি বালাকৃষ্ণন গত বছরের স্থানীয় নির্বাচনে কোইলান্ডি পুরসভার একটি ওয়ার্ডে বিজেপির প্রার্থী হয়েছিলেন। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে রেকর্ড করা একটি ভিডিয়োয় তিনি দাবি করেন, গত বছর আরও তিন জনের সঙ্গে তিনি কাতারে গিয়েছিলেন। সেখানে কেএমসিসির আল তুমামা দপ্তরে সিন্দুক ভাঙার ঘটনায় তিনি জড়িত ছিলেন। কেএমসিসি হল রাজ্যের শাসক জোট ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের শরিক আইইউএমএলের জনকল্যাণমূলক শাখা।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি গত বছর ঘটলেও অভিযোগ দায়ের হয় চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর। তার ভিত্তিতে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ডাকাতি এবং অভিন্ন উদ্দেশ্যে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে এফআইআর করা হয়।
বালাকৃষ্ণন ছাড়াও এফআইআরে আরও পাঁচ জনের নাম রয়েছে—রাশি, সালিহ, বম্বে শাজি, কামারুদ্দিন এবং হাসান। স্থানীয় আদালত পরে বালাকৃষ্ণনকে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠায়। পুলিশের বক্তব্য, অন্য অভিযুক্তেরা পলাতক।
এক পুলিশ আধিকারিক বলেন, “এই কাজের জন্যই তাঁকে কাতারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করার পরেই আমরা নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারব। অভিযুক্তদের এক জন, বম্বে শাজি, স্থানীয় আদালতে আগাম জামিনের আবেদন করেছেন। আমরা তার বিরোধিতা করেছি। ডাকাতি বিদেশে হলেও এখানে মামলা নথিভুক্ত করা যায়, কারণ অভিযুক্তেরা অপরাধের পরে এই রাজ্যে পালিয়ে এসেছেন।”
আত্মসমর্পণের পরে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োয় বালাকৃষ্ণন অবশ্য দাবি করেন, কাতারে যাওয়ার সময় ডাকাতির পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। তাঁর অভিযোগ, সন্দেহভাজনদের এক জন, শাজি বম্বে ওরফে শাহজাহান, তাঁকে সেখানে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
বালাকৃষ্ণন বলেন, “আমাকে এক আরব নাগরিকের বাড়িতে কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। দোহায় পৌঁছনোর পরে শাজি ও বাভা আমাকে একটি লজে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে স্বাধীনভাবে বাইরে বেরোতে দেওয়া হতো না। ওরা গাড়িতে করে আমাকে বাইরে নিয়ে যেত, আবার ফিরিয়ে আনত। এক দিন সকালে আমাকে কেএমসিসির দপ্তরে নিয়ে গিয়ে হুমকি দেয় এবং জোর করে সিন্দুক ভাঙায়। সিন্দুক খোলার পরে শাজি টাকা নিয়ে নেয়। কামারু নামে এক ব্যক্তি নির্দেশ দিচ্ছিল। শাজিই আমার ফেরার টিকিটের ব্যবস্থা করে। আমি কোঝিকোড় বিমানবন্দরে নামি। ওরা আমাকে ঠকিয়েছে। আমার প্রাণের আশঙ্কা রয়েছে। আমাকে যেন জামিনে ছাড়া না হয়।”
এর মধ্যেই সমাজমাধ্যমে আরও একটি অডিয়ো ছড়িয়ে পড়ে। সেটিতে দুই অভিযুক্ত—শাজি ও কামারুর—কথোপকথন রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ওই অডিয়োয় শাজিকে কাতার থেকে লুট করা টাকার নিজের ভাগ চাইতে শোনা যাচ্ছে বলে অভিযোগ। এফআইআরে আট কোটি টাকা লুটের কথা থাকলেও অডিয়োয় সেই অঙ্ক ২৫ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
অডিয়োয় শাজির বলে দাবি করা কণ্ঠে শোনা যায়, “কাতার থেকে যে টাকা আমি তুলে এনেছিলাম, তা কেরলে পাঠানো হয়েছিল। আমি তোমাকে ২৫ কোটি টাকা দিয়েছি। আমি আর বালাকৃষ্ণন এর জন্য খুব খেটেছি। ঘটনার পরে এক বছর কেটে গিয়েছে। আমার টাকা চাই। আমার ভাগে কত টাকা পড়বে, সেটা আমিই ঠিক করব। আমি কখনও জানতাম না যে ওই টাকা কেএমসিসির।”
কথিত ডাকাতির ঘটনাটি কেএমসিসিকে প্রবল অস্বস্তিতে ফেলেছিল। তার প্রায় এক বছর পরে এই নতুন মোড়। কেরলের প্রবাসীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে সংগঠনটি বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ চালায়।
ঘটনাটি ঘিরে কেএমসিসির কাতার শাখার অন্দরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ডাকাতির পরে নেতৃত্ব কীভাবে পরিস্থিতি সামলেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সংগঠনের সদস্যেরা।
খবর অনুযায়ী, সংগঠনের ‘স্নেহ সুরক্ষা’ প্রকল্পের জন্য ওই টাকা দপ্তরে রাখা ছিল। এক বছর পরেও সদস্যদের অভিযোগ, নেতৃত্ব ঘটনাটির যথাযথ ব্যাখ্যা দেয়নি, কত টাকা চুরি হয়েছে তা প্রকাশ করেনি এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে পর্যাপ্ত পদক্ষেপও করেনি।
কেরলের কন্নুর জেলার থালাসেরির বাসিন্দা তথা কেএমসিসির কাতার শাখার সহ-সভাপতি আবদুল রহিম পি কে-র অভিযোগের ভিত্তিতে গত মাসে এফআইআর নথিভুক্ত হয়।