বাংলাস্ফিয়ারঃ মেয়ের হত্যার বিচার চেয়ে দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে অবস্থানে বসেছেন অঙ্কিতা ভান্ডারীর বাবা-মা। বুধবার তাঁদের সঙ্গে দেখা করলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা। পরিবারের দাবি, ২০২২ সালের ওই হত্যাকাণ্ডে কথিত ‘ভিআইপি’র ভূমিকা নিয়ে চলতি সিবিআই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিজেপি নেতা দুষ্যন্ত কুমার গৌতমের সিকিমের রাজ্যপাল পদে নিয়োগ স্থগিত রাখতে হবে।
অঙ্কিতার বাবা বীরেন্দ্র সিংহ ভান্ডারী রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় যাঁর ভূমিকা নিয়ে তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, তদন্তের নিষ্পত্তির আগেই তাঁকে সাংবিধানিক পদে বসানো হচ্ছে। রাহুল তাঁদের ন্যায়বিচারের লড়াইয়ে পাশে থাকার আশ্বাস দেন। অবস্থানে পরিবারের সঙ্গে ছিলেন সমাজকর্মী যোগিতা ভয়ানাও। দীর্ঘদিনের বিচারপ্রার্থনার মধ্যেই এই নিয়োগ ঘিরে তাঁদের ক্ষোভ নতুন করে প্রকাশ্যে এসেছে।
সোমবার, ১২ অক্টোবর গৌতমকে সিকিমের রাজ্যপাল নিয়োগের ঘোষণা হয়। তিনি বিজেপির প্রাক্তন জাতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং উত্তরাখণ্ডের প্রাক্তন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা। অঙ্কিতার মা সোনি দেবী জানান, নিয়োগের খবর শুনে তাঁরা গভীরভাবে আঘাত পেয়েছেন। রাষ্ট্রপতি নিজে একজন নারী হওয়ায় মেয়েকে হারানো মায়ের যন্ত্রণা বুঝবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর আবেদন, তদন্ত সম্পূর্ণ হওয়ার আগে নিয়োগ কার্যকর করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়।
তবে গৌতমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে মানহানির আইনি পদক্ষেপও করেছেন। ফলে পরিবারের অভিযোগ এবং আদালতে প্রতিষ্ঠিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অঙ্কিতার পরিবার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চেয়েছে। দাবি না মানা হলে দেরাদুনে সচিবালয়ে উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরের বাইরে অনশনে বসার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তারা।
অঙ্কিতা হৃষীকেশের কাছে বনন্ত্রা রিসর্টে অভ্যর্থনা বিভাগের কর্মী ছিলেন। ২০২২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে হত্যা করা হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর চিল্লা খাল থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। রিসর্টের মালিক পুলকিত আর্য, ম্যানেজার সৌরভ ভাস্কর এবং অঙ্কিত গুপ্তকে ২০২৫ সালের ৩০ মে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় কোটদ্বারের আদালত। পুলকিত বিজেপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা বিনোদ আর্যের ছেলে। হত্যার পাশাপাশি প্রমাণ নষ্ট করা-সহ একাধিক অভিযোগে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
কিন্তু তিনজনের সাজা হলেও কথিত ‘ভিআইপি’র পরিচয় ও ভূমিকা নিয়ে পরিবারের প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়নি। মামলাটিতে অভিযোগ উঠেছিল, রিসর্টে অতিথিদের যৌনসেবা দিতে অঙ্কিতার উপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল। সেই প্রসঙ্গেই প্রভাবশালী ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে আসে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অজ্ঞাতপরিচয় এক ‘ভিআইপি’র বিরুদ্ধে এফআইআর হয়। ৯ জানুয়ারি মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিংহ ধামি সিবিআই তদন্তের সুপারিশ করেন। পরে কেন্দ্রীয় সংস্থা তদন্তভার নেয়। সিবিআই তদন্তের আগে উত্তরাখণ্ড পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল মামলাটি খতিয়ে দেখেছিল। কেন্দ্রীয় সংস্থা তদন্তভার নেওয়ার পরে পুলিশের এফআইআর এবং ওই বিশেষ দলের রিপোর্ট সংগ্রহ করে। তবু পরিবারের উদ্বেগ, প্রশ্ন বহাল রয়েছে।
গৌতমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। দলের নেতা পবন খেরার প্রশ্ন, সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়ার অপেক্ষা না করেই কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল? তাঁর অভিযোগ, অভিযোগের মুখে থাকা ব্যক্তিকে সুরক্ষা দিতেই সরকার তাড়াহুড়ো করেছে। উত্তরাখণ্ড কংগ্রেসও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে বিরোধীদের এই বক্তব্য রাজনৈতিক অভিযোগ; গৌতমের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার কোনও বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়।
পরিবারের কাছে এখন মূল বিষয়, মেয়ের হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে এমন প্রত্যেকের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনজনের দণ্ডের পরেও সেই অনুসন্ধান অসম্পূর্ণ। তাই দিল্লির অবস্থান থেকে তাঁরা একই সঙ্গে তদন্ত শেষ করা এবং তত দিন নিয়োগ স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছেন। রাহুল ও প্রিয়ঙ্কার উপস্থিতিতে সেই দাবি জাতীয় রাজনীতির পরিসরে আরও গুরুত্ব পেয়েছে।