বাংলাস্ফিয়ারঃ ছিনতাইয়ের সতর্কবার্তা ঘিরে মাঝপথে গন্তব্য বদলাতে হল এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্রাঙ্কফুর্ট–দিল্লি উড়ানকে। বুধবার, ১৪ অক্টোবর, এআই২০৩০ উড়ানটিকে দিল্লির পরিবর্তে জয়পুরে নামানো হয়। বোয়িং ৭৮৭-৯ বিমানটিতে ছিলেন ২৯৩ জন যাত্রী এবং ১৩ জন কর্মী। নিরাপত্তা পরীক্ষার পরে বিমান ও যাত্রীদের ফের যাত্রার অনুমতি দেওয়া হয়। পরে উড়ানটি দিল্লিতে পৌঁছয়। তবে ছিনতাইয়ের আশঙ্কা কাটলেও সতর্কবার্তাটি কীভাবে তৈরি হল, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে ‘৭৫০০’ সংকেত। প্রাথমিকভাবে নিরাপত্তা সূত্রে জানানো হয়েছিল, প্রধান বৈমানিক সংশ্লিষ্ট এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল বা এটিসিকে এই সংকেত পাঠিয়েছিলেন। বিমানটি তখন মুম্বইয়ের আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ এলাকার মধ্যে ছিল। কিন্তু পরবর্তী সংবাদ অনুযায়ী, এটিসি যোগাযোগ করলে বৈমানিকেরা জানান, তাঁরা এমন কোনও জরুরি সংকেত পাঠাননি এবং বিমানের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এই পরস্পরবিরোধী তথ্যই ঘটনার রহস্য বাড়িয়েছে।
জয়পুরে নিরাপদে নামার পরে বিমানটিকে মূল চলাচল এলাকা থেকে সরিয়ে নির্দিষ্ট বিচ্ছিন্ন স্থানে রাখা হয়। সেখানে নিরাপত্তাকর্মীরা পরীক্ষা শুরু করেন। যাত্রীদের বিমান থেকে নামিয়ে টার্মিনালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদেরও নিরাপত্তা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরে একই বিমানে আবার ওঠার ব্যবস্থা হয়। বিমান, যাত্রী এবং কর্মীদের ছাড়পত্র দেওয়ার পরেই দিল্লির উদ্দেশে যাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয়।
এয়ার ইন্ডিয়া বিবৃতিতে জানিয়েছে, সম্ভাব্য নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে উড়ানটি জয়পুরে ঘোরানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে বিমান ও কর্মীদের ছাড়পত্র দেয়। যাত্রীদের অসুবিধা কমাতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার কথাও জানিয়েছে সংস্থা। অনাকাঙ্ক্ষিত এই বিঘ্নের জন্য দুঃখপ্রকাশ করে এয়ার ইন্ডিয়া বলেছে, যাত্রী ও কর্মীদের নিরাপত্তাই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সংস্থার বিবৃতিতে অবশ্য সংকেতের উৎস বা প্রযুক্তিগত ত্রুটির বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। সেখানে মূলত নিরাপদ অবতরণ, পরীক্ষা এবং পুনরায় যাত্রার ছাড়পত্রের কথাই বলা হয়েছে। ফলে কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যার অপেক্ষা রয়েছে।
তবে সতর্কবার্তার উৎস নিয়ে তদন্তে প্রযুক্তিগত ত্রুটির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুম্বই এটিসির নতুন রাডার ব্যবস্থায় ছিনতাইয়ের সতর্কতা দেখা গিয়েছিল, যদিও বৈমানিকেরা ওই সংকেত চালু করেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। বিমান চলাচল এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলি বিষয়টি পরীক্ষা করছে। এটিসির ব্যবস্থায় কোনও ত্রুটি হয়েছিল কি না, তা এখনও চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিমান চলাচলে ৭৫০০ একটি বিশেষ ট্রান্সপন্ডার সংকেত, যা বেআইনি হস্তক্ষেপ বা সম্ভাব্য ছিনতাই বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। ট্রান্সপন্ডার হল বিমানের এমন একটি যন্ত্র, যার মাধ্যমে আকাশপথ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কাছে পরিচিতি ও নির্দিষ্ট সংকেত পৌঁছয়। এই সতর্কবার্তা দেখা গেলে নিয়ন্ত্রকেরা বৈমানিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে তা যাচাই করেন। ফলে সতর্কবার্তা পাওয়া এবং সত্যিই বিমান ছিনতাই হওয়া এক বিষয় নয়।
কয়েক ঘণ্টা পরীক্ষার পরে সেই একই বৈমানিকেরা বিমানটি নিয়ে দিল্লির উদ্দেশে রওনা হন। বিকেল ৩টে ১২ মিনিটে সেটি ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামে। জয়পুর বিমানবন্দরের প্রধান চরণ সিংহ প্রাথমিকভাবে ভুলবশত সংকেত পাঠানোর সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। তবে কী ঘটেছিল, তা নির্ধারণে তদন্ত চলছে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
ঘটনাটি তাই আপাতত ছিনতাইয়ের নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। সতর্কবার্তা আসার পরে নিরাপত্তাবিধি মেনে বিমান ঘোরানো, যাত্রীদের নামানো এবং পরীক্ষা করার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। বৈমানিকেরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক বললেও কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য বিপদের সংকেত উপেক্ষা করেনি। অন্যদিকে, কেবল প্রাথমিক অনুমানের ভিত্তিতে বৈমানিকের ভুলকে ঘটনার নিশ্চিত কারণ বলার মতো তথ্যও এখনও সামনে আসেনি।
যাত্রীদের যাত্রা শেষ হলেও তদন্তের মূল প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে: বিমানের যন্ত্র থেকে সংকেত গিয়েছিল, নাকি মাটিতে থাকা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ভুল সতর্কতা তৈরি হয়েছিল? সেই উত্তরেই বোঝা যাবে, ভবিষ্যতে এমন বিভ্রান্তি ঠেকাতে কোন ব্যবস্থায় সংশোধন প্রয়োজন।