দীর্ঘ অপেক্ষার পরে আইডিবিআই ব্যাঙ্কের নিয়ন্ত্রণ বিদেশি বিনিয়োগকারীর হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাবে অনুমোদন দিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অর্থনৈতিক বিষয়ক কমিটি। কানাডার ফেয়ারফ্যাক্স ফিনান্সিয়াল হোল্ডিংসের অধীনস্থ সংস্থা ৫২,৮৭৮ কোটি টাকায় ব্যাঙ্কের ৬০.৭২ শতাংশ শেয়ার কিনবে। কেন্দ্রের বক্তব্য, লেনদেন সম্পূর্ণ হলে এটিই হবে ভারতের আর্থিক ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত বৃহত্তম প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ।

এই চুক্তিতে কেন্দ্র বিক্রি করবে ব্যাঙ্কের ৩০.৪৮ শতাংশ এবং জীবন বিমা নিগম বা এলআইসি বিক্রি করবে ৩০.২৪ শতাংশ শেয়ার। বিক্রির পরে কেন্দ্রের অংশীদারি কমে হবে ১৫ শতাংশ, এলআইসির ১৯ শতাংশ। অর্থাৎ, দুই প্রতিষ্ঠানের হাতে সম্মিলিতভাবে ৩৪ শতাংশ শেয়ার থাকবে। বিক্রিলব্ধ অর্থও বিক্রি করা শেয়ারের অনুপাতে কেন্দ্র এবং এলআইসির মধ্যে ভাগ হবে।

অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন অবশ্য এই পদক্ষেপকে বিলগ্নিকরণের পরিবর্তে পুনর্গঠন হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর যুক্তি, সরকার ব্যাঙ্কে বিনিয়োগ বজায় রাখছে। তবে অর্থ মন্ত্রকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কেন্দ্র ও এলআইসি পরিচালন পর্ষদ থেকে তাদের মনোনীত প্রতিনিধিদের সরিয়ে নেবে এবং সাধারণ শেয়ারহোল্ডার হবে। ফলে অংশীদারি বজায় থাকলেও ব্যাঙ্ক পরিচালনার কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটবে।

ফেয়ারফ্যাক্সের সফল দর শেয়ারপিছু ৮১ টাকা। দু’টি স্বাধীন মূল্যায়নের গড় হিসেবে নির্ধারিত তুলনামূলক মূল্য ছিল ৭৫.৯৯ টাকা। সরকারি ব্যাখ্যায়, জমি, সম্পত্তি, অন্যান্য সম্পদ এবং দায় বিবেচনায় নিয়ে মূল্যায়ন করা হয়েছে। তবে দাম যথেষ্ট নয় বলে আপত্তি জানিয়েছে ব্যাঙ্কের অফিসার ও কর্মী সংগঠন। ফলে অনুমোদন মিললেও বিক্রিমূল্য নিয়ে বিতর্ক থাকছে।

এর আগে প্রথম দফার আর্থিক দরপত্রে প্রস্তাবিত দাম সরকারের নির্ধারিত ন্যূনতম মূল্যের নিচে থাকায় তা বাতিল করা হয়েছিল। তখন শেয়ারপিছু সংরক্ষিত মূল্য ছিল ৯৪.৪২ টাকা। পরে দর চাওয়া হয় এবং ২০২৬ সালের মার্চের নিরীক্ষিত হিসাবের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। সেই প্রক্রিয়াতেই ফেয়ারফ্যাক্সের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।

আইডিবিআইয়ের এই মালিকানা বদলের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ আর্থিক সংকট এবং ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। অনাদায়ি ঋণ ও লোকসানের চাপে ২০১৭ সালের মে মাসে ব্যাঙ্কটিকে বিশেষ সংশোধনমূলক নজরদারির আওতায় আনে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। পরিস্থিতির উন্নতির পরে ২০২১ সালের মার্চে সেই বিধিনিষেধ ওঠে। এর মধ্যে এলআইসি সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশীদারি নেওয়ায় ২০১৯ সালে আইডিবিআই বেসরকারি ব্যাঙ্ক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়।

পরবর্তী সময়ে ব্যাঙ্কের হিসাবেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে মোট ঋণের ৩১.৭৮ শতাংশ ছিল অনাদায়ি; ২০২৬ সালের মার্চে সেই হার কমে হয়েছে ২.৩২ শতাংশ। ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে ব্যাঙ্কের নিট মুনাফা হয়েছে রেকর্ড ৯,৫১৩ কোটি টাকা। এই উন্নতির পটভূমিতেই দীর্ঘদিন আটকে থাকা বিক্রিপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত অনুমোদনের পর্যায়ে পৌঁছেছে।

তবে মন্ত্রিসভার অনুমোদন মানেই এখনই মালিকানা হস্তান্তর সম্পূর্ণ নয়। ক্রেতাকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য এবং নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণের পরিকল্পনা জমা দিতে হবে। ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে লেনদেন শেষ হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, হস্তান্তরের পরে অন্তত তিন বছর আইডিবিআই নাম বজায় রাখতে হবে এবং ফেয়ারফ্যাক্সের বিনিয়োগ পাঁচ বছর আটকে থাকবে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ফেয়ারফ্যাক্স ইতিমধ্যেই কেরলের সিএসবি ব্যাঙ্কের ৪০ শতাংশের মালিক। একই প্রোমোটারের দু’টি ব্যাঙ্ক রাখার প্রশ্নে নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করতে সংস্থাটিকে দু’বছরের মধ্যে সিএসবি ও আইডিবিআই একীভূত করতে হবে, অথবা সিএসবির অংশীদারি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে। কোন পথ বেছে নেওয়া হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

কেন্দ্রের আশা, নতুন মালিকের পুঁজি, প্রযুক্তি এবং পরিচালন দক্ষতা আইডিবিআইকে ঋণ ও আমানতের বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে। সরকারি সাহায্যের উপরে নির্ভরতাও কমবে। তবে ঘোষিত ৫২,৮৭৮ কোটি টাকা মূলত বর্তমান মালিকদের শেয়ার কেনার মূল্য; পুরো অর্থ ব্যাঙ্কে নতুন মূলধন হিসেবে ঢুকছে না। তাই ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ, পরিষেবার উন্নতি এবং কর্মীদের স্বার্থরক্ষায় নতুন ব্যবস্থাপনার পদক্ষেপও নজরে থাকবে।