বাংলাস্ফিয়ার: ইন্দোরে দূষিত পানীয় জল খেয়ে মৃত্যুর ঘটনায় বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন যাঁকে অন্যতম প্রধান দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেই আইএএস অফিসার রোহিত সিসোনিয়াকেই রাইসেন জেলার কালেক্টর নিযুক্ত করল মধ্যপ্রদেশ সরকার। হাইকোর্টে তদন্তের রিপোর্ট জমা পড়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই নিয়োগ ঘিরে প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সিদ্ধান্তের সমালোচনায় সরব হয়েছে বিরোধী কংগ্রেস।

২০১৭ ব্যাচের আইএএস সিসোনিয়া বিপর্যয়ের সময় ইন্দোর পুরনিগমের জল সরবরাহ বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার ছিলেন। সম্প্রতি তিনি কৃষককল্যাণ ও কৃষি উন্নয়ন দপ্তরের উপসচিব পদে কর্মরত ছিলেন। ১৩ অক্টোবর রাতে ঘোষিত প্রশাসনিক রদবদলে তাঁকে রাইসেনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই নির্দেশে মোট ২৩ জন আইএএস অফিসারের বদলি হয়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইন্দোরের ভাগীরথপুরায় দূষিত জল সরবরাহের ঘটনা সামনে আসে। বমি ও ডায়েরিয়ার উপসর্গ নিয়ে বহু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতির জেরে ২০২৬ সালের ২ জানুয়ারি সিসোনিয়া এবং জল সরবরাহের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার সঞ্জীব শ্রীবাস্তবকে সাসপেন্ড করা হয়। পুর কমিশনার দিলীপকুমার যাদবকে সরানোর নির্দেশও দেন মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব। তখন তাঁর ঘোষণা ছিল, এই ঘটনায় গাফিলতি বরদাস্ত করবে না সরকার।

বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুশীলকুমার গুপ্তের নেতৃত্বে এক সদস্যের কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের ১৮ আগস্টের রিপোর্ট সেপ্টেম্বরে হাইকোর্টের ইনদওর বেঞ্চে জমা পড়ে। তদন্তে বলা হয়, এই বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব ছিল। পুরনো পরিকাঠামো বদলাতে বিলম্ব, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা এবং ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিক ত্রুটি পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তোলে। রিপোর্ট অনুযায়ী, পাশাপাশি থাকা পানীয় জল ও নিকাশির পাইপগুলি দীর্ঘদিনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই পথেই নিকাশির জল পানীয় জলে মিশে জীবাণুদূষণ ঘটায়। অর্থাৎ, সরবরাহব্যবস্থার ক্ষয় এবং প্রয়োজনীয় মেরামত না হওয়ার সঙ্গে মানুষের অসুস্থ হয়ে পড়ার যোগ খুঁজে পেয়েছে কমিশন। এই দূষণই শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী হয়।

কমিশন বিভিন্ন পর্যায়ে দরপত্র আহ্বান, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং কাজ শেষ করার ক্ষেত্রে প্রায় ৮৫৯ দিনেরও বেশি বিলম্বের বিষয়টি তুলে ধরে। বিশেষত, ক্ষতিগ্রস্ত জলবাহী পাইপ বদলের দরপত্রে ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭২ দিনের বিলম্ব চিহ্নিত হয়। সংশ্লিষ্ট ফাইলে সিসোনিয়া শুধু ‘আলোচনা’ শব্দটি লিখেছিলেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে।

এই বিলম্বের জন্য সিসোনিয়া ও তৎকালীন নির্বাহী ইঞ্জিনিয়ার শ্রীবাস্তবকে প্রধানত দায়ী করে কমিশন। সংশ্লিষ্ট দরপত্রের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার আর্থিক ক্ষমতা সিসোনিয়ারই ছিল বলে জানানো হয়। অন্যদিকে, প্রাক্তন দুই পুর কমিশনার দিলীপকুমার যাদব ও শিবম বর্মাকে দায়মুক্তি দেয় রিপোর্ট। দূষিত জলের এই বিপর্যয়ে তিরিশের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।

নতুন নিয়োগের সমালোচনা করে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি জিতু পাটোয়ারি জানতে চেয়েছেন, তদন্ত কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে এবং কোন তথ্য বিবেচনা করে সিসোনিয়াকে জেলাশাসক করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগে জবাবদিহির চেয়ে পক্ষপাতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাটোয়ারির দাবি, ভাগীরথপুরায় ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে; ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি এখনও বিচার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার অপেক্ষায়।

বিপর্যয়ের গোড়ায় সরকার আরও কয়েকজন আধিকারিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার কথা জানিয়েছিল। একজন জোনাল অফিসার ও একজন সহকারী ইঞ্জিনিয়ারকে সাসপেন্ড করা হয়; দায়িত্বপ্রাপ্ত এক সাব-ইঞ্জিনিয়ারের চাকরিও বাতিল হয়। পাশাপাশি, রাজ্যজুড়ে একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সংশোধনমূলক কর্মসূচি তৈরির নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই ঘোষণার পটভূমিতে সিসোনিয়ার বর্তমান নিয়োগ নতুন তাৎপর্য পেয়েছে।

ঘটনাক্রমে এখন দু’টি সিদ্ধান্ত পাশাপাশি এসেছে: বিপর্যয়ের পর দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে সাসপেনশন এবং তদন্তের রিপোর্ট জমা পড়ার পরে জেলার শীর্ষ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ। তাই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে তদন্তের ফল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, সেই প্রশ্ন। সাসপেনশনের পরবর্তী ব্যবস্থা ও নতুন নিয়োগের কারণ স্পষ্ট হলে তবেই এই দুই সিদ্ধান্তের সম্পর্ক বোঝা যাবে।