বাংলাস্ফিয়ার: নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে দায়িত্ব বণ্টন ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই নতুন ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হলেন প্রকাশ রাজপুরোহিত। রাজস্থান ক্যাডারের ২০১০ ব্যাচের এই আইএএস অফিসার সঞ্জয় কুমারের শূন্যপদে আসছেন। সঞ্জয়কে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই গত অগস্টে নিজের ক্যাডারে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নতুন নিয়োগে শূন্যপদ পূরণ হলেও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কাজের তদারকি কীভাবে হবে, সেই প্রশ্ন সামনে থাকছে।
কেন্দ্রীয় কর্মিবর্গ ও প্রশিক্ষণ দপ্তরের নির্দেশ অনুযায়ী, শনিবার, ১০ অক্টোবর মন্ত্রিসভার নিয়োগ কমিটি রাজপুরোহিতের নিয়োগ অনুমোদন করেছে। তাঁর মেয়াদ ২০৩০ সালের ৮ এপ্রিল পর্যন্ত। চলতি বছরের মে থেকে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের প্রতিরক্ষা উৎপাদন বিভাগে যুগ্মসচিব ছিলেন। কেন্দ্রের যুগ্মসচিব ও সমমর্যাদার মোট ২৭টি পদে নিয়োগের সিদ্ধান্তের মধ্যে তাঁর নিয়োগও রয়েছে।
সঞ্জয় কুমার ২০২৪ সালের অগস্ট থেকে ২০২৬ সালের অগস্ট পর্যন্ত ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। ভোটার তালিকা এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ তাঁর দায়িত্বে ছিল। দেশে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর শুরু করার জন্য ২০২৫ সালের ২৪ জুন কমিশন যে নির্দেশ দিয়েছিল, তাতেও তাঁর স্বাক্ষর ছিল। কমিশন থেকে ফেরানোর পরে তাঁকে দিল্লি সরকারে নিয়োগ করা হয়।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রধান সীমা খান্নার ফাইল কোন আধিকারিকের মাধ্যমে উপরে যাবে, সেই বিষয়টি। নির্বাচন কমিশনার এস এস সান্ধু এবং বিবেক জোশী ক্যাবিনেট সচিবকে চিঠি দিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, অভিজ্ঞ আধিকারিক সঞ্জয় কুমারকে পাশ কাটিয়ে ওই বিভাগের ফাইল পাঠানোর ব্যবস্থা নিয়মের পরিপন্থী।
সীমা খান্না ২০২৫ সালে ন্যাশনাল ইনফরমেটিক্স সেন্টার থেকে ডেপুটেশনে কমিশনে আসেন। ভোটার তালিকা পরিচালনার ব্যবস্থা-সহ কমিশনের ডিজিটাল পরিকাঠামোর দায়িত্ব তাঁর। প্রথমে তাঁর ফাইল সঞ্জয়ের মাধ্যমেই যেত। পরে সীমা অতিরিক্ত সচিবের সমতুল্য ‘লেভেল ১৫’ মর্যাদা পান। সঞ্জয় ছিলেন যুগ্মসচিবের সমতুল্য ‘লেভেল ১৪’-এর আধিকারিক।
এই পদমর্যাদার পার্থক্যের পরিপ্রেক্ষিতে সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গ একটি অভ্যন্তরীণ নির্দেশ দেন। তাতে সীমার ফাইল সরাসরি নির্বাচন কমিশনারদের কাছে পাঠানোর কথা বলা হয়। তবে প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই নির্দেশ কার্যকর হয়নি। সঞ্জয় চলে যাওয়ার পরে ফাইল গর্গের মাধ্যমেই যেতে শুরু করে।
এর কারণ, গর্গ ছিলেন সঞ্জয়ের ‘লিঙ্ক অফিসার’—অর্থাৎ সঞ্জয়ের অনুপস্থিতিতে তাঁর দপ্তরগুলির দায়িত্ব সামলানোর নির্ধারিত আধিকারিক। ফলে এখন রাজপুরোহিত আসার পরে ওই দায়িত্ব এবং ফাইল পাঠানোর পদ্ধতিতে কী পরিবর্তন হয়, তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই বিতর্কে কমিশনের আগের ব্যাখ্যাও প্রাসঙ্গিক। গত ২৬ সেপ্টেম্বর কমিশন জানিয়েছিল, দুই নির্বাচন কমিশনারের হস্তক্ষেপের পরে বিতর্কিত দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের নির্দেশ কার্যকর করা হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের উপরে ডেপুটি নির্বাচন কমিশনারের তদারকির ক্ষমতাও বাস্তবে প্রত্যাহার করা হয়নি বলে দাবি করেছিল কমিশন। ফলে অভিযোগ, জারি হওয়া নির্দেশ এবং বাস্তবে চালু ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্যটি স্পষ্ট করা জরুরি।
সান্ধু ও জোশীর উদ্বেগ শুধু ফাইল চালাচালিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভোটার তথ্যভান্ডারে কারা পরিবর্তন করতে পারবেন এবং রাজ্যের নির্বাচনী আধিকারিকদের প্রবেশাধিকার নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলেছিলেন। কমিশন জানিয়েছিল, ইসিআইনেট ব্যবস্থার পর্যালোচনা করবে একটি কমিটি, যেখানে একজন স্বাধীন প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞও থাকবেন। নতুন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা কমিশনের সামনে আনার আগে আধিকারিকদের কমিটিতে আলোচনার কথাও জানানো হয়েছিল।
এই পটভূমিতে রাজপুরোহিতের নিয়োগের তাৎপর্য বোঝা যাবে পরবর্তী দায়িত্ব বণ্টনে। তাঁকে কোন বিভাগ দেওয়া হবে, তথ্যপ্রযুক্তির ফাইল কোন পথে যাবে এবং দুই কমিশনারের আপত্তির কী নিষ্পত্তি হবে—এসব এখনও দেখার। আপাতত নিশ্চিত হয়েছে নিয়োগ; প্রশাসনিক প্রশ্নগুলির উত্তর নির্ভর করছে পরবর্তী ব্যবস্থার উপর। প্রশাসনিক দিক থেকে বিষয়টির গুরুত্ব এখানেই: দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক বদলালেও সিদ্ধান্ত পরীক্ষা, অনুমোদন ও বাস্তবায়নের ধাপগুলি স্পষ্ট না হলে তদারকি নিয়ে পুরনো প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন হতে পারে।