বাংলাস্ফিয়ার: মোট ১৩,৭৭৯টি আবেদনের মধ্যে ১০,৪৭০টির ক্ষেত্রে ‘সংশোধন’ অনুমোদন করা হয়েছিল। তদন্তে অনুমোদিত ১০,৪৭০টি ক্ষেত্রেই অনিয়ম ধরা পড়েছে বলে উত্তরপ্রদেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফর্ম ৮-এর মাধ্যমে নথিভুক্ত সমস্ত ত্রুটিপূর্ণ তথ্য সংশোধনের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট দুই নির্বাচক নিবন্ধন আধিকারিকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সহকারী নির্বাচক নিবন্ধন আধিকারিকদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতেও তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
উত্তরপ্রদেশে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ার পরে ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম ছিল, তাঁদেরই ভোটার পরিচয়পত্রের নম্বরের বিপরীতে অন্য নাম দেখা যাচ্ছে—এমন অভিযোগ পাওয়ার পরে পিলিভিটের ভোটার তালিকা নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক।
পাশাপাশি, ১০ এপ্রিল থেকে ২১ অক্টোবরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কম্পিউটার সহকারী ফর্ম ৬-এর মাধ্যমে নাম সংযোজন এবং ফর্ম ৭-এর মাধ্যমে নাম বাদ দেওয়ার যত তথ্য নথিভুক্ত করেছেন, তার সবই যাচাই করার জন্য পিলিভিটের জেলা নির্বাচনী আধিকারিককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুক্রবারের মধ্যে বিস্তারিত রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে।
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে উত্তরপ্রদেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক নবদীপ রিনওয়া জানান, ১৯ অক্টোবর সমাজবাদী পার্টির দেওয়া একটি স্মারকলিপিতে পিলিভিটের ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ ছিল। ওই স্মারকলিপিতে আরও কয়েকটি বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছিল।
রিনওয়া বলেন, ‘‘পিলিভিটের বিষয়টি তৃতীয় ও চতুর্থ পাতায় উল্লেখ করা হয়েছিল।’’ তাঁর বক্তব্য, দশেরা উপলক্ষে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর বন্ধ ছিল। তার পরেই বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ করা হয় এবং পিলিভিটের জেলাশাসকের কাছে রিপোর্ট চাওয়া হয়।
আইনজীবী ফয়জান আলি খানও অভিযোগ জানিয়েছিলেন। ১৪ অক্টোবর পিলিভিট জেলা প্রশাসনকে লেখা চিঠিতে তিনি জানান, এসআইআরের পরে প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় তাঁর এবং তাঁর ছোট ভাই ফারহানের নাম থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনী নথিতে তাঁদের নাম দেখা যাচ্ছে না।
পিলিভিটের আবাস বিকাশ কলোনির বাসিন্দা খান ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে জানান, সরকারি নোটিস পেয়ে তিনি ও ফারহান নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের সামনে হাজির হয়েছিলেন। প্রয়োজনীয় নথিপত্রও জমা দিয়েছিলেন। সেগুলি যাচাই করা হয়েছিল।
খান তাঁর অভিযোগে জানান, তাঁর ভোটার পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়ে খোঁজ করলে ‘রইস আলি’ নামটি দেখা যাচ্ছে। সেখানে পিতা বা আত্মীয়ের নাম হিসেবে রয়েছে ‘হুজাইব আলি’। অথচ তাঁর বাবার নাম মুশফিক আলি খান। ফারহানের তথ্যের জায়গায় দেখা যাচ্ছে ‘গুফরান আসলাম’, পিতার নাম ‘হামিদ আসলাম’।
খানের বক্তব্য, তাঁদের পাড়ায় এই নামের কোনও ব্যক্তি নেই। তাঁর অভিযোগ, ইচ্ছাকৃতভাবে কাল্পনিক নাম ঢোকানো হয়েছে, যার ফলে তিনি ও তাঁর ভাই ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
খান দাবি করেন, প্রশাসন প্রথমে বিষয়টিকে ‘প্রযুক্তিগত ত্রুটি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। অভিযোগপত্রে তিনি তাঁদের সঠিক তথ্য ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ এবং মূল নথিপত্র যাচাই হয়ে যাওয়ার পরেও কীভাবে এই পরিবর্তন করা হল, তা তদন্ত করে দেখারও দাবি করেন।
তাঁর মতে, তদন্তের আওতায় পিলিভিট জেলার অন্য তিনটি বিধানসভা কেন্দ্র—বরখেড়া, পুরনপুর ও বিসলপুরকেও আনা উচিত।
স্থানীয় কংগ্রেস নেতা কুমুদ গঙ্গওয়ার জানান, পিলিভিট বিধানসভা কেন্দ্রের বাসিন্দা আইনজীবী রেহান আলির কাছ থেকে বিষয়টি জানার পরে তিনি সরব হন। রেহান তাঁর ভাই ও বোনের ভোটার পরিচয়পত্রের নম্বরের বিপরীতে ‘বদলে দেওয়া’ নাম দেখতে পেয়েছিলেন।
গঙ্গওয়ারের আরও অভিযোগ, ওয়েবসাইটে যে তারিখগুলিতে তথ্য সংশোধন করা হয়েছে বলে দেখানো হচ্ছে, সেই তারিখগুলিতে নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও সংশোধনী প্রক্রিয়াই চালায়নি।
রেহান আলি জানান, বিষয়টি তাঁর নজরে আসে ‘নেহাতই ঘটনাচক্রে’। এক ভোটার ও এক কম্পিউটার অপারেটরের কথাবার্তা শুনে তিনি নিজের পরিবারের তথ্য যাচাই করার সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি বলেন, ‘‘আমি প্রতিবেশী এবং আমার বুথের অন্যদের সতর্ক করি। আরও অসংগতি ধরা পড়ে। তার পর আমার বন্ধু গঙ্গওয়ারকে বিষয়টি জানাই।’’
গঙ্গওয়ারের বক্তব্য, কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবক-সহ ৫৫ জনের একটি দল গঠন করে। কয়েক দিন ধরে তাঁরা পিলিভিট বিধানসভা কেন্দ্রের প্রতিটি বুথের ভোটারদের তথ্য পরীক্ষা করেন। মোট ৩ লক্ষ ৪৮ হাজার ভোটারের তথ্য যাচাই করে ১৩,১৫০টি ক্ষেত্রে অসংগতি চিহ্নিত করেন তাঁরা।
গঙ্গওয়ারের দাবি, ‘‘আমরা দেখেছি, বেশির ভাগ পরিবর্তন করা হয়েছে গভীর রাতে, ছুটির দিনে অথবা রবিবারে।’’
গঙ্গওয়ার এবং সমাজবাদী পার্টির নেতাদের অভিযোগ, যাঁদের তথ্য ‘বদলে দেওয়া’ হয়েছে, তাঁদের অধিকাংশই মুসলিম। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, পিলিভিট জেলার জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মুসলিম। বিরোধী দলগুলির বক্তব্য, নির্বাচনের সময়ে তথ্যের অমিল দেখিয়ে এই ভোটারদের ভোটদান থেকে বিরত রাখা হতে পারত।
উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের আর কয়েক মাস বাকি। ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পিলিভিট আসনে বিজেপির সঞ্জয় সিং গঙ্গওয়ার সাত হাজারেরও কম ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী।
তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পিলিভিট আসনে বিজেপি এক লক্ষেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিল।
সমাজবাদী পার্টির মুখপাত্র উদয়বীর সিং জানান, তাঁদের আশঙ্কা, ভোটার তালিকার এই অসংগতি শুধু পিলিভিটেই সীমাবদ্ধ নয়। উত্তরপ্রদেশের প্রায় ১০০টি বিধানসভা কেন্দ্রে একইভাবে ভোটার তালিকা যাচাই করবে দল।
সিং বলেন, ‘‘এসআইআরের পরে কীভাবে এমন পরিবর্তন করা সম্ভব হল, আমরা সেই প্রশ্ন তুলছি। বিশেষ করে মুসলিম ভোটারদের নাম বদলে দেওয়া হয়েছে।’’
উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি আরাধনা মিশ্র জানান, নিজ নিজ এলাকার ভোটার তালিকা ‘যাচাই’ করার জন্য রাজ্যের ৭৫টি জেলা কংগ্রেস কমিটিকে নির্দেশিকা পাঠানো হবে।
তিনি বলেন, ‘‘রাজ্য স্তরেও আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন জানাব।’’
বিজেপির মুখপাত্র রাকেশ ত্রিপাঠী বলেন, তাঁর দল ‘ভোটার তালিকার নির্ভুলতা’ বজায় রাখার পক্ষে। তালিকা সংশোধনের সময় তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব সমস্ত রাজনৈতিক দলেরই রয়েছে।
ত্রিপাঠী বলেন, ‘‘নিষ্ক্রিয় থেকে পরে নির্বাচন কমিশনকে দোষারোপ করার বদলে সব দলেরই এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া উচিত।’’
অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য, ‘‘কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এই পরিবর্তন করে থাকেন, তা হলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা উচিত এবং যে আধিকারিকেরা দোষী প্রমাণিত হবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’’