বাংলাস্ফিয়ার: গবেষণা প্রকল্পে দেরি নিয়ে প্রশ্ন ক্যাবিনেট সচিবালয়ের; কৃষিমন্ত্রকের দাবি, প্রক্রিয়ায় গতি আনা হচ্ছে

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সূচনা করা ১১,৪৪০ কোটি টাকার জাতীয় ডাল মিশনের প্রথম বছরে একটিও গবেষণা প্রকল্প অনুমোদিত হয়নি। গত ৫ অক্টোবর ক্যাবিনেট সচিব ড. টি ভি সোমনাথনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করেন আধিকারিকেরা। তৈলবীজ, ডাল ও তুলোর ক্ষেত্রে কৃষি গবেষণার অভিমুখ বদলের কাজ পর্যালোচনা করতে ওই বৈঠক ডাকা হয়েছিল।

সেবা তীর্থে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কৃষিসচিব অতীশ চন্দ্র, পরিবেশসচিব নরেন্দ্র ভূষণ এবং কৃষি গবেষণা ও শিক্ষা দফতরের সচিব মাঙ্গি লাল জাট-সহ উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা।

জানা গিয়েছে, বৈঠকে ক্যাবিনেট সচিবালয়ের আধিকারিকেরা জানান, জাতীয় ডাল মিশনের গবেষণা খাতের প্রকল্প প্রস্তাবগুলি এখনও অনুমোদন করেনি কৃষিমন্ত্রকের কৃষি ও কৃষককল্যাণ দফতর। সূত্রের খবর, এই মিশনে গবেষণার জন্য বরাদ্দ ৫০০ কোটি টাকার আওতায় প্রকল্পগুলির অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়া চলতি বছরের ১৫ নভেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণ করতে কৃষিমন্ত্রককে বলেছে ক্যাবিনেট সচিবালয়।

ডালের উৎপাদন বাড়ানো জরুরি কেন

ভারত বিশ্বের বৃহত্তম ডাল উৎপাদক ও ভোক্তা। কিন্তু দেশের বার্ষিক চাহিদা মেটানোর পক্ষে দেশীয় উৎপাদন যথেষ্ট নয়। এই পরিস্থিতিতে গত বছর ডাল মিশন চালু করে সরকার। মিশনের অন্য অংশগুলির কাজ শুরু হলেও গবেষণা প্রকল্পগুলি এখনও বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছয়নি।

কৃষিমন্ত্রক জানিয়েছে, “অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করার পরে সারা দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য যোগ্য সংস্থার কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করা হয়। মোট ৪১৯টি প্রস্তাব পাওয়া গিয়েছে। সেগুলির প্রাথমিক বাছাই ও কারিগরি মূল্যায়নের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত প্রস্তাবগুলির মধ্যে ১২৫টি এসেছে ভারতীয় কৃষি গবেষণা পরিষদের (আইসিএআর) প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে; ২৪৯টি রাজ্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে; ১৪টি অন্যান্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা থেকে… এবং পাঁচটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।”

মন্ত্রক আরও জানিয়েছে, “গবেষণার অগ্রাধিকার ও মিশনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে মিলিয়ে একটি বাছাই কমিটি প্রস্তাবগুলি পরীক্ষা করেছে এবং উপস্থাপনার জন্য কিছু প্রকল্প প্রাথমিকভাবে বেছে নিয়েছে। গবেষকেরা জাতীয় স্তরের গবেষণা ও উন্নয়ন কমিটির সামনে তাঁদের প্রস্তাব পেশ করছেন। এই কমিটিতে রয়েছেন অতিরিক্ত সচিব, আইসিএআরের উচ্চপদস্থ আধিকারিক ও বিজ্ঞানী, মিশনের আধিকারিক এবং বিষয়বিশেষজ্ঞেরা। মূল্যায়নের সময় প্রস্তাবগুলির বৈজ্ঞানিক গুণমান, প্রাসঙ্গিকতা, মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের সম্ভাবনা, কৃষকদের প্রত্যাশিত উপকার এবং ইতিমধ্যে চলতে থাকা গবেষণার সঙ্গে কাজের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর আগের তিনটি বৈঠকে অনুমোদনের জন্য ইতিমধ্যেই বহু প্রস্তাব প্রাথমিকভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে।”

২০২৫ সালের ১ অক্টোবর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়ার পরে ওই বছরের ১১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মিশনটির সূচনা করেন। তার আগে, গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি বাজেট বক্তৃতায় এই মিশনের কথা ঘোষণা করেছিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়েছিল, মিশনটি পাঁচটি বিষয়ের ওপর জোর দেবে: জলবায়ুর প্রতিকূলতা সহ্য করতে পারে এমন বীজের উদ্ভাবন এবং বাণিজ্যিকভাবে সেই বীজের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, ডালে প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ানো, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ফসল তোলার পর তার সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং কৃষকদের জন্য লাভজনক দাম নিশ্চিত করা।

২০২৫–২৬ থেকে ২০৩০–৩১ অর্থবর্ষ পর্যন্ত ছয় বছরে মিশনটি বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। মোট বরাদ্দ ১১,৪৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে গবেষণা প্রকল্পগুলির জন্য রাখা হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা।

মিশনটির লক্ষ্য, দেশে ডালের মোট উৎপাদন ৪৫ শতাংশ বাড়ানো—২০২৩–২৪ সালের ২৪২ লক্ষ মেট্রিক টন থেকে ২০৩০–৩১ সালে ৩৫০ লক্ষ মেট্রিক টনে নিয়ে যাওয়া। একই সময়ে ডাল চাষের জমির পরিমাণ ১৩ শতাংশ বাড়িয়ে ২৭৫ লক্ষ হেক্টর থেকে ৩১০ লক্ষ হেক্টর করার লক্ষ্যও রয়েছে। পাশাপাশি, হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৮৮১ কিলোগ্রাম থেকে ১,১৩০ কিলোগ্রামে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি।

কৃষিমন্ত্রক জানিয়েছে, “মিশনের প্রথম বছর পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাল চাষের জমির পরিমাণ, উৎপাদন এবং উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ২০২৫–২৬ সালের তৃতীয় অগ্রিম হিসাব অনুযায়ী, ডাল চাষের জমির পরিমাণ ২০২৪–২৫ সালের ২৭৭.২ লক্ষ হেক্টর থেকে বেড়ে হয়েছে ২৮৬.৫ লক্ষ হেক্টর—অর্থাৎ ৩.৩ শতাংশ বৃদ্ধি। উৎপাদন ২৫৬.৮ লক্ষ টন থেকে বেড়ে ২৭৪.১ লক্ষ টন হয়েছে, অর্থাৎ বৃদ্ধি ৬.৭ শতাংশ। হেক্টরপ্রতি উৎপাদনশীলতা ৯২৬ কিলোগ্রাম থেকে বেড়ে ৯৫৭ কিলোগ্রাম হয়েছে—বৃদ্ধি ৩.৩ শতাংশ।”