বাংলাস্ফিয়ার: যন্তরমন্তরকে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আবেদন জমা পড়েছে সুপ্রিম কোর্টে। আবেদনকারীর বক্তব্য, রাজধানীর কেন্দ্র থেকে প্রতিবাদকে দূরে সরিয়ে দিলে তা সাধারণ মানুষের নজর এবং ক্ষমতার অলিন্দের নাগালের বাইরে চলে যাবে। অভিযোগ, এর ফলে ভিন্নমত কার্যত ‘চোখের আড়াল, মনের আড়াল’ হয়ে পড়বে। মামলাটি শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হতে পারে।

স্বাতী সিংহের আবেদনটি বুধবার নথিভুক্ত হয়ে মামলা নম্বর পেয়েছে। আইনজীবী আকাঙ্ক্ষা মেহরার মাধ্যমে দায়ের করা আবেদনে কেন্দ্রীয় সরকার এবং দিল্লির পুলিশ কমিশনারকে পক্ষ করা হয়েছে। প্রশ্ন তোলা হয়েছে, প্রতিবাদের জন্য কোনও জায়গা বরাদ্দ করলেই কি নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার বাস্তবে নিশ্চিত হয়? সেই জায়গা থেকে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও জনসমাজের কাছে পৌঁছচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচ্য।

আবেদনের যুক্তি, প্রতিবাদের অধিকার কেবল একটি নির্দিষ্ট স্থানে কয়েকজন মানুষের সমবেত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার উদ্দেশ্য অভিযোগ জানানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ এবং প্রতিকারের দাবিতে প্রশাসন ও সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। ফলে বিক্ষোভের স্থান নির্বাচন নিছক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নয়; আন্দোলনের কার্যকারিতার সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।

যন্তরমন্তরের গুরুত্ব বোঝাতে সংসদ, সুপ্রিম কোর্ট, বিভিন্ন মন্ত্রক এবং কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তরের নৈকট্যের কথা বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে জায়গাটির সহজলভ্যতা এবং প্রতিবাদের দৃশ্যমানতাও গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি আবেদনকারীর। তাঁর বক্তব্য, যাঁদের উদ্দেশে দাবি জানানো হচ্ছে, তাঁদের থেকে আন্দোলনকারীদের দূরে সরিয়ে দিলে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের বার্তা পৌঁছনোর ক্ষমতা কমে যায়। দূরত্ব বাড়লে অংশগ্রহণের অসুবিধাও বাড়তে পারে।

দিল্লির পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমারের ১১ অক্টোবরের স্থায়ী নির্দেশে যন্তরমন্তরের পরিবর্তে রামলীলা ময়দান, উত্তর দিল্লির বুরারি মাঠ এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি মাঠকে বিক্ষোভের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে নির্দেশে উল্লেখ রয়েছে। নতুন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আবেদনে সাংবিধানিক এবং প্রক্রিয়াগত, উভয় ধরনের আপত্তি জানানো হয়েছে।

বিশেষ করে বলা হয়েছে, যন্তরমন্তরকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর করা হলেও বিকল্প তিনটি জায়গা ব্যবহারের বিস্তারিত নিয়মবিধি বা এসওপি তখনও প্রকাশ করা হয়নি। অর্থাৎ পুরনো ব্যবস্থা তুলে দিয়ে নতুন জায়গায় প্রবেশ ও বিক্ষোভ আয়োজনের পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি স্পষ্ট করা হয়নি। আবেদনকারীর অভিযোগ, এই অসম্পূর্ণ ব্যবস্থাই নাগরিকের অধিকার প্রয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

বিকল্প স্থানগুলির উপযোগিতাও বাস্তব পরিস্থিতির নিরিখে যাচাই করার দাবি উঠেছে। সেখানে পৌঁছনোর সুবিধা, জায়গার প্রাপ্যতা, অবস্থান, খরচ এবং ব্যবহারযোগ্যতা বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ রয়েছে। শুধু বিজ্ঞপ্তি জারি করে কোনও মাঠকে বিক্ষোভস্থল ঘোষণা করলেই সেটি কার্যকর বিকল্প হয়ে যায় না। মানুষের অংশগ্রহণের বাস্তব সুযোগ অক্ষুণ্ণ থাকছে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন।

আবেদনে ২০১৮ সালের মজদুর কিষান শক্তি সংগঠন বনাম ভারত সরকার মামলার রায় উল্লেখ করা হয়েছে। সেই রায়ে সুপ্রিম কোর্ট যন্তরমন্তরে বিক্ষোভের সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা খারিজ করে প্রতিবাদকারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রাখার কথা বলেছিল। নতুন সিদ্ধান্ত সেই নীতির পরিপন্থী বলে আবেদনকারীর অভিযোগ। সংবিধানের ১৯(১)(বি) অনুচ্ছেদে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সুরক্ষিত থাকার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

তবে এই বিতর্কের পটভূমিতে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টেরই সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ। ৯ অক্টোবরের শুনানিতে আদালত শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারীদের জন্য শৌচাগার, পানীয় জল এবং চিকিৎসার মতো মৌলিক সুবিধাসম্পন্ন বিকল্প স্থান চিহ্নিত করার পরামর্শ দিয়েছিল। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত কেন্দ্রীয় দিল্লিতে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাবের কথাও উল্লেখ করেছিলেন। সেই পরামর্শের পরে যন্তরমন্তরের স্বীকৃতি প্রত্যাহার নিয়ে এখন নতুন আইনি প্রশ্ন উঠেছে: বিকল্প স্থানের ব্যবস্থা করতে গিয়ে প্রতিবাদের দৃশ্যমানতা ও কার্যকারিতা কতটা ক্ষুণ্ণ করা যায়?