বাংলাস্ফিয়ারঃ মাথার দাম ছিল ছয় কোটি টাকা। আত্মসমর্পণের এক বছর পরে মাল্লোজুলা বেণুগোপাল ওরফে ভূপতি এখন নতুন করে শিখছেন সেই সব বন আইন, একসময় যেগুলির বিরোধিতা করেছিলেন। গ্রামবাসীদের শেখাচ্ছেন, কীভাবে ওই আইন কাজে লাগিয়ে নিজেদের অধিকার ও প্রাপ্য আদায় করতে হয়।

প্রায় ঠিক এক বছর আগের কথা। ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর মাওবাদী নেতৃত্বের শীর্ষস্তর ছেড়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে আত্মসমর্পণ করেছিলেন বেণুগোপাল। সোনু বা ভূপতি নামেও পরিচিত এই নেতার মাথার দাম তখন ছয় কোটি টাকা। তাঁর সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেছিলেন আরও ৬০ জন মাওবাদী কর্মী। জমা দেওয়া হয়েছিল প্রায় পঞ্চাশটি অস্ত্র। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী।

বেণুগোপাল এখন গোন্ডওয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘একল (গ্রামসভা) প্রকল্প ও কেন্দ্র’-এর সমন্বয়কারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস এবং অনুমোদিত কলেজগুলি মিলিয়ে পড়ুয়ার সংখ্যা ৬০ হাজার। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে গ্রামসভাগুলির কাছে পৌঁছে কাজ করে একল কেন্দ্র।

বেণুগোপালের ঘরের বাইরে মোতায়েন গড়চিরোলি পুলিশের দু’জন কর্মীই শুধু তাঁর অতীতের আভাস দেন।

চাকরির খোঁজটি তিনি পেয়েছিলেন নেহাতই ঘটনাচক্রে। মে মাসে সংবাদপত্রে একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। আবেদনকারীদের অন্তত দ্বাদশ শ্রেণি উত্তীর্ণ হতে হবে। আদিবাসী ও গ্রামীণ এলাকার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন আইন ও প্রকল্প সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে—যেমন পেসা বা তফসিলি এলাকায় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা সম্প্রসারণ আইন, গোষ্ঠীগত বনাধিকার, মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প এবং জীববৈচিত্র্য আইন। বন ব্যবস্থাপনা এবং আদিবাসী ও গ্রামীণ মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও চাই। পাশাপাশি গড়চিরোলি জেলার যে কোনও তালুকে কাজ করতে রাজি থাকতে হবে।

সব ক’টি শর্তই পূরণ করছিলেন বেণুগোপাল।

‘আইনগুলি বুঝতে আমাদের ভুল হয়েছিল’

যে সব বিষয় নিয়ে একসময় মাওবাদীরা বিরোধিতা সংগঠিত করতেন, এখন আইনের পথেই সেই সব বিষয় নিয়ে কাজ করছেন তিনি। এই বৈপরীত্য মেনে নেন বেণুগোপাল। পেসা আইনের কিছু অংশ এবং বনাধিকার আইন বা এফআরএ নিয়েও তাঁদের বিরোধিতা ছিল। স্থানীয় শাসনব্যবস্থা এবং বনভূমি ও বনসম্পদের বিষয়ে গ্রামসভাগুলির মতামত ও সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বাড়ানোই এই দুই আইনের উদ্দেশ্য।

বেণুগোপাল বলেন, এখন তিনি উপলব্ধি করছেন, ওই আইনগুলির বিরুদ্ধে মাওবাদীদের অবস্থান ভুল ছিল—যদিও সেই বিরোধিতা সব সময় সর্বত্র একই রকম ছিল না। তাঁর দাবি, আদিবাসী সমাজের কাছে জমি ও জঙ্গলের অধিকারের প্রশ্ন কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সিপিআই (মাওবাদী)-ও বুঝতে শুরু করেছিল। তিনি বলেন, “আমরা যদি এটা আগে বুঝতাম, তা হলে মানুষ উপকৃত হতেন।”

একল কেন্দ্রের ভাবনা যখন তৈরি হয়, তখন গড়চিরোলির কালেক্টর ছিলেন সঞ্জয় মীনা। তাঁর কথায়, গ্রামসভা ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে আস্থা ও যোগাযোগের ঘাটতি দূর করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। গোষ্ঠীগত বনাধিকার, জীববৈচিত্র্যের নথি তৈরি এবং বন ও জল সংরক্ষণের মতো বিষয়ে গ্রামসভার সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিতে গোন্ডওয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়কে যুক্ত করা হয়েছিল।

বর্তমানে নাগপুর মেট্রোপলিটন রিজিয়ন ডেভেলপমেন্ট অথরিটির কমিশনার মীনা বলেন, “কর্মসূচির চারটি দিক ছিল: গ্রামসভাগুলিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা যাতে তারা সরাসরি পায় তা নিশ্চিত করা, বন সংরক্ষণে উৎসাহ দেওয়া এবং মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই লঘু বনজ দ্রব্য সরাসরি বিক্রির সুযোগ তৈরি করা… গড়চিরোলির ১,২০০টি গ্রামসভার মধ্যে প্রায় ৭৫০টির সঙ্গে আমরা সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর করেছিলাম। বিরাট কর্মযজ্ঞ ছিল।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রশান্ত বোকাড়ে জানান, তাঁরা এই কর্মসূচি চালিয়ে যেতে চান। তিনি বলেন, “একল কেন্দ্রের জন্য আমরা একটি বিশেষ পাঠ্যক্রম পর্ষদ গঠন করেছি। এখন তার সদস্যসংখ্যা ১৬-র বেশি।” ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে প্রায় ৬০০টি গ্রামসভার সাড়ে তিন হাজার মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ২৩২টি গ্রামসভাকে বন ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা সম্পূর্ণ করতে সাহায্য করা হয়েছে। একশোরও বেশি গ্রামসভাকে গোষ্ঠীগত বনাধিকার পেতে সহায়তা করা হয়েছে।

ইতিহাসের অধ্যাপক এবং একল কেন্দ্রের আর এক সমন্বয়কারী নরেশ মাডাভি বলেন, প্রতিটি গ্রামসভা থেকে পাঁচ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাঁরা ফিরে গিয়ে নিজেদের গ্রামের অন্যদের প্রশিক্ষণ দেন। বেণুগোপাল তথ্য সংগ্রহ করছেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। মাডাভির কথায়, “কাজ মসৃণভাবেই চলছে।”

গড়চিরোলির পুলিশ সুপার এম রমেশ বলেন, তাঁরা চেয়েছিলেন বেণুগোপাল স্বাভাবিক জীবনে থিতু হোন। “আত্মসমর্পণকারী কর্মীরা যেখানে যে কাজের যোগ্য বলে বিবেচিত হন, সেখানে আমরা সাহায্য করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজের ক্ষেত্রে সোনুকে যোগ্য বলে মনে করা হয়েছিল।”

বিভিন্ন বিষয় বুঝতে গ্রামবাসীরা তাঁর কাছে এলে ভালো লাগে বেণুগোপালের। তাঁর কাছে এটি মানুষের সচেতনতা বাড়ার লক্ষণ। তিনি বলেন, “মানুষ নিজেদের অধিকারের জন্য লড়তে পারেন।”

তবে বেণুগোপালের নিয়োগ নিয়ে প্রত্যাশিতভাবেই কিছু বিরোধিতাও হয়েছে। জন সংঘর্ষ সমিতির দত্ত শিরকে বলেন, “ওঁর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা উচিত। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তাঁকে একটি উঁচু পদ দিতে হবে… মাওবাদী হিংসায় পুলিশকর্মী এবং নিরীহ আদিবাসীরা প্রাণ হারিয়েছেন। এমন একজনকে পদ দেওয়া ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের অপমান করা।”

বেণুগোপাল এই অভিযোগ অস্বীকার করেন না। তবে তাঁর বর্তমান ভূমিকাটিকে আলাদা করে বিচার করার অনুরোধ জানান। তাঁর কথায়, “আমি মনপ্রাণ দিয়ে কাজ করছি।”

‘আর পাঁচটা বয়স্ক দম্পতির মতো’

মহারাষ্ট্রের আত্মসমর্পণ ও পুনর্বাসন নীতির বেশ কয়েকটি দিক নিয়ে সন্তুষ্ট বেণুগোপাল। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক সহায়তা, প্রশাসনিক সহযোগিতা এবং জমি ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র পেতে সাহায্য।

গ্রেফতার হওয়া কমরেডদের সরকার মুক্তি দেবে বলে আশা করেন তিনি। তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে তাঁর অনুভূতি কৃতজ্ঞতার। বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করা তো দূরের কথা, আবার কোনও বাড়িতে বসবাস করতে পারবেন, সেটাই কখনও ভাবেননি। তাঁর মনে পড়ে, আত্মসমর্পণের সময় কেউ কেউ তাঁকে “বিশ্বাসঘাতক” বলেছিলেন। পরে আরও অনেকেই তাঁর পথ অনুসরণ করেছেন। বেণুগোপাল বলেন, “এই এক বছর প্রমাণ করেছে, আমার সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক ছিল।”

এখনও খুব ভোরে, সাড়ে চারটে নাগাদ ঘুম থেকে ওঠেন তিনি। এক ঘণ্টা শরীরচর্চা করে কাজের জন্য তৈরি হন। সকাল দশটার মধ্যে অফিসে পৌঁছে যান। বিকেল পাঁচটায় অফিস শেষ হলেও সন্ধ্যা কাটে আত্মসমর্পণকারী কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এবং পুনর্বাসনের বিভিন্ন বিষয়ের অগ্রগতি খোঁজ নিয়ে।

প্রায়ই তেলঙ্গানায় নিজের জন্মস্থানে যান, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর স্ত্রী তারাক্কার একটি মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে যোগ দেওয়ার কথা। হাসতে হাসতে বেণুগোপাল বলেন, “আমরা আর পাঁচটা বয়স্ক দম্পতির মতোই থাকি।”

আর অন্য বয়স্ক দম্পতিদের মতোই কখনও কখনও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা হয় তাঁর। বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী চাকরিতে মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা পান। চাকরির মেয়াদ না বাড়লে কী হবে? সেই ভাবনা থেকেই একসময়ের এই বিকম পড়ুয়া, যিনি মাওবাদী আন্দোলনে যোগ দিতে পড়াশোনা ছেড়েছিলেন, এখন তেলঙ্গানার ডক্টর বি আর আম্বেদকর মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ পাঠক্রমে ভর্তি হয়েছেন।

পৃথিবী কীভাবে বদলাচ্ছে, বিশেষ করে তরুণেরা রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনকে কীভাবে দেখছেন, তা বুঝতে চান তিনি। তাঁর কথায়, “আজকের রাজনৈতিক দলগুলি তরুণদের কাছ থেকে শিখছে।”

সত্তর বছর বয়সি এই প্রাক্তন মাওবাদীর নিজের উপলব্ধি, “বাম ও দক্ষিণের মধ্যে কোনও তফাত নেই।” তিনি বলেন, “জরুরি অবস্থার সময় বাম ও দক্ষিণ এক হয়েছিল। এখন মানুষ বুঝতেই পারেন না, কে বাম আর কে দক্ষিণ। মুখে ‘বাম, বাম’ বলা হলেও, কোনও প্রকৃত মতাদর্শ অনুসরণ করে মানুষের জন্য কাজ করা হচ্ছে না।”

নিজের ক্ষেত্রে অবশ্য ‘সোনু’ ও ‘ভূপতি’ এখন অতীত।

“আমি বেণুগোপাল।”