বাংলাস্ফিয়ারঃ বহু বছর ধরে কাশ্মীর উপত্যকায় আড়ালে থেকেই কাজ করে এসেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলি। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় নিভৃতে চলেছে তাদের কাজ। সেখানে সেবা ভারতী স্কুল চালায়, স্কুলগুলিকে আর্থিক সহায়তা দেয়। পাশাপাশি প্রাচীন মন্দির সংস্কারের প্রকল্পও হাতে নেয়।
কিন্তু ভারতীয় মজদুর সংঘের (বিএমএস) দফতর খোলার ঘটনা সেই আড়ালে থাকা উপস্থিতি থেকে প্রকাশ্যে সাংগঠনিক অস্তিত্ব জানান দেওয়ার পথে একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিএমএসের কাশ্মীরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ৩৬ বছরের সমীর কুচে বলেন, “কাশ্মীরে সংগঠনের দফতর খোলার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। এখন আড়ালে নয়, প্রকাশ্যে কাজ করার সময়। কাশ্মীরের পরিস্থিতি বদলেছে। তাই আমরা এখন সামনে আসছি।”
বিএমএসের দাবি, কাশ্মীরে তাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ২০টি শ্রমিক ইউনিয়ন। সেগুলির অধিকাংশের প্রভাব এখনও সীমিত হলেও, এই সংযুক্তির সুবাদে উপত্যকায় পা রাখার জায়গা পেয়েছে বিএমএস। অথচ সেখানে বিজেপি এবং তার আদর্শগত পথপ্রদর্শক আরএসএস এখনও প্রতিরোধের মুখে পড়ে।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বিষয়টি জানেন কুচে। বারসুর বাসিন্দা তিনি। ২০১৬ সালে সংঘে যোগ দেন। তখন কাশ্মীরে নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছিল জঙ্গি তৎপরতা, যার কেন্দ্রে ছিলেন বুরহান ওয়ানি।
“নিজের বাড়িতেই আমি তা দেখেছি,” বলেন তিনি। “এমন দিনও গিয়েছে, যখন আমি যে গ্লাসে জল খেতাম, আমার আত্মীয়েরাও সেটি ছুঁতেন না। কাপড় দিয়ে গ্লাসটা ধরতেন। তাঁদের চোখে আমি ছিলাম একজন ‘সংঘী’। মনে আছে, তেরঙ্গা উত্তোলনের একটি ভিডিও ফেসবুকে দিয়েছিলাম। তাতে ১,৩৮৪টি মন্তব্য এসেছিল। তার মধ্যে ১,৩৮২টিই ছিল গালাগালি।”
কুচের মতে, তার পর থেকে কাশ্মীর অনেকটা পথ এগিয়েছে। সোমবার তাঁর গ্রাম বারসুতেই খোলা হয়েছে উপত্যকায় বিএমএসের প্রথম দফতর। তবে এই ঘটনাকে কোনও দুঃসাহসিক কৃতিত্ব হিসেবে তুলে ধরতে চান না তিনি। তাঁর কথায়, “দক্ষিণ কাশ্মীরের চারটি জেলায় আমাদের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। বিভাগীয় দফতরের জন্য আমরা অবন্তীপোরাকে বেছে নিয়েছি, কারণ দক্ষিণ কাশ্মীর এবং শ্রীনগর—দুই জায়গা থেকেই এখানে যাতায়াতের সুবিধা রয়েছে।”
উপত্যকায় বিজেপির সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে চান কুচে। অন্য দিকে, বিজেপি নেতারাও তাঁর সংগঠনের সঙ্গে দূরত্ব রাখতে আগ্রহী বলেই মনে হচ্ছে। বিজেপি নেতাদের বক্তব্য, উপত্যকায় বিএমএসের কোনও দফতর খোলার কথা তাঁদের জানা নেই। আর বিএমএস জোর দিয়ে বলছে, তারা কারও “পুতুল” নয়।
কুচে বলেন, “আমরা বিজেপি বা অন্য কোনও দলের পুতুল নই। রাজনীতির সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই, ধর্মের সঙ্গেও নেই। একটা ধারণা রয়েছে যে আমরা মুসলিমবিরোধী। তেমন কিছুই নয়। ধর্মের সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই।”
তাঁর আশা, এই বার্তা উপত্যকার মানুষের কাছে পৌঁছতে সংগঠনকে সাহায্য করবে। তিনি বলেন, “মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করি। তাঁদের বলি, ‘আপনাদের যদি মনে হয় আরএসএস খারাপ, তা হলে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে নিজেরাই দেখে নিন।’ আমরা রাজনীতি থেকে অনেক দূরে।”
কাশ্মীরে আরএসএসের উপস্থিতি সামান্য, কিংবা কার্যত নেই বললেই চলে। তবে গত বেশ কয়েক বছর ধরে, বিশেষ করে ২০১৯ সালে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের পর থেকে, উপত্যকায় নিজেদের উপস্থিতি গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে সংগঠনটি।
আগে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের মধ্যে সংঘের কিছুটা উপস্থিতি ছিল। কিন্তু জঙ্গি তৎপরতা শুরু হওয়ার পর ওই সম্প্রদায়ের মানুষ উপত্যকা ছেড়ে চলে গেলে, ১৯৯০ সালে সেখানে নিজেদের কাজকর্ম বন্ধ করে দেয় সংঘ।
তবে সংঘের সমালোচকেরা এই ঘটনাকে “রাষ্ট্রের মদতে পরিচালিত প্রকল্প” বলে অভিহিত করছেন। সিপিআই(এম) নেতা তথা সেন্টার অব ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নসের (সিটু) প্রধান এম ওয়াই তারিগামি বলেন, “প্রশাসনযন্ত্র যে একটি নির্দিষ্ট সংগঠনকে এগিয়ে দিচ্ছে, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু বাস্তব হল, আরএসএস কীসের পক্ষে দাঁড়ায়, তা সকলেই জানেন। তারা প্রকাশ্যেই বিভাজনের রাজনীতির কথা বলে আসছে, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কথা বলে আসছে। তারা কীসের প্রতিনিধিত্ব করে, মানুষ তা বোঝেন, উপলব্ধিও করেন। তা ছাড়া, উপত্যকায় কোনও ধরনের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের জন্যই পরিসর দেওয়া হচ্ছে না।”