বাংলাস্ফিয়ারঃ ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কেন্দ্রের আচরণ, প্রতিবাদস্থল হিসেবে যন্তর মন্তরের স্বীকৃতি প্রত্যাহার, আগাম আটক এবং দিল্লি পুলিশের পেলেট বন্দুক ব্যবহারের সমালোচনা করে বুধবার কেন্দ্রীয় সরকারকে নিশানা করলেন তামিলনাড়ুর প্রাক্তন বিজেপি সভাপতি তথা প্রাক্তন আইপিএস অফিসার কে আন্নামালাই।

জুন মাসে বিজেপির প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেওয়া আন্নামালাই এক্স-এ একটি পোস্টে ২০১১ সালে দিল্লিতে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের উপর দমনপীড়নের প্রসঙ্গ টানেন। তিনি লেখেন, সেই সময় গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, তাঁর হাত বাঁধা না থাকলে তিনি দিল্লি গিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন।

আন্নামালাই বলেন, “আমার মতে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তখন যা বলেছিলেন, তা একেবারেই সঠিক ছিল। তাতে কোনও ভুল ছিল না। আজ আপনাকে অনির্দিষ্টকাল জেলে রাখা হতে পারে, আপনার জামিনের বন্ড প্রত্যাখ্যান করা হতে পারে। আর আশ্চর্যের বিষয় হল, শান্তিভঙ্গ ঠেকাতে মুচলেকা নেওয়া সংক্রান্ত মামলা পরিচালনার ক্ষমতা পেলে একজন বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আপনাকে নাকানিচোবানি খাওয়াতে পারেন।”

তিনি লেখেন, “গণতন্ত্রে আইনসম্মত প্রক্রিয়া লঙ্ঘন নিয়ে প্রশ্ন তুললে আপনাকে নানা নামে দেগে দেওয়া হবে। আপনার বিরুদ্ধে একের পর এক আক্রমণ নেমে আসবে। এমনকি আপনাকে বিদেশি এজেন্টও বলা হবে।”

আন্নামালাই জানান, নিট পরীক্ষা নিয়ে আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরোধ করার পর থেকেই তাঁকে লাগাতার আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে।

সিজেপির কৌশলের সঙ্গে তিনি একমত নাও হতে পারেন এবং তাদের অনেক সদস্যকে বিপথচালিত বলেও মনে করতে পারেন—এ কথা জানিয়ে আন্নামালাই বলেন, “কিন্তু আপনি যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, যে বিষয়কে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন, তা নিয়ে বিরোধিতা করার, তর্ক করার বা প্রতিবাদ করার অধিকার তাঁদের আছে কি না, আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলব—হ্যাঁ।”

তিনি বলেন, মানুষ আবারও প্রশ্নগুলি তুলুন, তিনি সেটাই চান—তাতে “কারও কারও অস্বস্তি” হলেও। তাঁর ইচ্ছা, পাল্টা অন্য প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন এড়ানোর বদলে কেন্দ্র সেই প্রশ্নগুলির উত্তর দিক।

এর পর তিনি পাঁচটি প্রশ্ন তোলেন।

“বিক্ষোভ করার অনুমতি চেয়ে সিজেপির চিঠি জমা দেওয়ার পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের একটি স্থায়ী আদেশের ভিত্তিতে কীভাবে প্রতিবাদস্থল হিসেবে যন্তর মন্তরের স্বীকৃতি প্রত্যাহার করা হল?”—প্রশ্ন করেন আন্নামালাই।

তিনি আরও বলেন, “একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অব পুলিশকে বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়া হবে, আর তিনিই ঠিক করবেন কাউকে আগাম আটকে রাখা হবে কি না—এমন ব্যবস্থা আমরা আর কত দিন চালাব? অভিযুক্ত সিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগকারী দিল্লি পুলিশ। অথচ সেই মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় বসছেন দিল্লি পুলিশেরই এসিপি। হাওয়া কোন দিকে বইবে, তা তো এখন বোঝাই যাচ্ছে।”

তাঁর পরের প্রশ্ন, “১৩ অক্টোবর যন্তর মন্তর থেকে যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছিল, তাঁদের ১৯ অক্টোবরের জামিনের শুনানিতে বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, অর্থাৎ দিল্লি পুলিশের এসিপি, ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করে এলেন কেন? তার পর নিজের প্রাণের আশঙ্কা রয়েছে বলে শুনানি থেকে সরে দাঁড়ালেন কেন? এটা কি কোনও তামাশা হচ্ছে?”

আন্নামালাই জানতে চান, “আটজন জামিনদারকে কেন প্রত্যাখ্যান করা হল? জামিনদার হতে যিনি এসেছিলেন, তাঁকে বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জেরা করলেন কেন?”

নিট পরীক্ষা ঘিরে বিশৃঙ্খলার প্রতিবাদে আন্দোলন চলাকালীন পেলেট বন্দুক ব্যবহার কিংবা বিক্ষোভকারীদের মোকাবিলায় নির্ধারিত কার্যপদ্ধতি লঙ্ঘনকারী দিল্লি পুলিশের অন্যান্য পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা-ও জানতে চান তিনি।

আন্নামালাই বলেন, “আগের কংগ্রেস ও আপ সরকারের আমলে দিল্লির কোনও বিজেপি কার্যকর্তা কি কখনও মুচলেকার শর্ত ভাঙেননি? আমার তো বিশ্বাস, ব্যারিকেড টপকানো এবং নির্দেশ অমান্য করার সময়ও এই দিল্লি পুলিশই ছিল। তখন তাঁদের সঙ্গে কী আচরণ করা হয়েছিল? এ রকম? অবশ্যই নয়।”

তিনি আরও বলেন, “সম্প্রতি দেখলাম, দশেরার উৎসবের অঙ্গ হিসেবে একটি আরশোলার কুশপুতুল পোড়ানো হয়েছে। কৌতূহলবশত খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করলাম, জাতীয় স্তরে এই বিনা পয়সার প্রচারটা কে দিচ্ছেন। অবাক হওয়ার কিছু নেই। এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিজেপি বিধায়ক অশোক গোয়েল।”

আন্নামালাই জানান, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে কংগ্রেসের প্রতিবাদ সম্পর্কেও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। জানতে চেয়েছেন, “এসআইআর প্রক্রিয়া যখন চলছিল, তখন তাঁরা আসলে কী করছিলেন?”

তিনি বলেন, কোনও কোনও ব্যক্তি ভুল করে থাকতে পারেন বলেই “আমাদের গণতন্ত্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠানের গায়ে কালিমা লেপে না দিতে” বিরোধী দলগুলি এবং সিজেপিকে অনুরোধ করেছিলেন তিনি।

‘দেশবিরোধী’ তকমা দেওয়ার বিতর্কেও শাসক দলকে আক্রমণ করেন আন্নামালাই।

তিনি বলেন, “সব শেষে বলি, এই দেশবিরোধী বলার ব্যাপারটা অনেক হয়েছে। বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন বা এফসিআরএ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণে। দেশের সব সংস্থা তো বিরোধী দলগুলির কাছে রিপোর্ট করে না। বিদেশে থাকা সমস্ত দূতাবাসেই যথেষ্ট লোকবল রয়েছে, যাতে কোনও ভারতীয় নাগরিক বিদেশি শত্রুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করছেন কি না, তা নজরে রাখা যায়। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সমস্ত প্রতিবাদ ও বক্তব্যকে দেশবিরোধী এবং বিদেশি শক্তির অর্থে পরিচালিত বলে দেগে দেওয়া দেখতে দেখতে সত্যিই ক্লান্তি ও বিরক্তি ধরে যাচ্ছে।”

তিনি লেখেন, “আমার মনে হয়, কেন্দ্রীয় সরকার ভুলে যায় যে তারা দিল্লিতে বারো বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। অথচ নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখতে এখনও সব সময় একটি শত্রু তৈরি করে চলে। দুঃখের বিষয়, এ সত্যিই করুণ।”