বাংলাস্ফিয়ার: স্বতন্ত্র রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলে ২০৩১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য এক বছর সময় চেয়েছিলেন তামিলনাড়ু বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি। কিন্তু চার মাস কাটতে না কাটতেই সেই সময়সীমা ছোট হয়ে এসেছে।

আন্নামালাইয়ের ‘উই দ্য লিডার্স’ আন্দোলন পঞ্চাশ লক্ষ সদস্য সংগ্রহের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়েছিল। কিন্তু এই উদ্যোগের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের মতে, সমর্থকের সংখ্যা প্রায় কুড়ি লক্ষের গণ্ডি পেরোতে পারছে না। সদস্য সংগ্রহের ধীরগতির পাশাপাশি আরও একটি উদ্বেগ রয়েছে। সমর্থকদের কোনও নির্বাচনী লড়াইয়ে নামার সুযোগ দিতে বেশি দেরি করলে আন্নামালাইকে ঘিরে রাজনৈতিক উৎসাহ আরও স্তিমিত হয়ে যেতে পারে। হাতে অঢেল সময় আছে ভেবে যে রাজনৈতিক প্রকল্পের সূচনা হয়েছিল, সেটিই এখন বুঝতে পারছে, অতিরিক্ত সময়ও কখনও সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সেই কারণে আন্নামালাই নিজের পরিকল্পনা এগিয়ে আনতে শুরু করেছেন। ১৪ অক্টোবর তিনি ঘোষণা করেন, আগামী বছর হওয়ার কথা যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, তাতে ‘উই দ্য লিডার্স’ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। পরের দিন কোয়েম্বাটুরে তিনি উদ্বোধন করেন ‘আবদুল কালাম সেন্টার ফর এথিক্স অ্যান্ড পলিটিক্স’। তৃণমূল স্তরে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব গড়ে তোলার প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবেই প্রতিষ্ঠানটিকে তুলে ধরেছেন তিনি।

এই পরিবর্তনগুলি থেকে ইঙ্গিত মিলছে, রাজনৈতিক প্রস্তুতির জন্য নির্ধারিত এক বছর হয়তো ছয় মাসে নামিয়ে আনতে হবে। ফলে বিজেপির বাইরে আন্নামালাইয়ের প্রথম নির্বাচনী পরীক্ষাও এগিয়ে আসতে পারে।

আন্নামালাইয়ের সামনে বাধা :

সমস্যার একটি দিক হল রাজনৈতিক সময়ের হিসাব। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা ও এম করুণানিধির মৃত্যুর পরে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে যখন নতুন প্রজন্মের নেতাদের উঠে আসার জায়গা তৈরি হয়েছে বলে মনে হচ্ছিল, সেই সময়েই আন্নামালাই পরিচিতি পান। এখন সেই পরিসরে প্রতিযোগীর সংখ্যা অনেক বেশি।

বিজয়ের তামিলাগা ভেট্রি কাজাগম বা টিভিকে অভূতপূর্ব নির্বাচনী জয় পেয়ে সরকার গড়েছে। প্রাক্তন অভিনেতা সিনেমার পর্দা থেকে পৌঁছে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে। ফলে আন্নামালাইকে এখন এমন কোনও সম্ভাব্য নবাগত নেতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে না, যিনি ভবিষ্যতে রাজনীতিতে আসতে পারেন; তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ইতিমধ্যেই ক্ষমতায়। অভিনেতা ধনুষের সম্ভাব্য রাজনৈতিক অভিষেকের জল্পনা এই আলোচনায় আরও একটি নাম যোগ করেছে। তামিলনাড়ু একসময় তার পরবর্তী রাজনৈতিক তারকার অপেক্ষায় আছে বলে মনে হলেও, এখন সেই তারকা হওয়ার অডিশনেই বেশ ভিড়।

তবু এই প্রতিযোগীদের মধ্যে আন্নামালাইয়ের কিছু স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। প্রাক্তন এই আইপিএস অফিসার রাজ্যের সবচেয়ে স্পষ্ট ও সাবলীল বক্তাদের অন্যতম। তাঁর কয়েকজন প্রতিদ্বন্দ্বীও তা স্বীকার করেন।

ডিএমকের এক প্রবীণ নেতা বলেছেন, বিধানসভায় খুব অল্পসংখ্যক বিধায়ক নিয়েও আন্নামালাই বিজয়ের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারেন।

ওই নেতার কথায়, “উদয়নিধি স্ট্যালিন প্রবীণ রাজনীতিকদের একটি বড় দল সঙ্গে নিয়ে যা করেন, আন্নামালাই বিধানসভায় ঢুকতে পারলে প্রায় একাই বিজয়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী বিরোধিতা গড়ে তুলতে পারবেন—এমনকি তাঁর দল বিধানসভার সবচেয়ে ছোট দলগুলির একটি হলেও।”

এই মূল্যায়নে আন্নামালাইয়ের রাজনৈতিক জীবনের একটি বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে: ব্যক্তিগতভাবে তাঁর পরিচিতি ও প্রচারের ব্যাপ্তি প্রায়ই তাঁর হাতে থাকা সাংগঠনিক শক্তির তুলনায় অনেক বেশি।

বিজেপি ছাড়ার পরে এই ফারাক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্নামালাইয়ের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তির মতে, জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পাওয়াই যদি তাঁর প্রধান লক্ষ্য হত, তা হলে বিজেপির মধ্যেই তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষার জায়গা হতে পারত।

কিন্তু একটি স্বাধীন দল গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন অন্য ধরনের প্রস্তুতি। তাঁকে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার এবং তামিলনাড়ুর বিজয় সরকার—দুইয়ের থেকেই রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি করতে হবে।

পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে আন্নামালাই ছিলেন তামিলনাড়ুতে বিজেপির সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলির অন্যতম। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। অন্যদিকে, এআইএডিএমকে প্রধান এডাপ্পাডি কে পলানিস্বামী এবং বিজেপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা-সহ অন্য রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনও সংঘাত, কখনও সমঝোতার মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে।

আগের কয়েকটি রাজনৈতিক বিরোধেও তিনি অবস্থান বদলেছেন। প্রবীণ ডিএমকে নেতা টি আর বালুকে ঘিরে একটি মামলা প্রত্যাহার তার অন্যতম উদাহরণ। যে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিকেরা তাঁর সম্ভাবনা স্বীকার করেন, তাঁরাই আবার বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাড়াহুড়ো করে নেওয়ার প্রবণতা তাঁর রয়েছে।

তীব্র সমালোচনা :

এখন আন্নামালাই বিজেপি এবং মোদী সরকারের রাজনৈতিক আচরণের সমালোচনায় সরব হয়েছেন। ২১ অক্টোবর অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ এক বিবৃতিতে তিনি দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির বা সিজেপির নেতৃত্বাধীন প্রতিবাদ দমনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন। সেই সঙ্গে মনে করিয়ে দেন, ২০১১ সালে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন মোদী নিজেই দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যবস্থার সমালোচনা করেছিলেন।

আন্নামালাই বলেন, মোদী তখন ঠিক কথাই বলেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য স্পষ্ট: মোদী এখন যে সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেই সরকারের ক্ষেত্রেও একই গণতান্ত্রিক নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। বিক্ষোভকারীদের কেন দীর্ঘদিন আটক রাখা হচ্ছে, জামিনের জন্য পেশ করা জামিনদারদের কেন প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে এবং মামলায় জড়িত পুলিশবাহিনীরই একজন অফিসার কীভাবে কাউকে আটক রাখার বিষয়ে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন—এই প্রশ্নগুলি তোলেন তিনি।

ভিন্নমত পোষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত রাজনৈতিক ভাষা নিয়েই তাঁর সবচেয়ে তীক্ষ্ণ মন্তব্যটি ছিল। তিনি বলেন, “সবাইকে দেশবিরোধী তকমা দেওয়া যথেষ্ট হয়েছে।” তাঁর আরও অভিযোগ, কেন্দ্রে বারো বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পরেও সরকারকে যেন নিজের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে ক্রমাগত কোনও না কোনও শত্রু খুঁজতে হচ্ছে।

তবে এই বিবৃতি বিক্ষোভকারীদের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন ছিল না। আন্নামালাই জানান, সিজেপির বেশ কিছু পদ্ধতির সঙ্গে তিনি একমত নন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর চলাকালীন কংগ্রেসের ভূমিকাও তিনি প্রশ্নের মুখে তোলেন। কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের কারণে গোটা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকেই অবিশ্বাসযোগ্য বলে তুলে ধরা থেকে বিরোধী দলগুলিকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন।

তবু তাঁর বক্তব্যের গুরুত্ব কোথায় সরে গিয়েছে, তা স্পষ্ট। একসময় বিজেপির আক্রমণাত্মক জাতীয়তাবাদের সঙ্গে যাঁর পরিচয় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল, সেই রাজনীতিক এখন নাগরিক স্বাধীনতা, ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়া এবং ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারের কথা আরও জোর দিয়ে বলছেন। এই পরিবর্তন তাঁকে একটি বিশ্বাসযোগ্য স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় দিতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন অবশ্য এখনও অমীমাংসিত।

প্রাক্তন এই আইপিএস অফিসারের রাজনৈতিক যাত্রা যাঁরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, তাঁদের কাছে মূল প্রশ্ন হল: বিজেপিতে থাকাকালীন তৈরি হওয়া বিপুল অনুরাগীসমাজ এবং নিজের ওবিসি গাউন্ডার সম্প্রদায়ের মধ্যে থাকা উল্লেখযোগ্য সমর্থনের বাইরেও কি তিনি নতুন সমর্থক টানতে পারবেন?

প্রতিষ্ঠিত দলগুলির বিভিন্ন জেলায় পরিচিত নেতামুখ রয়েছে। কিন্তু ‘উই দ্য লিডার্স’ এখনও প্রায় পুরোপুরি আন্নামালাইকেন্দ্রিক। এই দুর্বলতা কাটানোর লক্ষ্যেই কোয়েম্বাটুরে কালাম কেন্দ্রের উদ্বোধন। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির নামে গড়ে ওঠা এই কেন্দ্রে দু’দিনের প্রাথমিক পাঠক্রম, চার সপ্তাহের নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ এবং একশো দিনের মাঠপর্যায়ের কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম দফার প্রশিক্ষণার্থীরা হলেন সামাজিক ও নাগরিক কাজে যুক্ত একশো জন মহিলা। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য, তৃণমূল স্তরে অন্তত এক লক্ষ স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া।

বিজয়কেও কি নিশানা করবেন?

তবে আন্নামালাইয়ের বর্তমান রাজনৈতিক বক্তব্যে একটি সংঘাত এখনও অনেকটাই অনুপস্থিত। তিনি বিজেপি ও মোদীকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেছেন, কিন্তু বিজয়ের বিরুদ্ধে এখনও একই মাত্রার আক্রমণে যাননি। অথচ তামিলনাড়ুতে তাঁর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সামনে সবচেয়ে প্রত্যক্ষ বাধা বিজয়ের সরকারই।

বিজেপির বিরোধিতা করেও টিভিকের বিরুদ্ধে জোরালো রাজনৈতিক লড়াই না করলে আন্নামালাইয়ের স্বাধীন আন্দোলনের উদ্দেশ্য অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। স্থানীয় নির্বাচন হয়তো তাঁকে নিজের পরিকল্পনার আগেই এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে।

কোয়েম্বাটুরের এক প্রবীণ আরএসএস নেতা বলেন, “আন্নামালাইয়ের সমস্যা তাই রাজনৈতিক যোগ্যতার অভাব নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীরাও মনে করেন, বিধানসভায় তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা নিতে পারেন। সমস্যাটি হল, মানুষের নজর কাড়ার সঙ্গে সেই মনোযোগ ধরে রাখতে সক্ষম একটি দল গড়ে তোলার ব্যবধান। এতদিন বিজেপির জড়ো করা শ্রোতাদের সামনে তাঁর বক্তৃতা সাড়া ফেলতে পারত। এখন শ্রোতাদের তাঁকেই জড়ো করতে হবে, তাঁদের সঙ্গে থাকার জন্য রাজি করাতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁদের কাছে ভোট চাইতে হবে।”

তাঁর সংযোজন, “কর্মসূচির সময়সূচি এগিয়ে এসেছে। আন্দোলনও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গতি বাড়াতে পেরেছে কি না, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।”