প্রথাভাঙা আখ্যান, অন্ধকার কৌতুক আর সমাজের অস্বস্তিকর বাস্তবকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরার জন্য পরিচিত জাপানি লেখক ও চলচ্চিত্রকার রিউ মুরাকামি প্রয়াত। বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। তাঁর জাপানি প্রকাশক গেনতোশা জানিয়েছে, গত ১৭ অক্টোবর নিজের বাড়িতেই মৃত্যু হয় তাঁর।
সমকালীন জাপানি সাহিত্যের অন্যতম বেপরোয়া ও বিদ্রোহী কণ্ঠ ছিলেন মুরাকামি। তাঁর উপন্যাসে বারবার উঠে এসেছে হিংসা, মাদক, যৌনতা এবং বিচ্ছিন্নতায় ভোগা মানুষের জীবন। এসব বিষয়কে নিছক চমক হিসেবে ব্যবহার না করে জাপানি ও আমেরিকান সংস্কৃতির অন্ধকার দিক, সামাজিক মূল্যবোধের সংকট এবং তরুণ প্রজন্মের মোহভঙ্গকে তীক্ষ্ণভাবে তুলে ধরেছেন তিনি।
ব্রিটিশ প্রকাশনা সংস্থা পুশকিন প্রেসের প্রকাশক ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যাডাম ফ্রয়ডেনহাইম বলেছেন, “রিউ মুরাকামির অদ্ভুত, মৌলিক এবং চলচ্চিত্রের মতো দৃশ্যময় বহু উপন্যাস ইংরেজিভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারা আমাদের কাছে এক বিরাট সৌভাগ্য।” ব্রিটেনে ব্লুমসবেরির পাশাপাশি পুশকিন প্রেসও তাঁর বইয়ের অনুবাদ প্রকাশ করেছে।
১৯৫২ সালে নাগাসাকি প্রদেশের সাসেবো শহরে জন্ম মুরাকামির। বাবা-মা দু’জনেই ছিলেন শিক্ষক। হাইস্কুলে পড়ার সময় একটি রক ব্যান্ডে ড্রামার হিসেবে যোগ দেন তিনি। ছাত্রাবস্থাতেই প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন। স্কুলের ছাদে একটি প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার কারণে তাঁকে তিন মাস গৃহবন্দি রাখা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখালিখিতেও সেই বিদ্রোহী মনোভাবের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রথম বইতেই বাজিমাত
১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয় মুরাকামির প্রথম উপন্যাস ‘অলমোস্ট ট্রান্সপারেন্ট ব্লু’। ছাত্রাবস্থায় লেখা এই বইয়ের কথক রিউ নামের এক চরিত্র। মোহভঙ্গ হওয়া একদল তরুণ-তরুণীর জীবন, মাদক, যৌনতা এবং অর্থহীনতার অনুভূতি ঘিরে আবর্তিত হয়েছে উপন্যাসটি। প্রকাশের পরই আলোড়ন ফেলে বইটি। নবীন লেখকদের জন্য গুনজো পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি জাপানের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্যসম্মান আকুতাগাওয়া পুরস্কারও জিতে নেয় এটি।
একই পদবি হওয়ায় অনেকেই তাঁকে জনপ্রিয় জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। তবে দু’জনের মধ্যে কোনও আত্মীয়তা ছিল না। তাঁদের লেখার ধরনেও রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্য। ২০১৩ সালে সাংবাদিক ডেভিড পিলিং রিউয়ের লেখাকে বর্ণনা করেছিলেন “আরও তীক্ষ্ণ, আরও ক্ষুব্ধ” বলে। তাঁর তুলনায়, “হারুকি যদি জাপানি সাহিত্যের বিটলস হন, তা হলে রিউ তার রোলিং স্টোনস।”
এই তুলনাই যেন রিউ মুরাকামির সাহিত্যিক স্বভাবের পরিচয়—যেখানে মসৃণতার চেয়ে সংঘাত, স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তি এবং প্রচলিত নৈতিকতার চেয়ে মানুষের জটিল বাস্তব বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
অন্ধকারের গভীরে তাঁর গল্প
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সাহিত্যজীবনে চল্লিশটির বেশি উপন্যাস ও ছোটগল্পের সংকলন লিখেছেন মুরাকামি। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের তালিকায় রয়েছে ‘কয়েন লকার বেবিজ’, ‘ইন দ্য মিসো স্যুপ’, ‘অডিশন’, ‘পিয়ার্সিং’ এবং ‘পপুলার হিটস অব দ্য শোওয়া এরা’। তবে তাঁর বহু রচনা এখনও ইংরেজিতে অনূদিত হয়নি।
তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সমাজের অন্ধকার কোণগুলিকে সামনে নিয়ে আসা। হিংসা, বিচ্ছিন্নতা, অপরাধ কিংবা মানুষের মানসিক বিপর্যয়—কোনও বিষয় থেকেই মুখ ফিরিয়ে নেননি তিনি। তাঁর আখ্যানের চরিত্রেরা প্রায়ই এমন এক জগতে বাস করে, যেখানে পরিচিত সামাজিক নিয়ম ও নৈতিকতার ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়।
মুরাকামির বহু রচনা চলচ্চিত্রে রূপ পেয়েছে। সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ ‘অডিশন’, যা ১৯৯৯ সালে পরিচালনা করেন তাকাশি মিইকে। ছবিটির কেন্দ্রে রয়েছেন এক বিপত্নীক পুরুষ, যিনি নতুন সঙ্গী খুঁজতে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য একটি ভুয়ো অডিশনের আয়োজন করেন। কিন্তু সেই আপাত নিরীহ পরিকল্পনা ক্রমে ভয়াবহ মোড় নেয়। হিংসা ও মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্কের মিশেলে ছবিটি আন্তর্জাতিক দর্শকের নজর কাড়ে।
২০০৯ সালে দ্য গার্ডিয়ান-এ উপন্যাসটি নিয়ে লিখতে গিয়ে স্কটিশ লেখক ইরভিন ওয়েলশ মুরাকামির গদ্যকে “বিষাদময় ও হৃদয়স্পর্শী” বলে বর্ণনা করেছিলেন। তবে সেই গদ্যের মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন কসাইয়ের ছুরি কিংবা শল্যচিকিৎসকের স্ক্যালপেলের মতো ধার, যা পাঠককে সরাসরি আঘাত করে।
পরিত্যক্ত শিশু, সমাজের ক্ষত
মুরাকামির তৃতীয় উপন্যাস ‘কয়েন লকার বেবিজ’-এ রয়েছে জিনিসপত্র রাখার লকারে পরিত্যক্ত দুই শিশুর কাহিনি। তাদের বেড়ে ওঠা, পরিচয় খোঁজার লড়াই এবং সমাজের সঙ্গে সংঘাতের মধ্য দিয়ে লেখক নির্মাণ করেছেন এক অস্বস্তিকর, প্রায় পরাবাস্তব জগৎ। বইটি নোমা সাহিত্য পুরস্কারের নবীন প্রতিভা বিভাগে সম্মানিত হয়েছিল।
২০২০ সালে দ্য গার্ডিয়ান-এর লেখক রাসেল টমাস জাপানের পটভূমিতে লেখা সেরা বইগুলির মধ্যে উপন্যাসটিকে জায়গা দিয়েছিলেন। তাঁর বর্ণনায়, এটি বেড়ে ওঠার এক পরাবাস্তব আতঙ্কের গল্প, যা প্রেম ও মহাতারকা হয়ে ওঠার উচ্চতা থেকে উন্মাদনা ও হত্যার অতলে দ্রুত নেমে যায়। টমাসের মতে, সমাজের সবচেয়ে অন্ধকার কোণগুলিতে আলো ফেলতে কখনও পিছপা হন না মুরাকামি।
তাঁর মৃত্যুর খবরে শোকপ্রকাশ করে ফ্রয়ডেনহাইম জানিয়েছেন, পুশকিন প্রেসের সকলে এই সংবাদে মর্মাহত। পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লেখকের অগণিত পাঠকের প্রতিও সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি।
রিউ মুরাকামির সাহিত্য পাঠককে স্বস্তি দেওয়ার চেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মানুষের হিংস্রতা, একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং সভ্যতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারকে তিনি বারবার টেনে এনেছেন গল্পের কেন্দ্রে। তাঁর মৃত্যুতে থামল এক বিদ্রোহী সাহিত্যিকের জীবন; কিন্তু তাঁর সৃষ্ট অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলি থেকে গেল পাঠকের সামনে।