বাংলাস্ফিয়ার: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করেছে মার্কিন ও ইজরায়েলি সামরিক বাহিনী। মার্কিন আধিকারিক এবং এই বিষয়ে আলোচনার খবর জানেন, এমন অন্য কয়েক জন সূত্রে এ কথা জানা গিয়েছে।

স্বল্পস্থায়ী কিন্তু তীব্র একটি সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে মহড়াও বাড়িয়েছে দুই দেশের বাহিনী। হামলার কৌশল অনুশীলন করতে ইরাকের আকাশে বিমান ওড়ানো হচ্ছে। মার্কিন আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, নতুন হামলা নিয়ে আলোচনা করতে প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ এই সপ্তাহে ইজরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে ইরানের জ্বালানি পরিকাঠামো, পরমাণু স্থাপনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের অস্ত্রভান্ডার। কিছু আধিকারিকের ধারণা, আর এক দফা বড় হামলা ইরানের অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের অতলে ঠেলে দিতে পারে। প্রায় আট মাসের সংঘাতের পর তা দেশটিকে কূটনৈতিক আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য করবে।

তবে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তা ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে চালানো তীব্র মার্কিন–ইজরায়েলি হামলার প্রথম পর্যায়ের চেয়ে বেশি সফল হবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আগের দফার লড়াই বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছিল এবং পেন্টাগনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের ভান্ডারে প্রবল টান ফেলেছিল।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যে নতুন হামলায় অনুমোদন দেবেন, তা-ও মোটেই নিশ্চিত নয়। এ বছর বড় মাপের সামরিক অভিযান আবার শুরু করার পরিকল্পনা তিনি বারবার আটকে দিয়েছেন। এই মাসেও মার্কিন ও ইজরায়েলি বাহিনী হামলার জন্য প্রায় প্রস্তুত হয়ে যাওয়ার পর তিনি তা নাকচ করেন।

এই প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া সমস্ত আধিকারিকই সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বক্তব্য জানিয়েছেন।

ইরানের আধিকারিকেরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এ বার পাল্টা হামলা কেবল ওই অঞ্চলের বাণিজ্যিক জাহাজ ও জ্বালানি পরিকাঠামোয় সীমাবদ্ধ থাকবে না। তথ্যকেন্দ্র এবং সমুদ্রের তলায় থাকা ইন্টারনেটের তারও তাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় যুক্ত হবে।

তাঁদের বক্তব্য, লড়াই দ্রুত শেষ হবে না, সীমিতও থাকবে না।

আমেরিকা বিপুল অস্ত্রসম্ভার জড়ো করছে, যা নভেম্বরের গোড়ার মধ্যে পুরোপুরি নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে যাবে। পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চলছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালীর উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের দাবি আদায়ে অগ্রগতির জন্য যুদ্ধ ফের শুরু হওয়ার সম্ভাবনাকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন মার্কিন আলোচকেরা।

কিন্তু এখনও পর্যন্ত ইরানের আলোচকেরা পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ছাড় দিতে রাজি হননি। তাঁদের জোরালো দাবি, আলোচনার পরবর্তী পর্যায় পর্যন্ত বিষয়টি স্থগিত রাখতে হবে।

কিছু মার্কিন পরিকল্পনাকারী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, তিন দিনের তীব্র সামরিক অভিযান ইরানের অর্থনীতির এতটাই ক্ষতি করতে পারে যে দেশটি অবস্থান বদলাতে বাধ্য হবে।

কিন্তু মার্কিন আধিকারিকেরা এর আগেও বহু বার ইরানের পতনের পূর্বাভাস দিয়েছেন। অন্য পশ্চিমি আধিকারিকেরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, অর্থনীতির উপর চাপ থাকা সত্ত্বেও ইরানের সরকার এখনও পর্যন্ত তা সামলে টিকে রয়েছে।

বাইডেন প্রশাসনে পেন্টাগনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির শীর্ষ দায়িত্বে থাকা ডানা স্ট্রুল বলেন, “যুদ্ধের এই পর্যায়ে একটি বিষয় স্পষ্ট। এখনও পর্যন্ত চালানো প্রচলিত সামরিক অভিযান, বর্তমানের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন নৌ-অবরোধ—কোনও কিছুই ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে অর্থবহ আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে পারেনি।”

বর্তমানে ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সঙ্গে যুক্ত স্ট্রুলের বক্তব্য, ট্রাম্প বা নেতানিয়াহু, কেউই “ক্রমশ অস্থির ও সংঘাতজর্জরিত হয়ে ওঠা এই অঞ্চলে আরও যুদ্ধ কী ভাবে এই কৌশলগত সংকটের সমাধান করবে, তার কোনও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।”

২৭ অক্টোবর ইজরায়েলের নির্বাচন এই পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নেতানিয়াহু হেরে গেলে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাবেন। সেই অবস্থায় তাঁর পক্ষে যুদ্ধ শুরু করা কঠিন হবে।

তবে কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, আমেরিকা ও ইজরায়েলের আসন্ন যৌথ হামলার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহু তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের উপর একটি জাতীয় ঐক্যের সরকারে যোগ দেওয়ার চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। যুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠিত সেই সরকার তাঁর ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ বাড়িয়ে দিতে পারে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইজরায়েলে হামলা চালানোর পরে নেতানিয়াহু একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গড়েছিলেন। জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করার জন্য কয়েক জন বিরোধী নেতাকে যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

ইজরায়েলি রাজনৈতিক ভাষ্যকার এবং নেতানিয়াহুর জীবনীকার মাজাল মুয়ালেম বলেন, “এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি একটি বৃহত্তর জরুরি সরকার গঠনের আহ্বান জানাতে পারেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা বিষয়টিকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখবেন।”

তিনি বলেন, “ইরান হামলা চালালে সেটা এক রকম বিষয়। কিন্তু নিজে থেকে আক্রমণাত্মক অভিযান শুরু করা তাঁর পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হবে।”

আধিকারিকদের বক্তব্য, ট্রাম্প এই মাসেই অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—এমন সামান্য সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মার্কিন নির্বাচনের পর পর্যন্ত তাঁর অপেক্ষা করার পক্ষে বহু রাজনৈতিক কারণ আছে। তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল, এই মাসের গোড়াতেই তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ভোটের আগে হামলা করবেন না।

নভেম্বরের গোড়ার আগে আমেরিকার সমস্ত সামরিক শক্তি নির্ধারিত স্থানে মোতায়েন সম্পূর্ণ হবে না। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি বিমানবাহী রণতরী, কয়েক হাজার মেরিন সেনা, যুদ্ধবিমান এবং বিশেষ অভিযানকারী বাহিনী। মার্কিন সামরিক বাহিনী রাতের অন্ধকারে হামলা চালাতে বেশি স্বচ্ছন্দ। আগামী মাসের গোড়ায় ইরানে রাতের দৈর্ঘ্যও বাড়বে।

যুদ্ধ আরও বড় সংঘাতে পরিণত হতে পারে বলেও উদ্বেগ রয়েছে। বুধবার মার্কিন বিদেশ দফতর জরুরি দায়িত্বে নিযুক্ত নন, এমন সরকারি কর্মী এবং তাঁদের পরিবারকে সৌদি আরব ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুতি মিলিশিয়া সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

হোয়াইট হাউসের এক আধিকারিক বুধবার বলেন, এমন সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে প্রশাসন মন্তব্য করে না, “যার অস্তিত্ব থাকতেও পারে, না-ও থাকতে পারে।” তিনি আরও বলেন, ইরান যাতে পরমাণু অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে ট্রাম্প সব বিকল্পই খোলা রাখছেন।

কিছু আধিকারিকের বক্তব্য, হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সময় তেল শোধনাগার এবং তেল-সংক্রান্ত পরিকাঠামো এড়িয়ে যাওয়া হবে। কারণ, ট্রাম্প চান না পেট্রলের দাম আরও বাড়ুক।

পরিকল্পনার বিষয়ে অবহিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিরুদ্ধে অভিযানের ছক তৈরি করছে ইজরায়েল ও আমেরিকা, উভয়ের সামরিক বাহিনী। তার মধ্যে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে হামলাও থাকতে পারে। মাটির গভীরে অবস্থিত এই পরমাণু স্থাপনাটিকে ইরানিরা ‘কুহ কোলাং’ বলে থাকেন।

ট্রাম্প গত সপ্তাহে বলেছেন, পিকঅ্যাক্সে হামলা চালাতে তিনি ২২ হাজার পাউন্ড ওজনের জিবিইউ-৪৩/বি ‘ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট’ বোমা, সংক্ষেপে ‘মোয়্যাব’, ব্যবহারের কথা ভাবছেন। আধিকারিকদের বক্তব্য, অস্ত্রটির প্রতি ট্রাম্পের বিশেষ আকর্ষণের একটি কারণ তার ডাকনাম—‘মাদার অব অল বম্বস’, অর্থাৎ ‘সব বোমার জননী’।

কিন্তু অস্ত্রবিশেষজ্ঞেরা বলছেন, মোয়্যাব মাটির উপরে বিস্ফোরিত হয় এবং বিস্তীর্ণ এলাকায় বিস্ফোরণের অভিঘাত ছড়িয়ে দেয়। গ্রানাইট শিলার গভীরে তৈরি পিকঅ্যাক্সের মতো ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংস করতে সেটি সম্ভবত সক্ষম হবে না। সামরিক আধিকারিকেরা আরও সতর্ক করছেন, এই বোমা ফেলতে হয় ধীরগতির এমসি-১৩০ পরিবহণ বিমান থেকে। সেই বিমান ইরানের বিমানবিধ্বংসী গোলার মুখে সহজেই বিপন্ন হতে পারে।

পরিকল্পনার বিস্তারিত জানেন, এমন মার্কিন ও ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা আধিকারিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই মাসের গোড়ায় ইরানে হামলা চালানোর একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল দুই দেশ। কিন্তু ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে আবার হামলা পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অভিযান শুরুর অল্প আগে এই সিদ্ধান্ত আসে। তত ক্ষণে দুই বাহিনীই ব্যাপক প্রস্তুতি সেরে নিজেদের বিমানবাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রেখেছিল।

এক জন সামরিক কমান্ডার জানিয়েছেন, বারবার পরিকল্পনা তৈরি এবং তার পরে নতুন হামলা থেকে সরে আসার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে সামরিক পরিকল্পনাকারীদের “প্রতিদিনই হঠাৎ দিকবদলের ধাক্কা” সামলাতে হচ্ছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্প যে সামরিক বিকল্পই বেছে নিন, তা কার্যকর করার জন্য তাঁরা প্রস্তুত থাকার চেষ্টা করছেন। অভিযানের বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য ওই কমান্ডারও নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়েছিলেন।

এখনও পর্যন্ত যুদ্ধের প্রতিটি দফার পরে ইরানের নেতৃত্ব আরও কম আপসমুখী হয়েছে। তাদের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে যে, আমেরিকা ও ইজরায়েলের চূড়ান্ত লক্ষ্য তাদের সরকারকে উৎখাত করা।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা মোজতবা খামেনেই এখনও মার্কিন ও ইজরায়েলি গোয়েন্দা আধিকারিকদের কাছে এক রহস্য। কিছু আধিকারিকের বক্তব্য, যুদ্ধের গোড়ায় নিহত তাঁর বাবার মতো ক্ষমতাবান তিনি নন। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি নিচ্ছেন ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ডস কোরের কট্টরপন্থী সদস্যেরা।

ইরানের আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, আমেরিকার যুদ্ধ-পরিকল্পনা সম্পর্কে তাঁরা অবহিত। তাঁরাও নতুন লক্ষ্যবস্তু ও কৌশল নির্ধারণ করছেন।

তেহরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক পেইমান সালেহি বলেন, পিকঅ্যাক্সে হামলা হলে ইরানের পাল্টা আঘাতের পরিকল্পনার একটি অংশ হবে সৌদি আরবের বড় তেল শোধনাগারগুলিতে হামলা। এর মধ্যে আরামকোর শোধনাগারও থাকবে। কারণ, এর ফলে তেল ও জ্বালানির দাম সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে বাড়বে।

সালেহি বলেন, “এই যুদ্ধ আমাদের বুঝিয়েছে, ট্রাম্পের উপর চাপ তৈরির সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হল তেল ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেওয়া। কারণ, তাতে আমেরিকার মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে।”

ইরানের আলোচক জেনারেল মহম্মদ বাঘের গালিবাফের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মদি এই সপ্তাহে সমাজমাধ্যমে বলেছেন, আমেরিকা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ইরানে আর এক দফা হামলা শেষ করে ফেলবে—এই ধারণা একটি “কল্পনা”। যুদ্ধ কখন শেষ হবে, তা ইরানই নির্ধারণ করবে। তিনি মনে করিয়ে দেন, ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুদ্ধ চলবে দু’সপ্তাহ।

মোহাম্মদি বলেন, “আমাদের হামলা হবে আরও তীব্র, আরও অভিনব এবং ভিন্ন ধরনের। আমরা দৃঢ়সংকল্প ও আত্মবিশ্বাসী। জোরদার পরিকল্পনাও তৈরি রয়েছে।”