বাংলাস্ফিয়ারঃ ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই ভারতের বাজারে ফেরারির গাড়ির বরাত দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ইউরোপ থেকে আমদানি করা গাড়ির উপর শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, এই প্রত্যাশায় আগাম গাড়ি বুক করছেন ক্রেতারা। ইতালির বিলাসবহুল ক্রীড়া গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থাটির শীর্ষকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের গোড়ায় চুক্তি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনাকে সামনে রেখে ভারতীয় ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে।
নয়াদিল্লিতে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকে ফেরারির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং দূরপ্রাচ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তারা জানান, তাঁদের আন্তর্জাতিক ব্যবসার পরিকল্পনায় ভারতকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত দু’বছরে সেই লক্ষ্যেই সংস্থার অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। অর্থাৎ, সম্ভাব্য শুল্কছাড়ের সুযোগের পাশাপাশি ভারতীয় বাজারের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে ফেরারি।
সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান চার্লস আঁতোয়ান জেনেস্তের বক্তব্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য ক্রেতারা ইতিমধ্যেই বিক্রয়কেন্দ্রে এসে গাড়ির বৈশিষ্ট্য বেছে নেওয়া এবং দাম সম্পর্কে জানতে চাইছেন। ফেরারির গাড়ি পেতে অপেক্ষা করতে হয়। তাই আগামী বছরে বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হওয়ার প্রত্যাশায় অনেকে এখনই বরাত দিয়ে অপেক্ষমাণ তালিকায় নাম তুলছেন। ভবিষ্যতে গাড়ির দাম তুলনায় নাগালের মধ্যে আসতে পারে, এই ধারণা তাঁদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
ফেরারির দূরপ্রাচ্য ও মধ্যপ্রাচ্য বিভাগের প্রেসিডেন্ট ফ্রানচেস্কো বিয়াঙ্কি জানিয়েছেন, প্রায় দু’বছর আগে থেকেই ভারতের বাজারকে আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ শুরু করে সংস্থা। চাহিদা বাড়ার লক্ষণ দেখে ভারতের জন্য আলাদা মনোযোগ ও কর্মীসংস্থানের প্রয়োজন অনুভূত হয়। তাঁর বক্তব্য, আগের সাংগঠনিক কাঠামো দিয়ে এই বাজারের সম্পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছিল না। তাই ভারতকে কেন্দ্র করে কাজ করার জন্য বিশেষ দল গড়া হয়েছে।
বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিক্রয় ও পরিষেবার পরিকাঠামোও বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে নয়াদিল্লি, মুম্বই এবং বেঙ্গালুরুতে ফেরারির উপস্থিতি রয়েছে। চলতি বছরের শেষে আমদাবাদ ও চেন্নাইয়ে নতুন কেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তা বাস্তবায়িত হলে পাঁচটি বড় শহরে পৌঁছে যাবে সংস্থার বিক্রয়ব্যবস্থা। নতুন ক্রেতাদের কাছে পৌঁছনোর পাশাপাশি গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধাও এই সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গাড়ির নিবন্ধনের পরিসংখ্যানেও বৃদ্ধির ইঙ্গিত মিলছে। ‘বাহন’ ব্যবস্থার তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতে ৩৫টি ফেরারি নিবন্ধিত হয়েছিল। ২০২৫ সালে সংখ্যাটি বেড়ে হয় ৪৫। ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসেই ৪৫টি নিবন্ধন হয়েছে। তবে এই হিসাবকে বরাত দ্বিগুণের দাবির সঙ্গে মেলানো যাবে না। বরাত ভবিষ্যৎ সরবরাহের চাহিদা বোঝায়, আর নিবন্ধন ইতিমধ্যে বাজারে আসা গাড়ির হিসাব।
চাহিদা আরও বাড়লে ভারতের জন্য গাড়ির বরাদ্দ বাড়াতে প্রস্তুত ফেরারি। তবে কত অতিরিক্ত গাড়ি আসবে কিংবা কবে থেকে সরবরাহ বাড়বে, তা সংস্থা জানায়নি। বিশ্বজুড়ে সীমিত উৎপাদন এবং ব্র্যান্ডের বিশেষ মর্যাদা বজায় রাখার নীতিও বহাল থাকছে। ফলে আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একই অনুপাতে গাড়ি সরবরাহ বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
চুক্তির শুল্কছাড় নিয়েও কিছু বিষয় স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন। ইউরোপীয় কমিশনের ঘোষণায় গাড়ির শুল্ক ধাপে ধাপে সর্বোচ্চ ১১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশে আনার কথা রয়েছে। অর্থাৎ, চুক্তি চালু হলেই সব ইউরোপীয় গাড়িতে একযোগে ১০ শতাংশ শুল্ক বসবে, এমন নয়। ছাড়ের নির্দিষ্ট শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট গাড়ির যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ইউরোপীয় কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও উভয় পক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পরেই চুক্তি কার্যকর হতে পারবে। তাই ২০২৭ সালের গোড়ার সময়সীমাকে প্রত্যাশিত সময় হিসেবেই দেখতে হবে। ফেরারির ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত দাম কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে প্রযোজ্য শুল্ক এবং সংস্থার মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্তের উপর। আপাতত নিশ্চিত পরিবর্তনটি ক্রেতাদের আগ্রহে: শুল্কছাড় হাতে আসার আগেই সম্ভাব্য সুবিধার প্রত্যাশা ভারতের বাজারে নতুন বরাত টানছে। এই আগ্রহ বাস্তব বিক্রয়ে কতটা প্রতিফলিত হয়, নজর থাকবে সেদিকে।