বাংলাস্ফিয়ারঃ সামরিক শক্তি প্রদর্শনের ধারাবাহিকতায় ফের সমুদ্রের দিকে অস্ত্র ছুড়ল উত্তর কোরিয়া। সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানায়, উত্তর কোরিয়া তার পূর্ব দিকের জলসীমা অভিমুখে অন্তত একটি বস্তু উৎক্ষেপণ করেছে। প্রাথমিকভাবে সেটিকে ক্ষেপণাস্ত্র বলে নিশ্চিত করা হয়নি। তবে প্রতিবেশী জাপানও উৎক্ষেপণ শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম বিভিন্ন সামরিক ব্যবস্থার ভান্ডার বাড়াতে পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে পিয়ংইয়ং।
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের প্রাথমিক বিবৃতিতে উৎক্ষেপিত অস্ত্রটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কি না, তা জানানো হয়নি। সেটি কত দূর উড়েছে, সেই তথ্যও তখন প্রকাশ করা হয়নি। ফলে অস্ত্রটির ক্ষমতা বা নির্দিষ্ট পাল্লা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ ছিল না। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির দপ্তর অবশ্য উৎক্ষেপিত বস্তুটিকে সম্ভাব্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছে।
জাপানের পরবর্তী তথ্য অনুযায়ী, সকালে পরপর একাধিক সন্দেহভাজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়ে থাকতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, জাপানি কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক মূল্যায়নে সেগুলি দেশটির একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে পড়েছে। তবে এই মূল্যায়নকে অস্ত্রের ধরন, সংখ্যা এবং গতিপথ সম্পর্কে চূড়ান্ত অনুসন্ধানের ফল হিসেবে দেখানো হয়নি।
জাপানের উপকূলরক্ষী বাহিনী স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ২৬ মিনিট নাগাদ প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তথ্যের ভিত্তিতে জানায়, সন্দেহভাজন একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইতিমধ্যেই সমুদ্রে পড়ে গিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সকাল ৯টা ৪০ মিনিট নাগাদ আরও একটি উৎক্ষেপণের খবর দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজগুলিকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সংকট মোকাবিলা কেন্দ্রে বিভিন্ন মন্ত্রকের আধিকারিকদের নিয়ে জরুরি দল গঠন করা হয়। তাকাইচি তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেন। বিমান এবং জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও তাঁর নির্দেশে গুরুত্ব পেয়েছে। জাপানে উৎক্ষেপণের কোনও প্রভাব পড়েছে কি না, তা যাচাই করতে তথ্য সংগ্রহের কথা জানিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক।
এই ঘটনার আগে, গত সপ্তাহেই দক্ষিণ কোরিয়া নিজেদের তৈরি প্রথম হাইপারসনিক অস্ত্রের পরীক্ষামূলক উড়ান চালায়। শব্দের গতির অন্তত পাঁচ গুণ বেগে চলা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে অস্ত্রটি তৈরি হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ুং ওই পরীক্ষাকে দেশের প্রচলিত সামরিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন।
ওই পরীক্ষার বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বিবৃতিতে বলা হয়, নির্ধারিত উচ্চতায় অস্ত্রটি তার বুস্টার রকেট থেকে আলাদা হয়। পরে উচ্চতা ও দিক পরিবর্তন করে পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে। লি নিজের দেশের সামরিক শক্তির ভিত্তিতে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তবে দক্ষিণের এই পরীক্ষা এবং সোমবার উত্তরের উৎক্ষেপণের মধ্যে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সোলের বক্তব্য, অস্ত্রটির উন্নয়ন সম্পূর্ণ হলে তা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আকস্মিক আঘাত হানতে পারবে। পরীক্ষাস্থল কোথায়, অবশ্য সেই তথ্য বিবৃতিতে প্রকাশ করা হয়নি।
উত্তর কোরিয়াও ৩ অক্টোবর একটি অস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছিল। পিয়ংইয়ং সেটিকে মাঝারি পাল্লার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র বলে দাবি করে। তাদের বক্তব্য ছিল, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই সেটি তৈরি। সোমবারের অস্ত্রটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে নিশ্চিত হলে, ৩ অক্টোবরের পর নয় দিনের ব্যবধানে এমন আরেকটি উৎক্ষেপণ হিসেবে তা চিহ্নিত হবে।
কিম জং উনের নেতৃত্বে উত্তর কোরিয়া সাম্প্রতিক সময়ে অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, সরাসরি গোলাবারুদের মহড়া এবং নতুন যুদ্ধজাহাজকে বহরে অন্তর্ভুক্ত করার কাজও এগিয়েছে। একই সঙ্গে সোলের প্রতি কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে দেশটি। দীর্ঘদিন থমকে থাকা কূটনৈতিক আলোচনা ফের শুরু করার মার্কিন ও দক্ষিণ কোরীয় প্রস্তাবেও ইতিবাচক সাড়া দেয়নি পিয়ংইয়ং।
দুই কোরিয়ার উত্তেজনা আরও বেড়েছে গত মাসে সীমান্তের কাছে স্থলমাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত হওয়ার ঘটনায়। দক্ষিণের সামরিক বাহিনী এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রপুঞ্জের কমান্ডের সিদ্ধান্ত ছিল, উত্তর কোরিয়ার পাতা মাইন থেকেই বিস্ফোরণ ঘটেছে। পিয়ংইয়ং সেই দায় অস্বীকার করেছে এবং ক্ষমা চাওয়ার দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছে।
এই পটভূমিতে সোমবারের উৎক্ষেপণকে ঘিরে প্রধান প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে অস্ত্রটির প্রকৃতি এবং তার প্রকৃত সক্ষমতা। প্রাথমিক সতর্কবার্তা ও পরবর্তী সামরিক বিশ্লেষণ এক বিষয় নয়। পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম ব্যবস্থা বাড়ানোর বৃহত্তর কর্মসূচির কথা জানা গেলেও, এদিনের অস্ত্রে পরমাণু ওয়ারহেড ছিল বলে কোনও তথ্য দেওয়া হয়নি। বিস্তারিত মূল্যায়নই স্পষ্ট করবে সর্বশেষ পরীক্ষাটি আগের অস্ত্র প্রদর্শনের ধারাবাহিকতা, নাকি নতুন কোনও সক্ষমতার পরীক্ষা।