ডেটলাইন: মিউনিখ
শুভ্রাংশু মুখোপাধ্যায়: অক্টোবর মাসটা মিউনিখে এমনিতেই একটু অন্যরকম। গ্রীষ্মের রেশ ততদিনে প্রায় মিলিয়ে গেছে। সকাল-বিকেলের বাতাসে ঠান্ডার ছোঁয়া। গাছের পাতায় সবুজের জায়গা নিতে শুরু করেছে হলুদ, কমলা আর লাল। ঠিক এই সময়েই ক্যালেন্ডারে আসে ৩ অক্টোবর। জার্মানিতে জাতীয় ছুটির দিন। পোশাকি নাম Tag der Deutschen Einheit। বাংলায় বললে, জার্মান ঐক্য দিবস। ২০১৫ থেকে মিউনিখে আছি। প্রথম দিকে ৩ অক্টোবর আমার কাছে ছিল আর পাঁচটা ছুটির দিনের মতোই। অফিস নেই, বেশিরভাগ দোকান বন্ধ। তাই আগের দিন বাজার করতে ভুলে গেলে বিপদ! এর বেশি খুব একটা ভাবিনি। কিন্তু একটা দেশে অনেকগুলো বছর কাটিয়ে দিলে সেই দেশের কিছু দিন, কিছু উৎসব, কিছু ইতিহাস ধীরে ধীরে আর বাইরের মানুষের চোখে দেখা হয় না। কোথাও যেন নিজের রোজনামচার মধ্যেও ঢুকে পড়ে। ৩ অক্টোবরও আমার কাছে এখন ঠিক তেমনই একটা দিন। আজ Munich থেকে Berlin যেতে গেলে কয়েক ঘণ্টার ট্রেনযাত্রা। অথচ খুব বেশি দিনের কথা নয়, এই একই জার্মানির ছিল দুটো নাম, দুটো সরকার, দুটো আলাদা রাজনৈতিক ব্যবস্থা। আর Berlin শহরের মাঝখান দিয়ে চলে গিয়েছিল এমন একটা দেওয়াল, যা শুধু একটা শহরকেই নয়, পরিবার, বন্ধুত্ব আর অসংখ্য মানুষের জীবনকেও দু’দিকে ভাগ করে দিয়েছিল। এক দেশ থেকে দুই জার্মানি গল্পটার শুরু অবশ্য আরও আগে। ১৯৪৫। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। নাৎসি জার্মানি পরাজিত। যুদ্ধের পরে জার্মানি ভাগ হল মিত্রশক্তির চারটি occupation zone-এ। সেই ভাগাভাগিই কয়েক বছরের মধ্যে জন্ম দিল দুই জার্মানির। ১৯৪৯ সালে পশ্চিমে তৈরি হল Federal Republic of Germany, অর্থাৎ West Germany। আর পূর্বে সোভিয়েত প্রভাবাধীন German Democratic Republic, বা East Germany। একদিকে পশ্চিমা গণতন্ত্র আর বাজার অর্থনীতি। অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। ভাবলে আজও কেমন অদ্ভুত লাগে। ভাষা এক। ইতিহাস এক। সংস্কৃতির শিকড়ও এক। অথচ একই দেশের মানুষকে রাজনীতি দাঁড় করিয়ে দিল দুটো আলাদা পৃথিবীতে। সেই অদৃশ্য বিভাজন কয়েক বছর পরে Berlin-এর বুকে সত্যি সত্যিই দৃশ্যমান হয়ে উঠল। রাত পেরোতেই বদলে গেল শহর ১৩ আগস্ট ১৯৬১। Berlin-এর মানুষ যখন ঘুমোচ্ছেন, পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝের রাস্তা আর রেল যোগাযোগ বন্ধ করার কাজ শুরু হয়ে গেছে। বসছে কাঁটাতার, তৈরি হচ্ছে ব্যারিকেড। পরে সেই অস্থায়ী বাধাই ধীরে ধীরে রূপ নিল কংক্রিটের Berlin Wall আর এক কঠোর সীমান্তব্যবস্থায়। আজ Berlin-এ গেলে সেই দেওয়ালের অবশিষ্ট অংশ দেখা যায়। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকেরা সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন। ইতিহাসকে ক্যামেরাবন্দি করে নিয়ে যান। কিন্তু আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, একটা দেওয়ালের ছবি তুলে কি তার আসল গল্পটা বোঝা যায়? ধরা যাক, কালও যে রাস্তাটা দিয়ে আপনি বন্ধুর বাড়ি গেছেন, আজ সকালে উঠে দেখলেন সেই রাস্তা বন্ধ। আপনার পরিচিত মানুষটা হয়তো কয়েকশো মিটার দূরে। আপনি জানেন সে ওখানেই আছে। কিন্তু চাইলেই তার কাছে যেতে পারবেন না। মাত্র কয়েকশো মিটার। অথচ সেই কয়েকশো মিটার পেরোনোই তখন প্রায় অসম্ভব। Berlin Wall আমার কাছে তাই শুধুই একটা দেওয়ালের গল্প নয়। এটা মানুষের মাঝখানে হঠাৎ করে তৈরি হয়ে যাওয়া দূরত্বের গল্প। তারপর এল ৯ নভেম্বর সময় এগোল। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে এসে গেল ১৯৮৯। ততদিনে পূর্ব জার্মানিতে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। Leipzig-সহ বিভিন্ন শহরে মানুষ রাস্তায় নামছেন। রাজনৈতিক সংস্কার আর আরও স্বাধীনতার দাবি উঠছে। তারপর ৯ নভেম্বর এক সাংবাদিক সম্মেলনে নতুন travel regulations নিয়ে ঘোষণার পর দ্রুত খবর ছড়িয়ে পড়ল—সীমান্ত খুলছে। মানুষ ছুটলেন Berlin Wall-এর দিকে। প্রথমে কয়েকজন। তারপর শত শত। তারপর হাজার হাজার। শেষ পর্যন্ত Bornholmer Straße-র সীমান্তচৌকি দিয়ে মানুষকে যেতে দেওয়া হল। এরপর একে একে খুলতে থাকল অন্য পথও। সেই রাতের পুরনো ভিডিও আমি যখনই দেখি, একটা জিনিস খুব নাড়া দেয়। কেউ দেওয়ালের উপর উঠে নাচছেন। কেউ হাতুড়ি দিয়ে কংক্রিট ভাঙছেন। কেউ আবার ওপার থেকে আসা একজনকে জড়িয়ে ধরছেন। সেখানে East German বা West German কে, আলাদা করে বোঝার উপায় নেই। সবাই শুধু মানুষ। ২৮ বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা দেওয়ালের শেষের শুরু হল সেই রাতে। তাহলে ৩ অক্টোবর কেন? এই প্রশ্নটা আমারও প্রথম দিকে হয়েছিল। Berlin Wall যদি ৯ নভেম্বর খুলে যায়, তাহলে German Unity Day ৩ অক্টোবর কেন? কারণ দেওয়াল খুলে গেলেও দুই জার্মানি তখনও আইনত দুটি আলাদা রাষ্ট্র। তার প্রায় এগারো মাস পরে, ৩ অক্টোবর ১৯৯০-এর মধ্যরাতে, পুনরেকত্রীকরণ আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ হল। East Germany বা GDR-এর অস্তিত্বের অবসান ঘটল এবং তার পাঁচটি রাজ্য Federal Republic of Germany-র অংশ হয়ে গেল। সেই মুহূর্ত থেকেই ৩ অক্টোবর হয়ে উঠল নতুন একীভূত জার্মানির জাতীয় দিবস। ৯ নভেম্বরের সঙ্গে আবার জার্মান ইতিহাসের এক ভয়ঙ্কর স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। ১৯৩৮ সালের ৯ থেকে ১০ নভেম্বরের রাতে নাৎসি জার্মানিতে ঘটেছিল ভয়াবহ ইহুদি-বিরোধী November Pogroms, যা Kristallnacht নামেও পরিচিত। জার্মানিতে এত বছর থাকতে থাকতে একটা ব্যাপার আমাকে বারবার ভাবিয়েছে। এই দেশ তার সাফল্যের ইতিহাস যেমন মনে রাখে, তেমনই নিজের অন্ধকার ইতিহাসকেও ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে না। তাই হয়তো ৩ অক্টোবর শুধুই উৎসবের দিন নয়। একটু পিছনে ফিরে তাকানোর দিনও। দেওয়াল ভাঙল, দূরত্বও কি মুছে গেল? দুই জার্মানিকে মানচিত্রে এক করে দেওয়া গেল একটা তারিখে। কিন্তু মানুষের জীবন তো আর মানচিত্র নয়। পুনরেকত্রীকরণের পর নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পূর্ব জার্মানির বহু শিল্প ও প্রতিষ্ঠান গভীর পরিবর্তনের মুখে পড়ে। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, বহু মানুষের কর্মজীবনও বদলে যায়। একই সঙ্গে বিপুল বিনিয়োগে বদলাতে থাকে শহর, রাস্তা, রেল আর পরিকাঠামো। তারপর কেটে গেছে তিন দশকেরও বেশি সময়। Berlin Wall নেই। কিন্তু পূর্ব আর পশ্চিমের অর্থনীতি, জনসংখ্যা কিংবা রাজনৈতিক মনোভাবের কিছু পার্থক্য নিয়ে এখনও আলোচনা হয়। তখনই মনে হয়, কংক্রিটের দেওয়াল ভাঙা হয়তো তুলনায় সহজ। মানুষের মনের মধ্যে তৈরি হওয়া দেওয়াল ভাঙতে অনেক বেশি সময় লাগে। মিউনিখে বসে একজন বাঙালির ভাবনা এই জায়গাটাতেই হয়তো German Unity Day-এর গল্পটা আমাকে একটু বেশি ছুঁয়ে যায়। আমরা বাঙালিরা ‘দেশভাগ’ শব্দটার সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই পরিচিত। বইয়ে পড়েছি, সিনেমায় দেখেছি, অনেকেই পরিবারের পুরনো গল্পে শুনেছি ওপার বাংলা আর এপার বাংলার কথা। অবশ্যই বাংলার দেশভাগ আর জার্মানির বিভাজনের রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পূর্ণ আলাদা। দুটোর মধ্যে সরাসরি তুলনা চলে না। কিন্তু মানচিত্রের রেখার পিছনে যে মানুষগুলো থাকে, তাদের অনুভূতির ভাষা বোধহয় অতটা আলাদা নয়। ঘর। পরিবার। বন্ধু। স্মৃতি। পরিচয়। এগুলো তো কোনও সীমান্ত চেনে না। আজ মিউনিখে বসে Berlin Wall আমার থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে। কিন্তু ৩ অক্টোবর এলে সেই দেওয়ালের গল্পটা যেন একটু কাছে চলে আসে। কারণ আমার কাছে German Unity Day এখন আর শুধুই দুই জার্মানি এক হয়ে যাওয়ার দিন নয়। এটা একটা বন্ধ রাস্তা আবার খুলে যাওয়ার গল্প। ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার কাছে আবার পৌঁছতে পারার গল্প। একটা দেওয়াল শেষ পর্যন্ত মানুষের ইচ্ছের কাছে হার মেনে নেওয়ার গল্প। ৩ অক্টোবর মিউনিখের রাস্তায় হয়তো আলাদা কোনও উৎসবের আলো চোখে পড়ে না। কোনও ঢাক বাজে না, কোনও বিরাট মিছিলও আমার রোজকার শহরটাকে বদলে দেয় না। শুধু একটা ছুটির দিন একটু চুপচাপ চলে যায়। কিন্তু এখন জানি, সেই শান্ত দিনটার পিছনে লুকিয়ে আছে একটা ভীষণ শব্দ। দেওয়াল ভাঙার শব্দ। আর তার ওপার থেকে ভেসে আসা মানুষের উল্লাস।