বাংলাস্ফিয়ার: মুম্বইয়ে টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনায় অস্ত্র সরবরাহের সন্দেহভাজন চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে রাধা ও ববিতাকে গ্রেপ্তার করেছে দিল্লি পুলিশ। তাঁদের সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরও দুই যুবককে।

হরিয়ানার সোনিপতে শোরুমে কাজ করতেন রাধা ও ববিতা। পরিবারের খরচ চালাতে টাকা পাঠাতেন তাঁরা। পুলিশের অভিযোগ, গত সপ্তাহে এই দুই তরুণী মুম্বইয়ে গিয়ে এক নাবালকের হাতে পিস্তল রাখা একটি ব্যাগ তুলে দেন। তার পরের দিনই বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।

মঙ্গলবার দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের নর্দার্ন রেঞ্জ এই ঘটনায় অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগে রাধা ও ববিতাকে গ্রেপ্তার করে। দু’জনেরই বয়স ২১ বছর। তাঁদের সঙ্গে ধরা পড়েছেন ২১ বছরের কুণাল এবং ১৯ বছরের সুমিত।

এক পুলিশ আধিকারিক জানান, রাধা ও ববিতাকে নয়াদিল্লি রেলস্টেশন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কুণাল ও সুমিতকে গ্রেপ্তার করা হয় সোনিপতে।

পুলিশের বয়ান অনুযায়ী, পিস্তলটি অমৃতসর থেকে প্রথমে সোনিপতে আনা হয়েছিল। পরে দুই তরুণীর মাধ্যমে দিল্লি হয়ে সেটি পৌঁছয় মুম্বইয়ে। সেখানেই অস্ত্রটি হাতবদল হয়।

যেভাবে শুরু

পুলিশ জানিয়েছে, ২০২১ সালে সুনীলের সঙ্গে বিয়ের প্রায় পরপরই উত্তরপ্রদেশের সীতাপুর ছেড়ে সোনিপতে চলে আসেন রাধা। প্রায় একই সময়ে উত্তরপ্রদেশের আজমগড় থেকে সেখানে আসেন ববিতা। দু’জনেই পরিবার নিয়ে খারখোদা এলাকায় থাকতেন।

দিল্লি পুলিশের এক আধিকারিক বলেন, “রাধার স্বামী সোনিপতের একটি কারখানায় কাজ করতেন। রাধা একটি শোরুমে নিরাপত্তারক্ষীর চাকরি নেন।”

ববিতাও অন্য একটি শোরুমে অভ্যর্থনাকর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীর কাজ পান। বাবা-মাকে টাকা পাঠানোর জন্য তিনি ১২ ঘণ্টার পালায় কাজ করতেন।

কাছাকাছি থাকতেন দুই তরুণী। সেখান থেকেই তাঁদের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

বিষ্ণোই-যোগের অভিযোগ

পুলিশের দাবি, দু’মাস আগে লরেন্স বিষ্ণোই গোষ্ঠীর সহযোগী কুণালের সঙ্গে রাধার পরিচয় হয়। বিষয়টি প্রথম জানতে পারেন ববিতা।

এক পুলিশ আধিকারিক বলেন, “কুণাল কাছাকাছিই থাকত। জেল থেকে বেরোনোর পর আগস্টে রাধার সঙ্গে তার দেখা হয়। অভিযোগ, সে রাধাকে বলেছিল, এখন সে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের অন্যতম প্রধান সহযোগী অনিল পণ্ডিতের হয়ে কাজ করছে।”

পুলিশের দাবি, এক বন্ধুর মাধ্যমে আমেরিকায় থাকা গ্যাংস্টার পণ্ডিতের সঙ্গে কুণালের পরিচয় হয়েছিল। তারপর একটি এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে কুণাল।

ওই আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, পণ্ডিতের নির্দেশে কুণাল অমৃতসর থেকে একটি পিস্তল ও ২০ রাউন্ড গুলি সংগ্রহ করে বলে অভিযোগ।

পুলিশের আরও দাবি, রাধার সঙ্গে কুণালের সম্পর্ক ছিল এবং নিজের কাজকর্মের কথা সে তাঁকে জানিয়েছিল।

অস্ত্র নিয়ে মুম্বইয়ে যেতে রাধাকে রাজি করায় কুণাল। এক পুলিশ আধিকারিক জানান, কুণাল তাঁকে বলেছিল, শুধু এক ‘ছেলের’ হাতে অস্ত্রটি তুলে দিয়ে ফিরে আসতে হবে। এই কাজের জন্য ১২ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।

ওই আধিকারিক বলেন, “রাধা জানায়, সে একা এই কাজ করতে পারবে না। তখন সে তার বন্ধু ববিতাকে সঙ্গে নেয়। দু’জনকে একই অঙ্কের টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তার একটি অংশ মিটিয়েও দেওয়া হয়।”

ট্রেনে মুম্বই যাত্রা

পুলিশের অভিযোগ, ১৫ অক্টোবর রাধা ও ববিতাকে নয়াদিল্লি রেলস্টেশনে নিয়ে যায় কুণাল। পিস্তলটি ছিল রাধার ব্যাগে। যাত্রাপথে কুণাল তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল এবং পণ্ডিতের নির্দেশ তাঁদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিল বলে জানিয়েছেন ওই আধিকারিক।

১৭ অক্টোবর মুম্বইয়ের দাদরে পৌঁছে একটি হোটেলে ওঠেন দুই তরুণী। পুলিশের অভিযোগ, ওই দিন সকাল প্রায় ১১টা নাগাদ হোটেলের কাছে রাধার কাছ থেকে ব্যাগটি নিয়ে যায় এক নাবালক।

পরের দিন, ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যা প্রায় ৭টা নাগাদ জুহুতে অভিনেতার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।

ওই আধিকারিক জানান, ১৮ অক্টোবরই দাদর–হরিদ্বার এক্সপ্রেসে মুম্বই থেকে দিল্লির উদ্দেশে রওনা হন রাধা ও ববিতা।

পুলিশের দাবি, হামলার পরে পণ্ডিত কুণালের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, হামলাকারীরা মুম্বইয়ে আটকে পড়েছে। তাদের পালানোর ব্যবস্থা করতে বলা হয় কুণালকে।

সোমবার রাজস্থানের কোটায় হামলায় অভিযুক্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন হরিয়ানার সোনিপতের রেহান, বিহারের হৃতিক এবং এক নাবালক।

হামলার আগে নজরদারি, তারপর গুলি

হামলার এক সপ্তাহ আগেই ওই তিনজন এলাকায় এসেছিল। পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজ ও ফোনের কল-সংক্রান্ত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ১১ অক্টোবর তারা পুষ্পা নারসি মাঠের আশপাশে ঘোরাফেরা করেছিল। পুলিশের সন্দেহ, সেদিনই টাইগার শ্রফকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেই রবিবার অভিনেতা ফুটবল খেলতে যাননি।

সাধারণত প্রতি রবিবার বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ওই মাঠে ফুটবল খেলতেন শ্রফ।

১৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টে নাগাদ তিন অভিযুক্ত ফের সেখানে আসে। বারবার মাঠের ফটকের কাছে গিয়ে ভিতরে তাকাচ্ছিল তারা। শ্রফ মাঠে আছেন কি না, তা দেখছিল বলে পুলিশের সন্দেহ। পুলিশের আরও সন্দেহ, অন্য কেউও অভিনেতার গতিবিধির উপর নজর রেখে তাদের খবর দিচ্ছিল।

প্রায় আড়াই ঘণ্টা ফটকের কাছে নজরদারির পর সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ শ্রফ মাঠ থেকে বেরোন। তাঁর গাড়ি ফটক পেরিয়ে বাঁ দিকে ঘোরার সময় হামলা হয়। পাঁচ রাউন্ড গুলি চালানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মাঠের ভিতরে থাকা খেলোয়াড়েরা প্রথমে গুলির শব্দকে বাজির আওয়াজ ভেবেছিলেন। পুলিশের ধারণা, অভিনেতা ও তাঁর গাড়িচালককে হত্যার উদ্দেশ্যেই গুলি চালানো হয়েছিল।

আহত তিনজন

হামলায় তিনজন আহত হন। গাড়িচালকের হাতে গুলি লাগে। অভিনেতার ছবি তুলছিলেন এমন এক ভ্লগারও গুলিবিদ্ধ হন এবং তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা বিভাগে ভর্তি করা হয়।

শ্রফের গাড়িচালক ফিরদৌস ইব্রাহিম বালোচের বয়স ৪৮ বছর। তিনি ২৮ বছর ধরে ওই পরিবারের সঙ্গে কাজ করছেন। তাঁর বাঁ হাতের কব্জিতে গুলি লাগে এবং গুলিটি কনুই ও কব্জির মধ্যবর্তী অংশে আটকে যায়। ডান হাতের অনামিকাতেও হাড় ভেঙেছে বলে জানা গেছে।

ঘটনাস্থলে থাকা ভ্লগার উমেশ চৌহান গুলিবিদ্ধ হয়ে নিবিড় পরিচর্যা বিভাগে চিকিৎসাধীন।

টাইগার শ্রফের শরীরে সামান্য ছড়ে যাওয়ার আঘাত লাগে। এফআইআরে তাঁর বুকে ও ডান হাতে আঘাতের উল্লেখ রয়েছে।

হামলার পরে শ্রফ নিজেই চালকের আসনে বসেন। আহত চালককে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে সান্তাক্রুজ থানায় পৌঁছন তিনি। পরে নানাবতী হাসপাতালে যাওয়া হয়।

চালকের বয়ানে হামলাকারীদের পোশাক

বালোচের অভিযোগের ভিত্তিতেই এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। পুলিশকে তিনি তিন হামলাকারীর পোশাকের বর্ণনা দেন।

তাঁর বয়ান অনুযায়ী, এক বন্দুকবাজের পরনে ছিল ফুলের ছাপ দেওয়া সাদা জামা, কালো প্যান্ট ও সাদা জুতো। অন্য বন্দুকবাজ পরেছিল হালকা নীল রঙের পুরো হাতা জামা, কালো প্যান্ট ও সাদা জুতো। মোটরবাইকচালকের পরনে ছিল সাদা ডোরাযুক্ত চকোলেট রঙের টি-শার্ট এবং ধূসর প্যান্ট।