বাংলাস্ফিয়ার: সরকারের কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির কারণে পশ্চিমবঙ্গের প্রতি দশ জনের মধ্যে চার জনের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। দেশের প্রধান রাজ্যগুলির মধ্যে এই অনুপাত সর্বোচ্চ। কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রকের পরিসংখ্যানবিদদের একটি নতুন গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গে এই হার ৪০.৫ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ছত্তীসগঢ়ের হার ২৯.২ শতাংশ। তৃতীয় অসমে ২৯ শতাংশ এবং চতুর্থ কর্নাটকে ২৮.৪ শতাংশ। অর্থাৎ, অন্য রাজ্যগুলির তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ যথেষ্ট এগিয়ে।

তবে যে গবেষণা সাময়িকীতে নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে, সেটি জানিয়েছে, গবেষণাপত্রে প্রকাশিত মতামত লেখকদের নিজস্ব। তা সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বা নীতির প্রতিফলন, এমন ধরে নেওয়া যাবে না।

গবেষণাটিতে ২০২২–২৩ সালের গৃহস্থালির ভোগব্যয় সমীক্ষার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। বিনামূল্যে অথবা ভর্তুকিতে পাওয়া খাদ্যশস্য, ল্যাপটপ, সাইকেল, স্কুলের পোশাক-সহ বিভিন্ন সামগ্রীর আনুমানিক মূল্য পরিবারের মাসিক মাথাপিছু ভোগব্যয়ের সঙ্গে যোগ করলে এবং যোগ না করলে, ভোগব্যয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত শ্রেণিতে পরিবারের অবস্থান কী ভাবে বদলায়, তা তুলনা করা হয়েছে।

এই গবেষণায় প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনার আওতায় পাওয়া বিনামূল্যের চিকিৎসা পরিষেবা এবং বিনামূল্যের শিক্ষা পরিষেবার আর্থিক মূল্য হিসাব করা হয়নি। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘বলার অপেক্ষা রাখে না, বিনামূল্যের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা পরিষেবার সুবিধার মূল্যও এই হিসাবে ধরা হলে পরিবারগুলির জীবনযাত্রার মানের আরও উন্নতি ধরা পড়ত। বিশেষ করে ভোগব্যয়ের নিচের দিকের শ্রেণিগুলিতে থাকা পরিবারগুলির ক্ষেত্রে।’

ভোগব্যয়ের ভিত্তিতে জনসংখ্যাকে কয়েকটি শতাংশভিত্তিক শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। পরিসংখ্যানের পরিভাষায় এগুলিকে বলা হয় ‘ফ্র্যাকটাইল শ্রেণি’। এই শ্রেণিবিন্যাস শুরু হয় সর্বনিম্ন ভোগব্যয়ের ০–৫ শতাংশ মানুষকে নিয়ে। তার পর রয়েছে ৫–১০ শতাংশ, ১০–২০ শতাংশ, ২০–৩০ শতাংশ ইত্যাদি। এ ভাবে উপরের দিকে রয়েছে ৮০–৯০ শতাংশ, ৯০–৯৫ শতাংশ এবং ৯৫–১০০ শতাংশের শ্রেণি।

গবেষণাপত্রের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সরকারি প্রকল্পে পাওয়া সামগ্রীর আনুমানিক মূল্য ভোগব্যয়ের সঙ্গে যোগ করার পরে কোনও পরিবার যদি আগের চেয়ে উপরের শ্রেণিতে উঠে আসে, তা হলে বোঝা যায়, ‘যাঁদের কাছে সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য ছিল, তাঁদের কাছে সেই সুবিধা পৌঁছেছে’ এবং তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে।

অমিতাভ সাহা ও গোপাল সাহার লেখা গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘আমাদের বিশ্লেষণ স্পষ্ট ভাবে দেখাচ্ছে, সরকারের বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণ প্রকল্পের মাধ্যমে খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী দেওয়ায় উপভোক্তা পরিবারগুলির জীবনযাত্রার মানে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।’

অমিতাভ সাহা জাতীয় পরিসংখ্যান দফতরের গৃহস্থালি সমীক্ষা বিভাগের উপমহানির্দেশক। গোপাল সাহা ফিল্ড অপারেশন বিভাগের উপনির্দেশক।

২০২২–২৩ সালের গৃহস্থালির ভোগব্যয় সমীক্ষা অনুযায়ী, গ্রামীণ পরিবারগুলির বিভিন্ন পণ্য ও পরিষেবা বাবদ মাসিক মাথাপিছু গড় ব্যয় ছিল ৩,৭৭৩ টাকা। সরকারি প্রকল্পে পাওয়া সামগ্রীর মূল্য যোগ করলে সেই অঙ্ক বেড়ে হয় ৩,৮৬০ টাকা।

শহরাঞ্চলের পরিবারগুলির ক্ষেত্রে মাসিক মাথাপিছু গড় ভোগব্যয় ৬,৪৫৯ টাকা থেকে বেড়ে হয় ৬,৫২১ টাকা।

বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণ প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবারগুলিকে বিনামূল্যে অথবা ভর্তুকিতে দেওয়া কিছু খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত সামগ্রীর মূল্য হিসাব করার চেষ্টা পরিসংখ্যান মন্ত্রক এই প্রথম করেছিল।

প্রত্যাশিত ভাবেই, এই ধরনের সরকারি সহায়তার ফলে জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়া মানুষের অনুপাত গ্রামাঞ্চলে বেশি। গ্রামীণ জনসংখ্যার ১৮.৮ শতাংশের ক্ষেত্রে এই উন্নতি দেখা গিয়েছে। শহরাঞ্চলে সেই হার ৮.৪ শতাংশ।

গ্রামাঞ্চলে সরকারি সহায়তা হিসেবে পাওয়া সামগ্রীর মূল্য যোগ করার পরে বিভিন্ন ভোগব্যয় শ্রেণির ৪ থেকে ৩৩ শতাংশ মানুষ উপরের শ্রেণিতে উঠে এসেছেন। শহরাঞ্চলে এই হার ১ থেকে ২২ শতাংশের মধ্যে।

গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘গ্রামীণ ও শহুরে ভারত—উভয় ক্ষেত্রেই ভোগব্যয়ের সর্বনিম্ন তিনটি শ্রেণিতে থাকা মানুষের মধ্যে উপরের শ্রেণিতে উঠে আসার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গিয়েছে। জনসংখ্যার এই শ্রেণি পরিবর্তন সামাজিক সহায়তার প্রগতিশীল চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। অর্থাৎ, এই সহায়তার লক্ষ্য দরিদ্র মানুষ, ধনীরা নন।’