বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গে আবার ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর করার দাবি তুললেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। শনিবার, ১৭ অক্টোবর তাঁর অভিযোগ, আগের সংশোধন প্রক্রিয়া হিংসা, হামলা এবং প্রশাসনিক কাজে বাধার কারণে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়নি। সেই পরিস্থিতির জন্য তৎকালীন তৃণমূল সরকারকে দায়ী করেছেন তিনি। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের মধ্যেই সামনে এল তাঁর এই দাবি।

শমীক বলেন, আগের এসআইআরের সময় নথিপত্র ছিনিয়ে নিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, আক্রান্ত হয়েছিলেন নির্বাচনকর্মীরা এবং দফতরে আগুন লাগানো হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, বিডিও, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও বিজেপির বুথস্তরের প্রতিনিধিরাও হামলার শিকার হন। এই বাধা ও অশান্তির কারণে সংশোধনের কাজ সুষ্ঠুভাবে হয়নি বলেই নতুন করে সেই প্রক্রিয়া চালানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পাশেও দাঁড়িয়েছেন শমীক। বিরোধীদের ভোট চুরির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তাঁর বক্তব্য, স্বচ্ছভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য জ্ঞানেশকে বরং পুরস্কৃত করা উচিত। এসআইআর নিয়ে সিজেপির আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণতন্ত্রে প্রতিবাদের অধিকার রয়েছে। তবে তাঁর দাবি, ভোটারদের প্রত্যাখ্যাত এবং জনসমর্থনহীন রাজনৈতিক শক্তি এই আন্দোলনের পিছনে রয়েছে। প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরির বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন তিনি।

শমীকের বক্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ অভিযোগ করেন, বিজেপি নেতারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সহযোগিতায় লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দিয়েছেন। সেই মানুষদের অনেকেই এখনও ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। কুণালের প্রশ্ন, আগের এসআইআর প্রক্রিয়ায় যদি ত্রুটি থেকেই থাকে, তা হলে জ্ঞানেশ কুমার এখনও পদে রয়েছেন কেন? তাঁর মতে, শমীকের নতুন দাবি এবং কমিশনারকে সমর্থনের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।

এই বিতর্কের পটভূমিতে দিল্লিতে বিরোধী দল, সিজেপি এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির বিক্ষোভ চলছে। তাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়ম হয়েছে; তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগও চাইছে। শমীক সেই আন্দোলনের রাজনৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে কমিশনের কাজের পক্ষেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

এই রাজনৈতিক তরজার পাশাপাশি রাজ্যে যোগ্য ভোটারদের তালিকাভুক্ত করার বিশেষ উদ্যোগ চলছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর ১২ অক্টোবর জানিয়েছিল, কোনও যোগ্য ভোটার যাতে বাদ না পড়েন, সে জন্য রাজ্যের ২৪ জন জেলা নির্বাচনী আধিকারিক প্রচার শুরু করেছেন। বিশেষ শিবিরের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট বুথস্তরের আধিকারিক, সহকারী নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক, নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক অথবা জেলা নির্বাচনী আধিকারিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

তবে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন আবেদনগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে। বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে যাঁদের আবেদন সেখানে আটকে রয়েছে, তাঁরা নতুন অন্তর্ভুক্তি অভিযানের আওতায় আসবেন কি না, সে বিষয়ে কমিশনের ব্যাখ্যা চেয়েছে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর। বিরোধীরা নাম ফেরানোর দাবি জানাচ্ছে। কংগ্রেস ও মমতা শিবিরের প্রশ্ন, যোগ্য ভোটারদের বাদ দেওয়ার পরে তাঁদের ফেরানোর উদ্যোগ কেন? তাঁদের অভিযোগ, আগের প্রক্রিয়ায় জবাবদিহির অভাব রয়েছে।

একই দিনে দুর্গাপুজোর মণ্ডপের কাছে সিপিএমের বইয়ের স্টলে হামলার অভিযোগ নিয়েও মুখ খুলেছেন শমীক। এই হামলার সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক অস্বীকার করে তিনি বাংলার বহুত্ববাদের ঐতিহ্যের কথা বলেন। রামকৃষ্ণের ‘যত মত, তত পথ’ বাণীও উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, ভিন্নমতের উপর আক্রমণ বিজেপির পথ নয়। নতুন সরকারের আমলে পুজোর পরিবেশ বদলেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ফলে ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কে এখন মুখোমুখি দুটি দাবি: শমীক চাইছেন নতুন এসআইআর, আর বিরোধীরা চাইছে বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা। আগের প্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতা নিয়েই উভয় পক্ষ প্রশ্ন তুলছে, যদিও তাদের অভিযোগের লক্ষ্য এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ আলাদা।