বাংলাস্ফিয়ার: আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের জামিনকে ঘিরে আবার সামনে এল তদন্তের গতি এবং কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। হাসপাতালের আর্থিক অনিয়মের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে জামিন দেওয়ার পরে নিহত তরুণী চিকিৎসকের বাবা-মা সিবিআইয়ের কাজে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, তদন্ত সংস্থা যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে না। অন্যদিকে, রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, জামিন পাওয়া মানেই নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া নয়।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেফতার হওয়া সন্দীপকে গত ১৫ অক্টোবর জামিন দেয় সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি এম এম সুন্দরেশ এবং বিচারপতি প্রসন্ন বি ভারালের বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, তিনি দু’বছরের বেশি সময় হেফাজতে রয়েছেন, অথচ মামলার ১৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র সাতজনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। হেফাজতের মেয়াদ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার এই অবস্থান বিবেচনা করেই শীর্ষ আদালত তাঁর আবেদন মঞ্জুর করেছে।

সন্দীপের জামিনের আবেদন খারিজ করে কলকাতা হাই কোর্ট গত ২৩ ফেব্রুয়ারি যে নির্দেশ দিয়েছিল, সেটিও বাতিল করেছে সুপ্রিম কোর্ট। জামিনের শর্ত নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালতকে। আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি মেধার নম্বরে কারচুপি করে অযোগ্য প্রার্থীদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও এই মামলার অন্তর্ভুক্ত। আদালতের নির্দেশে অভিযোগগুলি খারিজ করা হয়নি; বিচার চলাকালীন হেফাজতে রাখার প্রশ্নেই তাঁকে স্বস্তি দেওয়া হয়েছে।

শনিবার নিহত চিকিৎসকের বাবা অভিযোগ করেন, সিবিআই আদালতে তারিখ নিচ্ছে, কিন্তু মামলার কার্যকর অগ্রগতি হচ্ছে না। তাঁর বক্তব্য, দু’বছর পরে অভিযুক্তের জামিন পাওয়ার পরিস্থিতির জন্য তদন্ত সংস্থাকে জবাব দিতে হবে। তদন্তকারী আধিকারিকের কাছেও তিনি নিজের ক্ষোভ জানিয়েছেন। মেয়ের জন্য ন্যায়বিচার পেতে পরিবার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ করবে বলে জানিয়ে দেন তিনি।

পরিবারের এই ক্ষোভের একটি রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। নিহত চিকিৎসকের মা বর্তমানে পানিহাটির বিজেপি বিধায়ক। কিন্তু তাঁর বাবা জানিয়েছেন, সেই পরিচয় তাঁদের ন্যায়বিচারের দাবি থেকে সরাতে পারবে না। প্রয়োজন হলে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেও আন্দোলনে নামবেন তাঁরা। তাঁর বক্তব্যের মর্মার্থ, সরকার নিজেদের পছন্দের হলেও বিচার পাওয়ার লড়াই থামবে না। দলীয় সম্পর্কের চেয়ে মেয়ের জন্য সুবিচারের দাবিকেই তাঁরা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

নিহত চিকিৎসকের মা অবশ্য সিবিআইয়ের কাজের জন্য সরাসরি সরকারকে দায়ী করার যুক্তি মানেননি। তাঁর বক্তব্য, সিবিআই একটি স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা; কাজেই তার কাজের জবাব তাকেই দিতে হবে। পরিবারের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে তদন্তের কার্যকারিতা। মানুষের আস্থার মর্যাদা রাখতে না পারলে কেন্দ্রীয় সংস্থার উপর সেই বিশ্বাস কীভাবে বজায় থাকবে, প্রশ্ন তুলেছেন নিহতের বাবাও।

চিকিৎসক আন্দোলনের অন্যতম মুখ অনিকেত মাহাতোও জামিনের ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, তদন্তের শ্লথগতির ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দিনের পর দিন ন্যায়বিচারের দাবিতে পথে থাকা মানুষের কাছে এই খবর বেদনাদায়ক বলে মন্তব্য করেন তিনি। নতুন সরকারের তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনিকেত। সরকার বদলালেও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।

অ্যাসোসিয়েশন অব হেলথ সার্ভিস ডক্টর্সের চিকিৎসক উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়ও মামলার দীর্ঘসূত্রতার জন্য সিবিআইয়ের ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সন্দীপের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সাক্ষ্যগ্রহণের এত কম অগ্রগতি উদ্বেগজনক। চিকিৎসক মহলের একাংশ দ্রুত বিচার শেষ করার দাবি জানিয়েছে। তাদের কাছে প্রশ্ন, দীর্ঘ অপেক্ষার পরেও কেন মামলাকে নিষ্পত্তির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না।

এই অসন্তোষের মধ্যেই শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, অভয়ার বিচার চেয়ে আন্দোলনে যুক্ত মানুষ হতাশ হচ্ছেন, কিন্তু আইন আবেগের ভিত্তিতে চলে না। জামিন পাওয়া অভিযুক্তের আইনসিদ্ধ অধিকারও বটে। তাঁর বক্তব্য, আদালতের এই সিদ্ধান্ত থেকে সন্দীপের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা যাবে না। আইনি এবং প্রক্রিয়াগত বিষয়ও জামিনের সিদ্ধান্তে ভূমিকা নিতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রদেশ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি অধীর চৌধুরীও এই ঘটনায় প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, সন্দীপের জামিন নিয়ে উদ্বেগ শুধু নিহতের বাবা-মায়ের নয়, রাজ্যের মানুষের। বিরোধীদের প্রতিক্রিয়াতেও সেই অসন্তোষই উঠে এসেছে।

শমীক জনমতের প্রসঙ্গ তুললেও আদালতে অপরাধ প্রমাণের প্রশ্নটি আলাদা। সন্দীপের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার এখনও বাকি; জামিনের আদেশ কোনও খালাসের রায় নয়। আবার অভিযোগ রয়েছে বলেই তাঁকে ইতিমধ্যে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণের মূল্যায়ন এবং বিচার শেষ হওয়ার পরেই সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।

এই ঘটনায় দু’টি পৃথক মামলার পার্থক্যও মনে রাখা প্রয়োজন। ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট আর জি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসকের দেহ উদ্ধার হওয়ার পরে দেশজুড়ে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। সেই ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগে সন্দীপ এবং টালা থানার তৎকালীন ওসি অভিজিৎ মণ্ডলকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। একই বছরের ডিসেম্বরে নির্ধারিত নব্বই দিনের মধ্যে সিবিআই চার্জশিট দিতে না পারায় তাঁরা ওই মামলায় জামিন পান।

তবে পৃথক আর্থিক অনিয়মের মামলায় হেফাজতে থাকায় তখন সন্দীপের কারাবাস শেষ হয়নি। এবারের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সেই আর্থিক মামলাটিকে কেন্দ্র করে। ফলে দুই দফা জামিনের কারণও এক নয়: আগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে চার্জশিট না দেওয়া, এবারে দীর্ঘ হেফাজত এবং সাক্ষ্যগ্রহণের সীমিত অগ্রগতি। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দুই সিদ্ধান্তকে মিলিয়ে দেখলে তদন্ত ও বিচারের অবস্থান সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।

সন্দীপের জামিন নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া চললেও নিহত চিকিৎসকের পরিবারের দাবি অপরিবর্তিত: তদন্তের ফল চাই, আদালতে কার্যকর অগ্রগতি চাই। তাঁদের কাছে নতুন করে আন্দোলনের সম্ভাবনাও খোলা রয়েছে। এখন নজর থাকবে বিচারিক আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং অবশিষ্ট সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণের দিকে। জামিনের সিদ্ধান্তের পরেও অভিযোগের বিচার চলবে; সেই বিচার কত দ্রুত এগোয়, তার উপরই নির্ভর করবে অপেক্ষার অবসান।