বাংলাস্ফিয়ারঃ ধর্মান্তরণ চলছে—এই অভিযোগে বিক্ষোভের মধ্যে নদিয়ার কৃষ্ণনগরের জলালখালিতে সেন্ট লুইস ক্যাথলিক গির্জায় ভাঙচুরের অভিযোগ উঠল। শুক্রবার, ৯ অক্টোবর সন্ধ্যার ঘটনার পরে প্রার্থনার অনুষ্ঠান বন্ধ করেছেন আয়োজকেরা। কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ জমা পড়েছে। কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার এক আধিকারিক জানিয়েছেন, তদন্ত চলছে।

ফাদার ভিনসেন্ট জর্জ জানিয়েছেন, পুলিশের অনুমতি নিয়ে চার দিনের প্রার্থনাসভার আয়োজন হয়েছিল। শুক্রবার কয়েকজন গির্জার বাইরে জড়ো হয়ে মাইকে ধর্মান্তরণের অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ পাথর ছোড়া হয়। কয়েকজন ভিতরে ঢুকে অস্থায়ী প্রবেশদ্বার এবং মূর্তির কাচের আবরণ ভাঙেন।

এর প্রতিবাদে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা সামনের রাস্তা অবরোধের চেষ্টা করলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবার প্রতিষ্ঠাতা হেরড মল্লিক নিরপেক্ষ তদন্ত ও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা চেয়েছেন।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদের উত্তর কলকাতার সম্পাদক অরিন্দম করের পাল্টা অভিযোগ, টাকা ও অলৌকিক ঘটনার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন জেলায় ধর্মান্তরণ করানো হচ্ছে। তাঁর দাবি, আগে তৃণমূলের আশ্রয় পাওয়ায় এসব চলত; এখন মানুষ প্রতিবাদ করছেন। তবে জলালখালির গির্জায় ধর্মান্তরণ হচ্ছিল বলে পুলিশের কোনও সিদ্ধান্তের কথা প্রতিবেদনে নেই।

ফাদার জর্জ জানিয়েছেন, তাঁরা এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি চান না। গির্জা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, আয়োজন থামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ঘটনার পরেই। প্রতিবেদনে হামলায় আহতের সংখ্যা কিংবা কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি না, তার কোনও উল্লেখ নেই।

ঘটনাটির পটভূমিতে রয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় খ্রিস্টানদের প্রার্থনাসভায় হামলার সাম্প্রতিক অভিযোগ। সংবাদ মাধ্যমের ৫ সেপ্টেম্বরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল, একাধিক এলাকায় হামলার পরে বাড়িতে প্রার্থনাসভা ও ধর্মীয় সফর স্থগিত করেছেন খ্রিস্টান সংগঠনের সদস্যেরা। ফলে উদ্বেগ শুধু উপাসনাস্থলের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে নয়, নিয়মিত ধর্মাচরণ চালিয়ে যাওয়া নিয়েও।

ওই প্রতিবেদনে উলুবেড়িয়ার যাজক মিঠুন হাজরা অভিযোগ করেছিলেন, ২৩ আগস্ট একটি ভাড়াবাড়িতে প্রায় ৬০ জনের প্রার্থনাসভায় ঢুকে মারধর ও ভাঙচুর করা হয়। পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাওড়া গ্রামীণ পুলিশ তখন এফআইআর দায়ের ও তদন্তের কথা জানিয়েছিল। যাজকের বক্তব্য ছিল, হামলার পর থেকে সেখানে বাড়িতে প্রার্থনাসভা বন্ধ রয়েছে।

হাওড়ার ঘুসুড়িতেও প্রার্থনায় অংশগ্রহণকারীদের মারধরের অভিযোগ উঠেছিল। সংশ্লিষ্ট যাজক জানিয়েছিলেন, তাঁরা বাড়িতে প্রার্থনা ও পরিদর্শন স্থগিত করেছেন। পূর্ব মেদিনীপুরেও এক যাজক ও তাঁর স্ত্রীকে মারধরের অভিযোগ পাওয়া যায়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলির পাশাপাশি ওই প্রতিবেদনে ধর্মান্তরণের অভিযোগ তোলা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের বক্তব্যও রাখা হয়েছিল।

সেই প্রতিবেদনে রাজ্যের আদিবাসী উন্নয়ন ও সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু বলেছিলেন, প্রার্থনা ব্যক্তিগত ধর্মীয় পছন্দের বিষয়। তবে জোর করে ধর্মান্তরণ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগ জানানোর অধিকারও রয়েছে বলে জানিয়েছিলেন তিনি।

এই বিতর্কের রাজনৈতিক পটভূমিও রয়েছে। ১২ আগস্ট প্রকাশিত পৃথক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ধর্মান্তরণবিরোধী আইন আনার পরিকল্পনার কথা বলেছেন। বাঁকুড়ায় তাঁর অভিযোগ ছিল, বিদেশি অর্থ এবং দরিদ্র মানুষের আর্থিক অসুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ধর্মান্তরণ ঘটানো হচ্ছে। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও ঝাড়গ্রাম নিয়ে গঠিত জঙ্গলমহলের প্রসঙ্গও তিনি তুলেছিলেন।

সেই বক্তব্যে ধর্মান্তরণ রোধে আইন প্রণয়নকে সরকারের ভবিষ্যৎ কাজ হিসেবে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। ফলে ওই ঘোষণাকে ইতিমধ্যে কার্যকর হয়ে যাওয়া আইনের প্রমাণ হিসেবে দেখা চলে না। নদিয়ার ঘটনাকে বোঝার ক্ষেত্রে সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা, সংগঠনগুলির অভিযোগ এবং পুলিশের তদন্ত—এই তিনটির স্বতন্ত্র অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অভিযোগের তদন্ত চলার সময় প্রার্থনায় অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে। কোনও পক্ষের দাবি যাচাইয়ের আগেই উত্তেজনা ছড়ালে তার প্রভাব পড়ে গোটা এলাকার সম্পর্কের উপর। ঘটনার নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এবং নিরাপদে ধর্মীয় অনুষ্ঠান করার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা—দুই ক্ষেত্রেই প্রশাসনের পদক্ষেপ এখন তাৎপর্যপূর্ণ।