বাংলাস্ফিয়ার : নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনে বড় ব্যবধানে বিজেপির জয়ের পাশাপাশি সামনে এল বিরোধী রাজনীতির নতুন সমীকরণ। তৃণমূলের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরই ভোটের পরীক্ষায় বিপর্যস্ত। অন্যদিকে, কোনও আসন জিততে না পারলেও কংগ্রেস কিছুটা জমি ফিরে পেয়েছে। বিশেষ করে নন্দীগ্রামে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে তারা। তবে এই ফলের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের সমর্থনের সম্পর্কও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
শুক্রবার ঘোষিত ফলে নন্দীগ্রামে বিজেপির হাসিরানি রথ পেয়েছেন ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ২২৭ ভোট। কংগ্রেসের মিলন প্রধানের প্রাপ্ত ভোট ৪১ হাজার ৬৭৪। জয়ের ব্যবধান ১ লক্ষ ২২ হাজার ৫৫৩। এই আসনে ১৯৬৭ সালের পর এত বড় ব্যবধানে কেউ জেতেননি। শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুরের আসন রেখে নন্দীগ্রাম ছেড়ে দেওয়ায় এখানে উপনির্বাচন হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নন্দীগ্রামে কংগ্রেসের ভোটের হার এপ্রিলের বিধানসভা নির্বাচনের ০.৩১ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৯.২৫ শতাংশ। বিপরীতে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল পেয়েছে মাত্র ০.৩৯ শতাংশ ভোট। বিধানসভা নির্বাচনে অবিভক্ত তৃণমূলের ভোট ছিল ৪৬.৫৫ শতাংশ। ফলে পুরনো দলের উত্তরাধিকার দাবি করলেও বিদ্রোহী শিবির সেই সমর্থন নিজের দিকে টানতে পারেনি।
রেজিনগরেও তৃণমূলের দুই অংশের ফল হতাশাজনক। মমতা শিবির পেয়েছে ১.৮৭ শতাংশ, ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল ০.৯৯ শতাংশ। এপ্রিলের নির্বাচনে তৃণমূলের ভোট ছিল ১৭.৪৩ শতাংশ। এখানে কংগ্রেসের ভোট ১.৭১ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩ শতাংশ। বামেদেরও সামান্য অগ্রগতি দেখা গিয়েছে। নন্দীগ্রামে সিপিআইয়ের ভোট ১.১৯ শতাংশ থেকে ২.৬৭ শতাংশ হয়েছে। রেজিনগরে সিপিএম পেয়েছে ১.৮৫ শতাংশ ভোট।
নন্দীগ্রামে কংগ্রেসের উত্থানের একটি বিশেষ পটভূমি রয়েছে। মমতা শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে শেষ মুহূর্তে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। এরপর মমতা কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন জানান। তাই কংগ্রেসের বাড়তি ভোটের পুরোটাই নিজস্ব সংগঠনের পুনরুজ্জীবন বলে ধরে নেওয়া কঠিন। কতটা তৃণমূল সমর্থকদের ভোট স্থানান্তর, আর কতটা কংগ্রেসের নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি, এই ফলাফল একা তার নির্ভুল উত্তর দেয় না।
রেজিনগরে বিজেপির প্রার্থী পেয়েছেন ১ লক্ষ ২৯ হাজার ৯১৪ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী, হুমায়ুন কবীরের ছেলে গোলাম নবি আজাদের প্রাপ্তি ৫৪ হাজার ৯৮। প্রায় ৭০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটারের এই কেন্দ্রে জয়কে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে তুলে ধরছে বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, সংখ্যালঘুরা তাঁর বন্ধুত্বের আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন। তিনি অন্নপূর্ণা প্রকল্পের সুবিধাপ্রাপকদেরও ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
তবে ভোটপ্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ অব্যাহত। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার জানিয়েছেন, তাঁরা দুই কেন্দ্রের নির্বাচন বাতিলের দাবি জানিয়েছিলেন। মমতা শিবিরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, শেষ মুহূর্তে নতুন প্রতীক পাওয়ায় তা ভোটারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়নি; কর্মীদের গ্রেফতারও বাধা হয়েছে। নন্দীগ্রামে তাঁদের সমর্থকরাই কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছেন বলে দাবি তাঁর। আগামী দিনে ইন্ডিয়া জোটের অংশ হিসেবে লড়াইয়ের কথা বলেছেন তিনি।
এই নির্বাচনের আগে থেকেই তৃণমূলের ভাঙন বিজেপিবিরোধী পরিসর দখলের প্রতিযোগিতা তীব্র করেছিল। নির্বাচন কমিশন পুরনো নাম ও জোড়াফুল প্রতীক স্থগিত করায় দুই শিবিরকে নতুন পরিচয়ে নামতে হয়। মমতা শিবির পায় ফুটবলার প্রতীক, বিদ্রোহীরা খাম। সংগঠন, পরিচিতি এবং ভোটারদের আনুগত্য—তিনটি ক্ষেত্রেই তার প্রভাব কতটা পড়েছে, ফলের মূল্যায়নে সেই প্রশ্ন থাকছে। রেজিনগরে মমতা শিবিরের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী প্রথমে সরে দাঁড়ানোর কথা বলেও পরে সিদ্ধান্ত বদলান। নতুন প্রতীক চেনানোর অসুবিধা এবং কর্মীদের উপর চাপের অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। প্রচারপর্বের এই অনিশ্চয়তাও দুই শিবিরের সাংগঠনিক সমস্যাকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।
ফল থেকে আপাতত যে ইঙ্গিত মিলছে, কংগ্রেসের সামনে বিরোধী পরিসরে শক্তি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু দুটি উপনির্বাচনের ভিত্তিতে রাজ্যজুড়ে স্থায়ী পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে পৌঁছনো তাড়াহুড়ো হবে। এই বাড়তি ভোটকে স্থায়ী রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তিতে রূপান্তর করতে পারাই এখন কংগ্রেসের সামনে বড় পরীক্ষা।